“আচ্ছা, দিদি,” কথাটা বলেই পাশের ঘরে চলে গেলো ছেলেটা।
ফোনটা হাতে নিয়ে উবার ডাকলো সে। মিনিটখানেক পরই ড্রাইভার কল দিলে তাকে এই বাড়ির লোকেশন জানিয়ে দিলো।
ফোনের ডিসপ্লেতে নেভিগেশন বলে দিচ্ছে, উবারের ড্রাইভার ঠিক মতোই এগোচ্ছে। অ্যারাইভাল টাইম পাঁচ মিনিট।
কিছুক্ষণ পরই শ্যামলকে সঙ্গে নিয়ে নীচে চলে গেলো সে। ছেলেটার হাতে ছোট্ট একটা লাগেজ।
বাড়ির কেয়ারটেকার ওয়াহাব তাদেরকে দেখেই মেইনগেটটা খুলে দিলো। গেটের বাইরে কালো রঙের একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। ওয়াহাবকে দুশো টাকা বখশিস দিয়ে বের হয়ে গেলো সে।
পেছনের সিটে শ্যামলকে নিয়ে বসতেই সানক্যাপ পরা উবারের ড্রাইভার গাড়িটা স্টার্ট দিয়ে দিলো।
গভীর করে নিশ্বাস নিয়ে আশেপাশে তাকালো। ঢাকা শহরের অন্য। অংশের তুলনায় বনানী বেশ ছিমছাম। তারপরও এখানে থাকতে পারেনি বেশিদিন।
এবার ফোনের দিকে নজর দিলো, যথারীতি ব্যস্ত হয়ে পড়লো ফেসবুক নিয়ে। তার পাশে চুপচাপ বসে ঢাকা শহর দেখে যাচ্ছে শ্যামল। এর আগে ছেলেটা কখনও ঢাকায় আসেনি, তার কাছে নিশ্চয় শহরটা ভালোই লাগছে।
খুব দ্রুতই ফেসবুকের বিচিত্র সব মানুষজনের বিচিত্র সব পোস্ট আর কমেন্টে হারিয়ে গেলো সে। তার কাছে মনে হয়, এই ভার্চুয়াল দুনিয়ার বেশির ভাগ মানুষই নানান রকম মানসিক রোগে আক্রান্ত। সোশ্যাল নেটওয়ার্কের এই আসক্তি তাকেও রেহাই দেয়নি। সেই আর্টিকেলের কথাটা আবারো মনে পড়ে গেলো। ওটাতে গবেষকেরা জানিয়েছে, মদ্যপান আর জুয়াখেলায় আসক্ত হলে মানুষের মস্তিষ্কে নাকি এক ধরণের পদার্থ নির্গত হয়-নামটা এ মুহূর্তে মনে করতে পারছে না সে-ঐ একই পদার্থ ফেসবুক আসক্তির বেলায় প্রায় তিনগুণ বেশি নির্গত হয়!
পরিহাসের হাসি ফুটে উঠলো তার ঠোঁটে। আমি জেনেশুনে বিষ করেছি পান! মাথার ভেতরে গুনগুনিয়ে উঠলো গানটা।
হঠাৎ করে তার মাথায় আরেকটি চিন্তার উদ্রেক হলো। বিষে বিষ ক্ষয়! পুরনো বাংলা প্রবাদ এটি, খনার বচন কিনা সে জানে না-যাই হোক, সেটা যদি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে অতিরিক্ত ফেসবুক আসক্তি দূর করতে হলে আরো বেশি করে আসক্ত হবার দরকার আছে, নাকি? বেশি আসক্তির ফলে একঘেয়েমী চলে আসতে পারে। এভাবে কেটে যেতে পারে আসক্তিটা!
মনে মনে হেসে ফেললো সুস্মিতা। এটা হলো মানুষের মস্তিষ্কের সেই অংশের কারসাজি, যেটা সব রকম অনিয়ম আর অন্যায়ের পক্ষে সাফাই গায়, যুক্তি খুঁজে বেড়ায়। তার মধ্যে এই যে চিন্তার উদ্রেক হয়েছে, সেটাও মস্তিষ্কের সেই অংশের কাণ্ড!
মাথা থেকে চিন্তাটা ঝেটিয়ে বিদায় করার আগেই প্রবলভাবে ঝাঁকি খেলো সে। সামনের দিকে হুরমুর করে ছিটকে গেলো, হাত থেকে পড়ে গেলো তার স্মার্টফোনটা। অবিশ্বাসে চেয়ে দেখলো, একটা বাড়ির ড্রাইভওয়েতে হার্ড ব্রেক করে থেমে পড়েছে উবারের গাড়িটা!
ড্রাইভারকে যেই না বলতে যাবে, কী হয়েছে-তার আগেই দেখতে পেলো অবিশ্বাস্য একটি দৃশ্য! উবারের ড্রাইভারের হাতে পিস্তল! আর সেটা তা করে রেখেছে ঠিক তার দিকেই!
চিৎকারটা না দিয়ে পারলো না সে।
“একদম চুপ!” উবারের ড্রাইভার পিস্তলটা নেড়ে ধমকের সুরে বললো। “আওয়াজ করলেই গুলি করে দেবো!”
মুখে হাতচাপা দিলো সে। এদিকে মূর্ছা যাবার উপক্রম হলো শ্যামলের। জীবনে কখনও এরকম পরিস্থিতিতে পড়েনি সে।
.
অধ্যায় ৬৫
লাঞ্চের পর আয়েশ করে এক চা কাপ খাওয়া খোদাদাদ শাহবাজ খানের বহু পুরনো অভ্যাস। শরীর ভালো থাকুক আর খারাপ, চা কখনও বাদ যায় না। আজ ঘুম থেকে তীব্র মাথাব্যথা নিয়ে ওঠার পরই বুঝতে পেরেছিলো, সারাটা দিন মাথার উপর দিয়েই যাবে! গতকাল এটা গিয়েছিলো ঘাড়ের উপর দিয়ে!
আইনস্টাইনকে চা আনতে পাঠাবে কিনা বুঝতে পারছে না। একটু আগেই দুপুরের খাবার খেয়েছে, এখন যদি চায়ের কথা বলে পিচ্চি আইনস্টাইন বয়োজ্যেষ্ঠদের মতো শাসন করে বলবে, এই অবেলায় চা খাওয়া ঠিক না।
মুচকি হাসি ফুটে উঠলো কেএস খানের ঠোঁটে। দিন দিন ছেলেটার খবরদারি বাড়ছে-আর সে-ও এটা উপভোগ করে। সবাই কমবেশি শাসিত হয় কিন্তু কয়জনের ভাগ্যে ভালোবাসার শাসন জোটে?
নিজের সিঙ্গেল বিছানাটায় বসে আছে সে। এই অখণ্ড অবসর বই পড়ে কাটিয়ে দেয়া যায় খুব সহজে, কিন্তু মাথাব্যথা সেটা থেকে বিরত রাখছে তাকে। তার শরীর যতো খারাপই হোক, বই পড়ায় বিরতি দেয় না কখনও, কিন্তু মাথাব্যথা হলেই ছেদ পড়ে তাতে।
বিছনায় বসে উসখুস করতে লাগলো কেএস খান। ঘুমিয়ে যে সময় পার করবে সেটাও সম্ভব হচ্ছে না। অবেলায় তার ঘুম আসে না কখনও। কিছু একটা করা দরকার, কিন্তু কী করবে সেটাই বুঝতে পারছে না। নতুন একটা মোবাইলফোন কিনেছে গতকাল, সেই সাথে সিমও। কিন্তু এখন পর্যন্ত কেউ তার এই নতুন নাম্বারের কথা জানে না। ডাক্তার লুবনাকে ফোন করবে কিনা বুঝতে পারলো না। তার খুব ইচ্ছে করছে মেয়েটার সাথে কথা বলতে। কিন্তু এ সময় হাসপাতালের ডিউটিতে ব্যস্ত আছে সে।
এমন সময় তার ল্যান্ডফোনটার রিং বেজে উঠলে খুশি হলো কেএস খান। রিসিভারটা ক্রাডল থেকে তুলে নিলো সঙ্গে সঙ্গে।
“হ্যালো?”
“স্লামালেকুম, স্যার,” ফোনের ওপাশ থেকে বললো নুরে ছফা।
“ওয়ালাইকুম সালাম,” ওপাশ থেকে সালামের জবাব দিলো সে।
