মাস্টার যেনো বজ্রাহত হলেন। “কী যা-তা বলছেন! সুস্মিতাকে আপনি দেখেছেন না? ও কিভাবে মুশকান জুবেরি হতে যাবে? আমার সাথে এসব তামাশা করার মানে কী!”
“লম্বা গল্প…আমার হাতে এখন অতো সময় নেই। পরে যখন। আপনাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবো তখন সবটাই বলবো।”
মাস্টারের ভুরু কুঁচকে গেলো।
“বাইরে পুলিশের ভ্যান অপেক্ষা করছে, আমি আপনার স্কুলে যাচ্ছি ওদের নিয়ে,” বললো ছফা। আশা করি, এখানকার এমপিকে আর জড়াবেন না। জড়ালেও কোনো ফায়দা হবে না,” কথাটা বলে যেই না ঘর থেকে বের হতে যাবে অমনি মাস্টারের কথায় থমকে দাঁড়ালো সে।
“কিন্তু সুস্মিতা তো স্কুলে নেই।”
মাস্টারের দিকে ফিরে তাকালো ছফা। তার চোখেমুখে অবিশ্বাস। “নেই মানে??”
ও ঢাকায় চলে গেছে…গতকাল।”
“ঢাকায় গেছে??” বিস্ময় আর হতাশায় বলে উঠলো ছফা। “ঢাকার কোথায়? কেন গেছে?!” প্রায় চেঁচিয়ে উঠলো সে।
“জানি না।” মিথ্যেটা অনেক কষ্টে বললেন রমাকান্তকামার। তার কাছে মনে হচ্ছে, এই লোকের কাছে সত্যি বলা মানে কাউকে বিপদে ফেলা।
ছফার চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো। রাগেক্ষোভে ফুঁসে উঠলো সে। একহাত দিয়ে অন্যহাতের তালুতে আঘাত করলো জোরে। দাঁতে দাঁত পিষে অনেকটা আর্তনাদের মতো করে বললো, “পালিয়েছে! ঐ ডাইনিটা আবারো পালিয়ে গেছে!”
.
অধ্যায় ৬৭
ডাক্তার আসকার ইবনে সায়িদ এবার সত্যি সত্যি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। দুশ্চিন্তায় তার প্রেসার বেড়ে গেছে। ডুয়েল সিটিজেন তিনি, বৃটিশ পাসপোর্ট আছে তার, চাইলে যেকোনো সময় ভিসা ছাড়াই সেকেন্ডহোমে যেতে পারেন। তারপরও বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন তাকে লন্ডনের ফ্লাইটে উঠতে দেয়নি। এরজন্যে কোনো কারণও দেখায়নি তারা, শুধু বলেছে, উপর মহল থেকে নির্দেশ আছে, ডাক্তার আসকার যেনো দেশ ত্যাগ করতে না পারেন। তার সঙ্গে আসা হাসপাতালের কর্মচারীরা অনেক অনুরোধ করেও তাদেরকে বোঝাতে পারেনি। তবে ডাক্তার জানতেন, ইমিগ্রেশনে যারা আছে তাদেরকে অনুরোধ করে কোনো ফায়দা হবে না, সেজন্যেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ফোন দিয়েছিলেন তিনি, যদি কোনো সাহায্য পাওয়া যায়। তার নামে কোনো মামলা নেই, কোনো কেসে তিনি সন্দেহভাজন আসামিও নন, এমনকি বিরোধী কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা নন-তাহলে কীসের ভিত্তিতে তাকে ইমিগ্রেশন আটকে দিলো?
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রথমে দারুণ অবাক হয়েছিলেন, কেননা এ কাজ তার মন্ত্রণালয়ই করে থাকে সব সময়। জানামতে, ডাক্তারের ব্যাপারে এরকম নিষেধাজ্ঞা দেয়নি তার মন্ত্রণালয়। কিন্তু ইমিগ্রেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করার পর তিনি জানতে পারেন, সত্যি সত্যি সরকারের উপরমহল থেকে বিশেষ একজন ব্যক্তির নির্দেশে ডাক্তারকে বিদেশে যেতে বাধা দেয়া হচ্ছে। সেই বিশেষ ব্যক্তিটি কে, তা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানাতে অপারগ হলেও ডাক্তার আসকার বুঝে গেছেন-এটা প্রধানমন্ত্রীর পিএসের কাজ। ক্ষমতাধর ব্যক্তি তিনি, ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন। আর এর পেছনে যে নুরে ছফার হাত আছে সেটাও বুঝতে পেরেছেন।
ইমিগ্রেশন থেকে বিমুখ হয়ে নিজের হাসপাতালের অফিসে ফিরে এসেছেন অনেকক্ষণ হলো কিন্তু অন্য একটি দুশ্চিন্তা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। সুস্মিতার ফোন বন্ধ। তিনি ঢাকা ছাড়ার পর মেয়েটা ঢাকা টু যশোর ফ্লাইটে সুন্দরপুরে চলে যাওয়ার কথা। ঘণ্টখানেক আগে সে ফোন দিয়ে বলেছেও, একটু পরই রওনা দেবে। রওনা দেবার পর এসএমএসও পাঠিয়েছিলো। এরপর থেকে আর কোনো খবর নেই।
প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন, হয়তো সুস্মিতার ফোনের চার্জ শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু তিনি খোঁজ নিয়ে জেনেছেন, যে ফ্লাইটে সুস্মিতার যশোর যাবার কথা, সেটা সে মিস্ করছে! গতকালই হাসপাতালের অ্যাডমিনের একজনকে দিয়ে মেয়েটার জন্য দুটো টিকেটের ব্যবস্থা করেছিলেন।
এখন তার মনে খারাপ কিছুর আশঙ্কা দানা বাঁধছে।
ওর কিছু হলো না তো?! আসকার ইবনে সায়িদ নিজের মাথা থেকে এই দুশ্চিন্তাটা কোনোভাবেই দূর করতে পারছেন না। পথে কোনো দুর্ঘটনা? এরকম আশঙ্কাও হচ্ছে তার। তবে মন বলছে, যে লোক তাকে দেশের বাইরে যেতে না দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে, সেই একই লোক সুস্মিতাকেও কিছু করেছে।
কিন্তু কী করেছে?! কেন করবে?
ডাক্তার টের পাচ্ছেন, তার নাজুক হৃদপিণ্ডটা এবার সত্যি সত্যি বিপাকে পড়ে গেছে। বুকের বামপাশে চিনচিনে ব্যথাটা বাড়ছে ক্রমশ। তার হার্টে তিনটা রিং লাগানো হয়েছিলো কয়েক বছর আগে। তারপর বেশ সুস্থই ছিলেন, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে হৃদপিণ্ডটা দিনকে দিন নাজুক হয়ে উঠছে আবার।
পকেট থেকে সদ্য কেনা সেলফোনটা হাতে নিলেন ডাক্তার। নুরে ছফা আর গুণ্ডা প্রকৃতির ঐ লোক যখন তার বাড়িতে জোর করে ঢুকে পড়েছিলো তখন তিনি দ্রুত নিজের মোবাইলফোন থেকে সিমটা খুলে ফোনটা কমোডে ফ্ল্যাশ করে দিয়েছিলেন, সিমটা লুকিয়ে রেখেছিলেন মেঝের কার্পেটের নীচে। তবে পাসপোর্টটার কথা মাথায়ই আসেনি। এলেও ওটা তিনি নষ্ট করার বিলাসিতা দেখাতে পারতেন না।
স্মৃতি থেকে একটা নাম্বার প্রেস করলেন। এই নাম্বারটা তার স্মৃতি ছাড়া আর কোথাও সংরক্ষণ করেননি নিরাপত্তার কারণে। এখন এই সঙ্কটময় মুহূর্তে এসে শেষ দুটো ডিজিট তালগোল পাকিয়ে ফেলেছেন।
৪৮ নাকি ৮৪? মনে মনে আওড়ালেন ডাক্তার।
