“কেমন আছেন, স্যার?…শরীর ভালো?”
“আর শরীর! একদম কি সুস্থ থাকি,” কথাটা হাসিমুখেই বললো সাবেক ডিবি অফিসার। “কলকাতার খবর কি? ওইখান থেইকা আইসা পড়ছেন যে এতো তাড়াতাড়ি! কিছু পান নাই?”
“স্যার, আমি এখন বেনাপোল বর্ডার পার হয়ে সুন্দরপুরে যাচ্ছি।”
কথাটা শুনে অবাক হলো খোদাদাদ শাহবাজ খান। “আবার সুন্দরপুর যাইতাছেন ক্যান? আপনে তারে কলকাতায় ট্রেস করবার পারেন নাই?”
“ওখান থেকেই তার হদিস পেয়েছি, স্যার।”
“বলেন কি!”
“মুশকান জুবেরি এখন সুন্দরপুরেই আছে!”
“সুন্দরপুরে আছে!?” কেএস খান যেনো সাসপেন্স নভেল পড়ার উত্তেজনায় পড়ে গেলো। “এইটা কেমনে সম্ভব! আপনে না ওইখানে গেছিলেন কয়দিন আগে…তখন তো তারে পান নাই!”
“স্যার, লম্বা গল্প…দেখা হলে সবটাই বলবো, এখন সংক্ষেপে বলছি।”
“বলেন বলেন, তাড়া দিলো সে। “আমি তো মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝবার পারতাছি না।”
এরপর ফোনে যতোটুকু সম্ভব কলকাতা থেকে কিভাবে নিখোঁজদের তালিকা অনুসন্ধান করে প্লাস্টিক সার্জনের খোঁজ পেয়েছিলো, আর সেখান থেকে মুশকান জুবেরির নতুন পরিচয় সুস্মিতা সমাদ্দারের হদিস পেয়েছে, সবটাই বললো। এ-ও জানালো, ওখান থেকে নিশ্চিত হবার পর আর দেরি করেনি; সঙ্গে সঙ্গে কলকাতা থেকে রওনা দেয় যশোরের উদ্দেশে, সেখান থেকে সুন্দরপুরে।
“পুরাই তো দেখি রিটার্ন টু ইডেনের কাহিনী!” ছফার কথা শেষ হলে বললো কেএস খান।
“কীসের কাহিনী?!” ছফা বুঝতে পারলো না তার সিনিয়রের কথা।
“একটা সিনেমার কাহিনী! অনেক আগে টিভিতে দেখাইতো…রিটার্ন টু ইডেন…ওইটাতে এক মহিলা তার হাজব্যান্ডের উপর রিভেঞ্জ নেওনের লাইগা প্লাস্টিক সার্জারি কইরা নিজের চেহারা পাল্টায়া ফালায়…নতুন একটা আইডেন্টি নিয়া ফিরা আসে আবার,” দ্রুত বলে গেলো। একই রকম ঘটনা মুশকান জুবেরিও ঘটাইছে! আনবিলেভেল!” একটু থেমে আবার বললো, “মহিলার সাহসের তারিফ না কইরা পারতাছি না।”
“জি, স্যার।” ফোনের ওপাশ থেকে সায় দিলো ছফা। বেনাপোল দিয়ে দেশে ঢুকতেই মনে হলো, মুশকানকে খুঁজে বের করার ব্যাপারে আপনার কাছে আমি ঋণী। আপনিই বলেছিলেন, সুন্দরপুর থেকে তদন্তটা আবার নতুন করে শুরু করতে, মহিলার বদঅভ্যেসটা ফলো করতে, আর। সে কারণেই আমি মুশকানের হদিস বের করতে পেরেছি।”
“কী যে বলেন না, বিনয়ের সাথেই বললো মি. খান। “আমি আবার কী হেল্প করলাম! সব তো করলেন আপনে। আমার দেখা সবচায়া কঠিন একটা কেস ছিলো এইটা…শেষ পর্যন্ত আপনে সলভ করবার পারলেন। কংগ্রাচুলেশন্স, ছফা। ইউ ডিড অ্যা গুড জব…অ্যাবসলিউটলি ব্রিলিয়ান্ট।”
“থ্যাঙ্ক ইউ, স্যার।”
“এখন যতো তাড়াতাড়ি পারেন, ঐ মহিলারে অ্যারেস্ট কইরা ঢাকায় নিয়া আসেন। আর একটু সতর্ক থাকবেন, আগেরবারের মতো যে না হয়।”
“জি, স্যার।”
“আর আমার ঐ কথাটা ভুইলা যায়েন না কিন্তু,” মনে করিয়ে দিয়ে বললেন খোদাদাদ শাহবাজ খান।
“কোন কথাটা, স্যার?” বুঝতে না পেরে বললো ছফা।
“ঐ যে…মুশকারে অ্যারেস্ট করার পর তারে ভুলেও জিগায়েন না, কোন অর্গানটা খাইলে…বুঝবারই তো পারছেন।”
“বুঝতে পেরেছি। আমি সেটা করবো না, আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন।”
“ঢাকায় আসেন…আপনের মুখ থেইকা ডিটেইল শুনতে হইবো সবটা।”
“জি, স্যার।”
ফোনের রিসিভারটা বুকের কাছে রেখে কয়েক মুহূর্তের জন্য উদাস হয়ে রইলো কেএস খান। মুশকান জুবেরির এমন নাটকীয় আচরণ তাকে বিস্মিত করেছে। মহিলা সম্পর্কে যতোটুকু জেনেছে, তাতে করে এমন কাজ করার কথা নয়। কিন্তু তারপরও কথা থাকে-মানুষ সব সময় নিজের সর্বোচ্চ বুদ্ধি আর কাণ্ডজ্ঞান দিয়ে কাজ করে না-বেশির ভাগ সময়ই তাকে পরিচালিত করে আবেগ, রাগ-ক্ষোভ, হতাশা, উচ্চাভিলাষীতা, প্রতিশোধপরায়ণতা আর প্রেম-বিরহ। না জানি আরো কতো কী! একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তার ভেতর থেকে।
সম্বিত ফিরে পেয়ে আইনস্টাইনের ঘরের দিকে তাকালো। “ফ্লাস্কটা লইয়া চা নিয়া আয় তো…মাথাব্যথায় মইরা যাইতাছি।” বেশ জোরে বললো কথাটা, যাতে করে মটু পাতলু কার্টুনের শব্দ ছাপিয়ে ছেলেটার কানে সেটা পৌঁছায়।
“আইচ্ছা।” ঘরের ভেতর থেকে আইনস্টাইনের কণ্ঠটা ভেসে এলো।
মাথাব্যথার মতো বিচ্ছিরি যন্ত্রণার মধ্যেও কেএস খানের মুখে ফুটে উঠলো প্রসন্ন হাসি। অবশেষে মুশকান জুবেরির রহস্য অবসান হতে চলেছে। মহিলা নতুন পরিচয়ে, নতুন একটা মুখ নিয়ে আবারো ফিরে গেছে সুন্দরপুরে-আর ছফা সেটা উদঘাটনও করে ফেলেছে।
অবিশ্বাস্য!
.
অধ্যায় ৬৬
রমাকান্তকামার এ জীবনে কখনও সন্দেহগ্রস্ত হননি তা নয়, তবে এর আগে আর কখনও এই বাতিক তাকে এতোটা গ্রাস করেনি। সন্দেহগ্রস্ততা সব সময়ই সযত্নে এড়িয়ে চলেছেন তিনি।
লাইব্রেরির ছোট্ট অফিস ঘরের জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন। এখনও চার-পাঁচজন পাঠক বইয়ে নিমগ্ন। এরকম দৃশ্য দেখতে তার বেশ ভালো লাগে, তবে অন্যদিনের মতো আজকে সেটা হলো না। সন্দেহগ্রস্ততার পাশাপাশি দুশ্চিন্তা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। না চাইলেও, কখনও কখনও সন্দেহ জোর করে অক্টোপাসের মতো জাপটে ধরে, এর থেকে নিস্তার পাওয়া যায় না।
একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তার ভেতর থেকে।
সুস্মিতার সাথে ডাক্তার আসকারের সম্পর্কটা নিয়ে মাস্টারের মনে এক ধরণের সন্দেহ তৈরি হয়েছিলো গতকালই। ডাক্তার ভদ্রলোক তাকে বলেছিলেন, সুস্মিতা তার এক প্রয়াত বন্ধুর মেয়ে হয়। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, আদতে তাদের সম্পর্কটা অনেক বেশি গভীর।
