বেশ কয়েক মাস আগে সুস্মিতাকে সঙ্গে নিয়ে বেড়াতে এসেছিলেন ট্রাস্টি বোর্ডের সম্মানিত সদস্য ডাক্তার আসকার, আর ঐ সময়েই স্কুলের জন্য গানের শিক্ষক খুঁজছিলেন মাস্টার। কথাটা তিনি জানিয়েছিলেন ভদ্রলোককে, কিন্তু ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি, সুস্মিতার মতো শান্তিনিকেতন থেকে আসা কেউ সুন্দরপুর স্কুলে বাচ্চাদের গান শেখাতে আগ্রহী হবে। ডাক্তার তার বন্ধুর মেয়েকে প্রস্তাবটা দিতেই সানন্দে রাজি হয়ে যায় সে! মাস্টার অবাক হলেও, ভালো একজন শিক্ষক পেয়ে এতোটাই খুশি হয়েছিলেন যে, খুব একটা মাথা ঘামাননি এ নিয়ে।
গতকাল বিকেলের দিকে তিনি যখন স্কুলের অফিস থেকে রবীন্দ্রনাথে যাবার জন্য বের হবেন, তখন উদ্বিগ্ন হয়ে সুস্মিতা এসেছিলো তার কাছে। মেয়েটা সব সময় যেভাবে পরিপাটি থাকে সেটা দেখতে ভালো লাগে তার-যেনো রবীন্দ্রনাথের গল্প থেকে উঠে আসা কোনো নায়িকা। কিন্তু গতকাল সেই পরিপাটি সুস্মিতার দেখা পাননি রমাকান্তকামার। সচরাচর বাঙালি মেয়েরা যেরকম সালোয়ার-কামিজ পরে থাকে সেরকমই কিছু পরেছিলো, আর তার অভিব্যক্তি দেখে বোঝা যাচ্ছিলো সে ভীষণ বিচলিত।
“মাস্টারমশাই,” ঘরে ঢুকেই মলিন কণ্ঠে বলেছিলো সে। “ডক্টর আসকার হসপিটালে অ্যাডমিট। ওর কন্ডিশান নাকি খুবই ক্রিটিক্যাল!”
রমাকান্ত নড়েচড়ে বসেছিলেন কথাটা শুনে। “বলেন কি?”
“এখন আইসিসিসিইউতে আছে। কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়েছে, প্রায় কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলেছিলো কথাগুলো।
মেয়েটার ছলছল চোখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন মাস্টার। তখনই প্রথম বারের মতো এই সন্দেহগ্রস্ততার শিকার হোন তিনি-এই মেয়ের সাথে ডাক্তারের সম্পর্ক কী? ভদ্রলোকের অসুস্থতার খবর পেয়ে তার চোখ এভাবে ছল ছল করে উঠবে কেন?
“ওর বাসায় পুলিশের দু-জন লোক গেছিলো ওকে ইন্টেরোগেট করার জন্য…তখনই নাকি অসুস্থ হয়ে পড়ে।”
মাস্টারের ভুরু কুঁচকে গেছিলো কথাটা শুনে। কারা গেছিলো-প্রশ্নটা করতে গিয়েও করেননি, ভালো করেই জানতেন, এটা ঐ নুরে ছফার কাজ। উকিল ভদ্রলোক তাকে ফোন করে সবই জানিয়ে দিয়েছিলেন। এজন্যে নিজেকে কিছুটা দায়ীও মনে করেন মাস্টার। তার বলা উচিত হয়নি চিরকুটটা তাকে কে দিয়েছিলো। এই চিরকুটের সূত্র ধরেই উকিলকে হেনস্তা করে, ভয়ভীতি দেখিয়ে ডাক্তারের নাগাল পেয়ে গেছে ডিবি অফিসার।
“এখন ডাক্তারসাহেবের কী অবস্থা?” আস্তে করে জানতে চেয়েছিলেন রমাকান্তকামার। একটা দীর্ঘশ্বাসও বেরিয়ে এসেছিলো ভেতর থেকে।
ঠোঁট ওল্টায় সুস্মিতা। “কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। ওর ফোন বন্ধ, তাই বাসার দারোয়ানকে ফোন দিয়েছিলাম…সে-ই আমায় বললো। এরপর হসপিটালে যোগাযোগ করেছিলাম, কিন্তু ওরা কিছুই জানে না! খুবই অদ্ভুত ঠেকছে ব্যাপারটা। ভীষণ চিন্তাও হচ্ছে।”
মাস্টারের ভুরু কুঁচকে গেছিলো। “হাসপাতালও কিছু জানে না? ওটা উনার নিজেরই…?”
“হুম, সেজন্যেই আমার খুব টেনশন হচ্ছে।”
সুস্মিতার দিকে ভালো করে তাকিয়ে মাস্টার দেখতে পেয়েছিলেন, মেয়েটা আসলেই দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছে।
“আমাদের কি ঢাকায় গিয়ে উনাকে দেখে আসা দরকার?” ট্রাস্টের একজন সম্মানিত সদস্য হিসেবে এটা করা দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে বলে মনে করেছিলেন রমাকান্তকামার। যদিও জানতেন, তিনি গেলে ঐ নুরে ছফার সন্দেহের দৃষ্টিতে পড়বেন আবার, সে নিশ্চয় নজরদারিতে রেখেছে ডাক্তারকে, তার লোকজন থাকতে পারে হাসপাতালের আশেপাশে। তার চেয়েও বড় কথা, স্কুলের গুরুদায়িত্ব ফেলে তার পক্ষে দু-দিনের জন্যে ঢাকায় যাওয়াটাও খুব কঠিন। অন্যদিকে, ট্রাস্টের একজন সদস্য ছাড়া ডাজার আসকার ইবনে সায়িদের সাথে তার তেমন সখ্যতাও নেই। তার চেয়ে বরং সুস্মিতা গেলেই ভালো হয়। তবে মেয়েটাকে একা ছাড়েননি তিনি। সঙ্গে দিয়ে দিয়েছেন শ্যামলকে। শত হলেও ঢাকা শহর, তিনি নিজেই ওখানে গিয়ে…
এমন সময় লাইব্রেরির ছোট্ট অফিস ঘরের দরজায় টোকা দিলে মাস্টারের চিন্তাভাবনায় ছেদ পড়লো। তিনি কিছু বলার আগেই দরজাটা খুলে গেলো, দেখতে পেলেন নুরে ছফা দাঁড়িয়ে আছে।
যারপরনাই বিস্মিত হলেন রমাকান্তকামার। অনেক অনেক বছর পর, তার সমস্ত শরীর রাগে কেঁপে উঠলো।
ছফার ঠোঁটে লেগে আছে বাঁকাহাসি, যেনো বিশাল একটি বিজয় অর্জন করে এসেছে সে।
“মাস্টারসাহেব, আপনার সাথে আমার জরুরী কথা আছে,” ঘরের ভেতরে ঢুকে বললো ছফা।
“আমার সাথে! কী কথা?” মাস্টার খুবই অবাক হলেন। বেশ বেগ পেতে হলো নিজের ভেতরে ফুঁসে উঠতে থাকা এই ক্রোধকে দমন করতে গিয়ে।
“আপনার স্কুলে যাচ্ছি, আপনাদের গানের শিক্ষিকা সুস্মিতাকে গ্রেপ্তার করতে।”
“কি!” মাস্টার যেনো আকাশ থেকে পড়লেন। “সুস্মিতাকে গ্রেপ্তার করতে এসেছেন!” এই লোক কি তার সঙ্গে তামাশা করতে এসেছে-রমাকান্তকামার ভেবে পেলেন না। “ও কী করেছে? ওকে কেন গ্রেপ্তার করতে চাইছেন আপনি?”
বাঁকাহাসি দিলো ছফা। “আসলে আমার বলা উচিত ছিলো মুশকান জুবেরিকে গ্রেপ্তার করতে এসেছি, তাহলে আপনার জন্য বুঝতে সুবিধা হতো।”
মাস্টার বিস্ফারিত চোখে চেয়ে রইলেন কয়েক মুহূর্ত। কথাটা হজম করে নিতে কষ্ট হচ্ছে তার। “আপনি কি আমার সাথে ঠাট্টা করছেন?!”
বাঁকা হাসি দিলো ছফা। “রমাকান্তবাবু, আজকেই কলকাতা থেকে ফিরেছি আমি, সেখান থেকেই জেনে এসেছি, মুশকান জুবেরি সুস্মিতা সমাদ্দার সেজে আপনার স্কুলে চাকরি নিয়েছে। সম্ভবত আপনিও সেটা জানতেন।”
