“এই যে, দেখো,” ফোনটা ছফার দিকে বাড়িয়ে দিলো সুশোভন।
ফোনের ডিসপ্লেতে যে ছবিটা দেখতে পাচ্ছে সেটা নুরে ছফাকে রীতিমতো ঝাঁকুনি দিলো যেনো। বিস্ময়ে চোখ দুটো বিস্ফারিত হবার উপক্রম হলো তার।
“মাই গড!” তার মুখ দিয়ে অস্ফুট ধ্বণি বের হয়ে গেলো।
.
অধ্যায় ৬৩
ঢাকায় ডাক্তার আসকার ইবনে সায়িদের বনানীর বাড়ি থেকে একটু দূরে কালো রঙের একটি প্রাইভেট কারে বসে আছে আসলাম। সকাল এগারোটা থেকে ধৈর্য নিয়ে ডুপ্লেক্স বাড়িটার দিকে নজর রাখছে সে। বাড়িতে যে ঐ মেয়েটা আছে সেটা জানে। সঙ্গে আছে আরেকটা ছেলে। এখন পর্যন্ত দারোয়ান একবারের জন্যেও গেটের কাছে আসেনি। মেইনগেটের নীচে, মেঝে থেকে যেটুকু ফাঁক আছে সেখানে কড়া নজর রেখেছে সে, কোনো মানুষজনের পা দেখতে পায়নি।
এই বিশাল বাড়িতে মাত্র তিনজন মানুষ আছে এখন-দু-জন পুরুষ আর এক তরুণী। আসলাম মেয়েটার সাহসের প্রশংসা করলো মনে মনে। দু দুটো সিংহের সাথে একই খাঁচায় একটা হরিণ কিভাবে অক্ষত থাকে! সে নিজেও একজন পুরুষ মানুষ, ভালো করেই জানে, এরকম অবস্থায় বেড়ালও সিংহ হয়ে যেতে পারে। আর সেই সিংহ প্রথমেই ঝাঁপিয়ে পড়বে হরিণের উপরে। ছিঁড়ে খুবলে খাবে তাকে।
তার বস পিএস আশেক মাহমুদ গোপন এক সূত্র থেকে খোঁজ নিয়ে জেনেছে, ঐ তরুণী ডাক্তারের খুবই ঘনিষ্ঠ কেউ হয়। যদি তা-ই হয়ে থাকে, তাহলে এই বিশাল বাড়িতে মেয়েটার কোনো ক্ষতি করার সাহস হয়তো করবে না কেউ। তারপরও কথা থাকে, পুরুষগুলোর যদি মতলব খারাপ হয়, তাহলে যেকোনো কিছুই ঘটে যেতে পারে। বহু বছর আগে এক শিল্পপতির মেয়ের ধর্ষণ এবং হত্যাকাণ্ডের কথাটা মনে পড়ে গেলো তার। বাড়ির কাজের লোকেরাই করেছিলো জঘন্য কাজটা। শিল্পপতি ভেবেছিলেন, এতোগুলো কাজের লোক-যাদের মধ্যে মেয়েছেলেও আছে-তার মেয়েটা নিরাপদেই থাকবে। কিন্তু সেটা হয়নি। কিশোরী মেয়েটাকে ধর্ষণ করার পর হত্যা করে ধর্ষকের দল।
ঐ মেয়েটাকে দেখে তার অন্য একজনের কথা মনে পড়ে গেছিলো, যার সাথে তার এখন কোনো সম্পর্কই নেই।
মনীষা দেওয়ান!
একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো আসলামের ভেতর থেকে। পুলিশের চাকরিতে ইস্তফা দেবার আগে রাঙামাটি থানাই ছিলো তার শেষ পোস্টিং। সন্তানের স্কুল বদলাতে হবে বলে তার স্ত্রী আর রাঙামাটিতে আসেনি, ঢাকাতেই নিজের বাপ-মায়ের কাছে থেকে গেছিলো। আসলামও এ নিয়ে জোর করেনি। বিয়ের কয়েক বছর পর থেকেই স্ত্রীর সাথে তার শীতল সম্পর্ক। তাদের বিয়েটা হয়েছিলো পারিবারিকভাবে, বাবা-মায়ের পছন্দে। কিন্তু বিয়ের দু-বছরের মাথায় এসে আসলাম যখন জানতে পারে তার স্ত্রী সোমার সাথে এক ছেলের সম্পর্ক আছে, ততোদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। তাদের প্রথম এবং একমাত্র সন্তান আরাফ তখন মায়ের পেটে বেড়ে উঠছে। তার স্ত্রী স্বীকার করে বলেছিলো, কলেজ জীবনের বন্ধু, এর বেশি কিছু না। নিছক খোঁজখবর নেবার জন্য ফোন দেয় ছেলেটা। আসলাম বিশ্বাস করেছিলো তার স্ত্রীকে কিন্তু সন্তান জন্মাবার পরও সোমা তার সেই কথিত বন্ধুর সাথে গোপনে যোগাযোগ রাখতো। আসলামের মনে সন্দেহের সৃষ্টি হলে সে ইনফর্মার লাগিয়ে হাতেনাতে ধরে ফেলে স্ত্রীকে। এর পর তাদের সন্তানের মাথা ছুঁয়ে কসম খেয়ে সোমা বলেছিলো, ঐ ছেলের সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। সে আর যোগাযোগও রাখবে না ওর সাথে। আসলাম আবারো বিশ্বাস করেছিলো স্ত্রীর কথা, ক্ষমাও করে দিয়েছিলো। কিন্তু বছর গড়াতেই টের পায়, ভেতরে ভেতরে স্ত্রীর এই ব্যাপারটা মেনে নিতে পারেনি সে। তার ভেতরে ছাইচাপা আগুন ঠিকই জ্বলছিলো।
পুলিশের জীবনে অনেক লাশ দেখেছে আসলাম। সব লাশই বরফের মতো হিম শীতল হয়ে থাকে। ঠিক সেভাবে, সম্পর্কের মৃত্যু ঘটলেও সেটা ধীরে ধীরে শীতল হতে থাকে। এক সময় বরফ-শীতল হয়ে ওঠে। ধৈর্য কিংবা অভিনয় দিয়ে সেই শীতলতা বেশি দিন সহ্য করা যায় না।
তো, এমন সময় রাঙামাটিতে পোস্টিং হলে অনেকটা স্বস্তি পেয়েছিলো সে। স্ত্রীর অভাব বোধ করতো না, তবে তার সন্তান আরাফের জন্য খুব খারাপ লাগতো। রাঙামাটি থানা থেকে নিজের বিশাল কোয়ার্টারে ফিরে এসে নিঃসঙ্গ সময় কাটাতো আসলাম। কালেভদ্রে তার স্ত্রী খোঁজ নিতো। আর যখন নিতো, তখন সেটার মধ্যে কোনো আন্তরিকতা খুঁজে পেতো না। তার কাছে মনে হতো পুরোপুরি আন্তরিকতাবিবর্জিত একটি ফোনকল-দায় সেরে নেবার জন্যই করা।
এরকম নিঃসঙ্গ আর একাকী সময়েই তার সাথে পরিচয় হয় কলেজ পড়ুয়া মনীষা দেওয়ানের সঙ্গে। মিষ্টি চেহারার হালকা-পাতলা গড়নের এই চাকমা মেয়েটি তার হৃদয় হরণ করে ফেলে খুব দ্রুত। চমৎকার বাংলা বলতো মনীষা। এই মেয়ে তাকে যে ভালোবাসা দিয়েছিলো সেটার কোনো তুলনাই হয় না। আসলাম সেই প্রথম সত্যিকারের ভালোবাসার দেখা পেয়েছিলো। তার এমন আহামরি সম্পদ ছিলো না যে, নিজের চেয়ে বয়সে অনেক বড় কারোর সাথে প্রেম করতে যাবে মনীষা। বয়স-জাতি-ধর্ম সব পার্থক্য ঘুচিয়ে দিয়েছিলো মনীষার সেই অপ্রতিরোধ্য নিখাদ ভালোবাসা। এমন ভালোবাসা পেয়ে তার উচিত ছিলো সব কিছু ভুলে যেয়ে স্ত্রীকে ক্ষমা করে দেয়া, কিন্তু আসলাম সেটা করেনি। মাথা গরম করে হুট করেই একদিন এমন একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে, যেটা তার জীবনটাই পাল্টে দেয়।
