সেলফোনের রিংয়ের শব্দ আসলামের অতীত চিন্তায় ব্যাঘাত ঘটালো। পকেট থেকে ফোনটা বের করেই দেখতে পেলো পিএস কল করেছে।
“জি, স্যার?”
“কি অবস্থা?”
“বাড়ির বাইরে আছি…ওরা কেউ বের হয়নি।”
“শোনো, আমাদের প্ল্যানে একটু পরিবর্তন করতে হচ্ছে। তোমাকে এখন একটা কাজ করতে হবে খুবই সাবধানে।
“বলুন, স্যার,” উদগ্রীব হয়ে বললো আসলাম। তারপর ওপাশ থেকে শুনে গেলো পিএসের নতুন প্ল্যানের কথা। তবে খুব একটা অবাক হলো না সে। আগেই জানতো, এরকম কিছু করার দরকার হতে পারে। পিএসের কথা শোনার পর সে বললো, “কোনো সমস্যা নেই।”
“গুড। লোকেশন আগেরটাই, ওকে। তাহলে সেলিম আর বদরুলকে পাঠিয়ে দেই?”
“না, স্যার…দরকার নেই। আমি একাই পারবো।”
“একাই পারবে?!” অবাক হলো পিএস।
“জি, স্যার।” আশ্বস্ত করে বললো সে। “আপনি নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন।”
কয়েক মুহূর্তের জন্য ফোনের ওপাশে নীরবতা নেমে এলো। “ওকে…সাবধানে কাজটা কোরো।”
“ঠিক আছে, স্যার।”
ফোনটা কেটে গেলে আসলাম তার সমস্ত মনোযোগ নিবদ্ধ করলো বাড়িটার দিকে। তার বসের কোনো ধারণাই নেই কতো সহজে আর নিখুঁতভাবে কাজটা করবে সে। এই জীবনে একটা কাজেই ঝামেলা পাকিয়ে ফেলেছিলো, আর সেটাই তাকে বিরাট রকমের শিক্ষা দিয়ে দিয়েছে। বার বার ভুল করার মতো লোক সে নয়।
বাড়িতে ঢুকে একটা হট্টগোল সৃষ্টি করার চেয়ে আসলাম যেটা করবে সেটা অনেক বেশি বুদ্ধিদীপ্ত আর শৈল্পিক হবে।
এখন শুধু ঠাণ্ডা মাথায় অপেক্ষা করার পালা।
.
অধ্যায় ৬৪
রাতে ভালো ঘুম হয়নি সুস্মিতার। ওষুধ ছিলো না বলে সরাটা রাত জেগে জেগে কাটাতে হয়েছে। তবে ফেসবুক আর মেসেঞ্জারে মশগুল না থাকলে ঘুমটা ঠিকই আসতো।
সত্যি বলতে, আগে তার এই বদঅভ্যেস ছিলো না। কিন্তু এই নিঃসঙ্গ জীবনে ভার্চুয়াল দুনিয়াই হয়ে উঠেছে তার একমাত্র সঙ্গি। রীতিমতো আসক্তির পর্যায়ে চলে গেছে এটা। একটু পর পর ফেসবুকে আর মেসেঞ্জারে ঢু মারাটা তার বাতিক হয়ে গেছে। ক-দিন আগে নেটে একটা আর্টিকেল পড়েছিলো, হারভার্ডের এক দল গবেষক নাকি দীর্ঘদিন রিসার্চ করে দেখেছে, ১৬ থেকে ৩০ বছরের ছেলেমেয়েদের ৪৫% প্রায় সারাক্ষণই কোনো না কোনো অনলাইন সাইটে ঢু মারে। গড়ে ৯ ঘণ্টা সময় ব্যয় করে এসবের পেছনে। প্রতিদিন এরা গড়ে ৯৬ বার ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটার, ইন্সটাগ্রাম আর মেসেঞ্জারসহ বিভিন্ন সাইটে ঢু মারে। ত্রিশের উপরে যারা আছে, তাদের আসক্তির হারও অবিশ্বাস্য রকমের বেশি দিনে ৩৫ বার। স্বাভাবিক মানসিক সুস্থতার জন্য টু মারার এই হারটা নাকি ১০-এর নীচে থাকা বাঞ্ছনীয়।
প্রথমে তার বিশ্বাসই হয়নি। ৩৫ থেকে ৯৬ বার! এতো! নিজেকে প্রশ্ন করেছিলো সে : কী করে সম্ভব! এটা হতেই পারে না। সে বড়জোর ৭/৮ বার ঢু মারে, এর বেশি না। কিন্তু হারভার্ডের মতো প্রতিষ্ঠানের উপর তার অগাধ আস্থা রয়েছে, তাই নিজের আসক্তিটা কোন পর্যায়ে রয়েছে সেটা যাচাই করে দেখেছিলো খুবই নিরপেক্ষ আর নির্মোহ উপায়ে। অ্যাডডিটেক্ট” নামের ছোট্ট একটি অ্যাপস নামিয়ে ইন্সটল করে নিয়েছিলো-ঐ আর্টিকেলেই দেয়া ছিলো অ্যাপসটার লিঙ্ক-ওটার কাজই হলো, ইউজার কতো বার কোন্ সাইটে কখন টু মারলো সে হিসেব রাখা। ইন্সটল করার পর দিন সকালে খুব অবাক হয়ে দেখে, আগের দিন ৮৮ বার ঢু মেরেছে! সে কোনো টিনএজার নয়, তার জন্য সংখ্যাটা অনেক অনেক বেশি!
যাই হোক, রাতে ঘুমোতে যাবার আগেও এই স্মার্টফোনটা থাকে তার হাতে। আর নিদ্রাহীনতার কারণও এটাই! তবে গতকাল সে পণ করেছিলো ঘুমোতে যাবার আগে ফেসবুক-মেসেঞ্জারে ঢু মারবে না। কারণ পরদিন এয়ারপোর্টে যেতে হবে তাকে। ঢাকা টু যশোর, তারপর ওখান থেকে সোজা চলে যাবে সুন্দরপুরে। তার ছোটো ছোটো ছাত্রছাত্রিদের খুবই মিস্ করছে। তাছাড়া ঢাকা শহর তার একটুও ভালো লাগে না। শহরটার শব্দ, গন্ধ, দৃশ্য-কোনোটাই সহ্য হয় না তার। সুন্দরপুরের মনোরম পরিবেশ আর প্রকৃতির মধ্যেই আপাতত থিতু হয়েছে সে।
কিন্তু যে পণ করেছিলো সেটা আর রাখতে পারেনি-রাত দুটো পর্যন্ত ফেসবুক-মেসেঞ্জারে ঢু মেরেছে। কেন করেছে সে নিজেও জানে না। যেমন জানে না এ গ্রহের শত-কোটি মানব সন্তান।
এখন ঢুলু ঢুলু চোখে বিছানায় শুয়ে আড়মোড়া ভেঙে দেয়াল ঘড়িতে তাকালো। প্রায় বারোটা। এখনও আলসেমি ছাড়েনি তাকে। বিছানায় একটু গড়াগড়ি দিলো। উঠতে চাইছে না। তার হাতে এখনও দু-ঘণ্টার মতো সময় আছে। তারপর ঢাকা শহর বলে কথা। অনেক জ্যাম হয় এয়ারপোর্ট রোডে, হাতে তাই সময় নিয়ে বেরোতে হবে। অগত্যা জোর করেই বিছানা থেকে শরীরটা তুলে বাথরুমের দিকে পা বাড়ালো।
আধঘণ্টা পর পুরোপুরি ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে এলো সে। সকালে শাওয়ার না নিলে তার ভালো লাগে না। এটা দীর্ঘদিনের অভ্যেস। গায়ে একটা টি-শার্ট আর ট্রাউজার পরে ড্রইংরুমে এসে দেখলো শ্যামল টিভি দেখছে চুপচাপ।
“ব্রেকফাস্ট করেছো, শ্যামল?”
“হ্যাঁ, দিদি।” হাসি দিয়ে বললো ছেলেটা। “আপনিও করে নেন। টেবিলে নাস্তা রেডি…এতোক্ষণে ঠাণ্ডা হয়ে গেছে মনে হয়।”
প্রসন্নভাবে হেসে ডাইনিং টেবিলে চলে গেলো সে। নাস্তা শেষ করে আরো পনেরো মিনিট সময় নিলো জামা-কাপড় পাল্টাতে। ড্রইংরুমে এসে বললো, “আমরা এক্ষুনি বের হচ্ছি।”
