“হুম,” আস্তে করে বললো সুশোভন।
“মেয়েটা বৃটিশ সিটিজেন,” একটু থেমে আবার বললো ইন্সপেক্টর, “ও আমাকে বলেছে, বাবার সাথে ওর কোনো সম্পর্ক নেই। ওর মা কখনও বাবার নামও বলেনি। আমার কাছে এটা ক্রেডিবল মনে হয়নি, স্যার।”
ছফা আর সুশোভনের মধ্যে চোখাচোখি হলো। তাদের কাছেও এটা অবিশ্বাস্য লাগছে।
“এ কারণে আমি মেয়েটাকে তখনই বলে দিয়েছিলাম, লোকাল থানায় ইনফর্ম না করে যেনো কলকাতার বাইরে না যায়।”
মাথা নেড়ে সায় দিলো নগরপাল। “ও কোথায় গেছে বলে আপনি মনে করছেন?”
“নিশ্চিত করে তো বলতে পারবো না, স্যার। তবে ভারতবর্ষ অনেক বড়…সম্ভবত অন্য কোনো রাজ্যে চলে গেছে।” একটু থেমে আবার বললো, “আমার ধারণা ওকে পালাতে সাহায্য করেছে ওর বাবা।”
অবাক হলো সুশোভন। “ওর বাবা!”
“হ্যাঁ, স্যার।”
“আপনি না বললেন, ওর বাবার সাথে ওর কোনো সম্পর্ক নেই…এমন কি নামটাও জানে না?”
“মেয়েটা আমাকে সেরকমই বলেছিলো কিন্তু আগের দারোয়ান আমাকে বলেছে, মেয়েটার বাবা সল্টলেকের বাসায় মাঝেমধ্যেই আসতো।”
ভুরু কপালে তুলে পাশ ফিরে তাকালো সুশোভন। ছফারও একই অবস্থা। উদগ্রীব হয়ে বাকিটা শুনতে চাইছে সে।
“ও কেন ওর বাবার পরিচয় লুকোলো সেটা আমার কাছে খুবই রহস্যময় লেগেছে।”
“হুম,” মাথা নেড়ে সায় দিলো সহকারী নগরপাল।
“বাবার নামটা কি বের করতে পেরেছিলো, অফিসার?” সুশোভনের কানে ফিসফিসিয়ে বললো ছফা।
“ওর বাবার নামটা কি আপনি বের করতে পেরেছিলেন?”
“হ্যাঁ, স্যার। ঐ দারোয়ানই আমায় বলেছিলো, ভদ্রলোক নামকরা ডক্টর…লন্ডনে থাকেন। আসকার না কী যেনো নাম বলেছিলো আমায়। ফাইল দেখে নিশ্চিত করে বলতে পারবো।”
কথাটা শুনে সোজা হয়ে বসলো ছফা। সে এখন পুরোপুরি নিশ্চিত-এই সুস্মিতা আসলে কে! এ নিয়ে তার মধ্যে আর কোনো সংশয় নেই!
.
অধ্যায় ৬২
দৃশ্যপটে ডাক্তার আসকারের আবির্ভাব নুরে ছফাকে খুব একটা বিস্মিত করেনি। সে ঢাকায় থাকতেই বুঝে গেছিলো, এই ভদ্রবেশি ডাক্তার মুশকানের একমাত্র সহযোগী।
এখন ছফার কাছে সবটাই পরিস্কার। মুশকানকে মেয়ের পরিচয় দিয়ে কলকাতায় নিজের শ্বশুড়ালয়ে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন ডাক্তার। তারপর পূর্ব-পরিচিত এক প্লাস্টিক সার্জনকে দিয়ে মুশকানের চেহারাটাও পাল্টে ফেলার আয়োজন করেন। কাজশেষে, চেহারা পাল্টানোর কথাটা চিরতরে গোপন রাখার জন্য ঐ সার্জনকে হত্যা করে মহিলা।
সুশোভন এখনও ফোনে কথা বলে যাচ্ছে অতনু মজুমদার নামের পুলিশ অফিসারের সঙ্গে। ছফা আবারো তাদের ফোনালাপে মনোযোগ দিলো।
“ওকে,” বললো সুশোভন মিত্র। “থ্যাঙ্ক ইউ, ফর ইওর কোঅপারেশন।” কলটা কেটে দিয়ে ছফার দিকে তাকালো সে। “কী বুঝলে?”
“আমি জানতাম মুশকান জুবেরি আমেরিকান সিটিজেন, এখন দেখছি তার বৃটিশ পাসপোর্ট আছে।”
“আমেরিকান পাসপোর্ট হোল্ডারদের পক্ষে বৃটিশ সিটিজেনশিপ বাগানোটা কী আর এমন কঠিন কাজ।”
মাথা নেড়ে সায় দিলো ছফা। অন্য একটা কথা মনে পড়ে গেছে তার। ডাক্তার আসকারও তাকে বলেছিলেন, আন্দিজের কথা জানাজানি হয়ে গেলে মুশকান আমেরিকা ছেড়ে বৃটেনে চলে যায়। তবে ডাক্তারের নতুন এই গল্পে ঐ মুশকান হলো মুশকান জুবেরির মা! ভদ্রলোকের নতুন গল্পটি জটিল আর দুর্বোধ্য গোলকধাঁধা তৈরি করেছে। মুশকান যদি রুখসান হয়ে থাকে, মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ভক্ষণ করে চিরযৌবন লাভের কথাটা যদি সত্যি না হয়ে থাকে, তাহলে কলকাতায় এসে মুশকান কেন পুরুষ শিকার করলো? চেহারাই বা পাল্টানোর চেষ্টা করবে কেন? চেহারা পাল্টানোর ব্যাপারটা গোপন রাখার জন্য যদি ডিপি মল্লিককে হত্যা করে থাকে, তাহলে সুকুমার রঞ্জনকে কেন শিকার বানাতে গেলো?
তার মানে, ডাক্তার আসকার সুকৌশলে সত্য-মিথ্যার মিশেলে এমন এক গল্পের অবতারনা করেছেন, ছফা যাতে বিভ্রান্ত হয়। ডাক্তারের কোন কথাটা সত্য আর কোনটা মিথ্যে তা জানতে হলে, মুশকান জুবেরির রহস্যের সবগুলো পাজলের টুকরো মেলাতে চাইলে ঐ মহিলাকে হাতের মুঠোয় নিতে হবে সবার আগে।
“এখন কী করবে তাহলে?”
সম্বিত ফিরে পেয়ে সুশোভনের দিকে তাকালো ছফা।
“অতনু সল্টলেকের বাড়ির ঠিকানাটা টেক্সট করে দিয়েছে, নিজের ফোনের দিকে তাকিয়ে বললো সহকারী নগরপাল। “যদিও সরেজমিনে গিয়ে একবার দেখা উচিত কিন্তু ওখানে গিয়ে তো কোনো লাভ হবে বলে মনে হচ্ছে না।”
মাথা নেড়ে সায় দিলো নুরে ছফা। “আমিও সেটাই ভাবছি।” “টেনশনে আছে মনে হচ্ছে… সিগারেট খাবে?”
“হুম,” সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলো ছফা।
পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে একটা বাড়িয়ে দিলো ছফার দিকে। দু-জনেই সিগারেট ধরিয়ে চুপচাপ বসে রইলো কয়েক মুহূর্ত।
“তুমি যে এতো তাড়াতাড়ি সাসপেক্টকে ট্রেস করতে পারবে আমি কিন্তু আশা করিনি,” সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে সহকারী নগরপাল বললো।
“এজন্যে তোমার কাছে আমি ঋণী। তুমি অনেক হেল্প করেছে, দাদা। তুমি না থাকলে এটা কোনোভাবেই সম্ভব হতো না।”
প্রসন্ন হাসি দিলো সুশোভন, কিছু বলতে যাবে অমনি তার ফোনটা বিপ করে উঠলো। “অতনু মনে হয় সাসপেক্টের ছবি পাঠিয়েছে।”
কথাটা শোনামাত্রই উন্মুখ হয়ে উঠলো ছফা। মুশকান জুবেরি তার চেহারা পাল্টে কি অবস্থায় আছে সেটা দেখার তর সইছে না তার।
