“ফাইল দেখে ডিটেইল বলা যেতো…এখন যতোটুকু মনে আছে। ততোটুকুই বলতে পারবো।”
“সমস্যা নেই, বলুন।”
একটু থেমে ফোনের ওপাশ থেকে বলতে শুরু করলো অতনু মজুমদার, “তদন্তের শুরুর দিকে সুকুমারের পরিচিত অনেককে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানতে পারি, ও প্রায়ই সল্টলেকে যেতো সাসপেক্টের বাড়িতে, বন্ধুবান্ধব মিলে গান-বাজনা করতো, মাস্তি করতো,” একটু থেমে আবার বললো, “তো, ওর এক বন্ধু আমাকে জানালো, ঘটনার দিন সুকুমার ওর কাছ থেকে বেশ ভালো ব্র্যান্ডের একটি হুইস্কির বোতল নিয়েছিলো সুস্মিতাকে গিফট দেবে বলে। আমি সেই সূত্র ধরেই মেয়েটার বাড়িতে গেছিলাম।”
“তারপর?”
“মেয়েটা যেহেতু অস্বীকার করেছিলো সুকুমার ঐদিন ওর ওখানে যায়নি, তাই আমি এটা ডাবল চেক করে দেখলাম। মেয়েটার বাসায় যে দারোয়ান ছিলো তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানতে পারলাম, সে কদিন আগে জয়েন করেছে…মানে, ঐ ঘটনার পরে। আমার তখন সন্দেহ হলো। আশেপাশের বাড়ির দারোয়ানদের সাথে কথা বলে আগের দারোয়ানকে খুঁজে বের করলাম, স্যার।”
“দ্যাটস গ্রেট,” অতনুর এই বুদ্ধিটার প্রশংসা না করে পারলো না। প্রতিটি মানুষই কোনো না কোনো কমিউনিটিতে বিলং করে। দারোয়ানদেরও নিজস্ব একটি কমিউনিটি আছে। আশেপাশের অন্য দারোয়ানদের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলাটাই স্বাভাবিক। সারা দিন বাড়ি পাহারা দেবার মতো বিরক্তিকর কাজ করতে যেয়ে আশেপাশের বাড়ির দারোয়ানদের সাথে খোশগল্প করে তারা। ওইসব দারোয়ানদের অনেকের সাথেই ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়ে যায়। সুতরাং ওদের মধ্যে কেউ না কেউ তার খোঁজ দিতে পারবেই।
“ঐ দারোয়ানকে আমি সুকুমারের ছবি দেখালে সে চিনতে পারে। ও আমার কাছে স্বীকার করে, ঐ দিন সুকুমার সল্টলেকের সমাদ্দার ভিলায় গেছিলো। দারোয়ানের কাছ থেকে আরো কিছু কথা জানার পর বুঝতে পারি, মেয়েটা…মানে, সাসপেক্ট আমাকে অনেক মিথ্যে বলেছে।”
ছফা এবং সুশোভন উন্মুখ হয়ে রইলো পরবর্তী কথাগুলো শোনার জন্য।
“ঐ দারোয়ানের সাথে কথা বলার পরই আমি মেয়েটার বাড়িতে আবার যাই, কিন্তু ওখানে গিয়ে দেখি বাড়িতে তালা ঝুলছে। মেয়েটাকে আর পাইনি, স্যার।” হতাশ কণ্ঠে জানালো অতনু। “আগের দারোয়ান আমাকে বলেছিলো, ওই বাসার তিন তলায় মেয়েটার এক কাজিন থাকতো, সেই মেয়েটাও উধাও। এমনকি দারোয়ানও নেই। প্রথমবার জিজ্ঞাসাবাদের সময় মেয়েটার ফোন নাম্বার নিয়ে নিয়েছিলাম, ওই নাম্বারে কল করে দেখি ফোনটা বন্ধ। আমার আর বুঝতে বাকি রইলো না…সাসপেক্ট পালিয়েছে।” একটু থেমে আবার বললো ইন্সপেক্টর, “আমি তখন মেয়েটার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট ইস্যু করে তালা ভেঙে বাড়িটা তল্লাশি করি।”
“ওখান থেকে কিছু পেয়েছিলেন?”
“দেখে মনে হয়েছে, খুব তাড়াহুড়ো করে বাড়ি ছেড়েছে সাসপেক্ট, কোনো আসবাবপত্রই নিতে পারেনি। দোতলায় মেয়েটা যে ঘরে থাকতো সেখানে তল্লাশী চালিয়েও কিছু পাইনি। তবে নীচতলার এক ঘরে মেয়েটার একটি ছবি পেয়েছিলাম। সম্ভবত এটা নিয়ে যেতে ভুলে গেছিলো।”
“তার মানে সাসপেক্টের ছবি আছে আপনার কাছে?”
“হ্যাঁ, স্যার। ঐ ছবিটাই আমি কপি করে সবখানে সাকুলেট করে দেই তখন।”
“হুম,” গম্ভীর হয়ে বললো সুশোভন।
“এরপর পুরো বাড়িটা সিলগালা করে দেই। এখনও বাড়িটা অমনি আছে।”
“স্ট্রেঞ্জ,” অস্কুটকণ্ঠে বলে উঠলো সহকারী নগরপাল। “এরকম জায়গায় একটা বাড়ি ফেলে চলে গেলো, আর এতোদিনেও কেউ এসে দাবি করলো না?”
“সেটাই, স্যার। আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি, বাড়ির মালিকানা সাসপেক্টের মা শুভমিতা সমাদ্দারের নামে। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, মেয়েটার মা মারা গেছে ক-বছর আগে…লন্ডনে। তার কোনো আত্মীয়স্বজনের টিকিটাও খুঁজে পাইনি। আশপাশের বাড়ির লোকজনও আমাকে কিছু বলতে পারেনি, স্যার। ওরা সুস্মিতাকে ঠিকমতো চেনেও না। মেয়েটা বেশির ভাগ সময় লন্ডনেই ছিলো, কিছুদিন ছিলো শান্তিনিকেতনে।”
“আচ্ছা, মেয়েটার ছবি কি দেয়া যাবে?”
“যাবে, স্যার। আমি স্টেশনে গিয়ে ফাইল থেকে ছবি তুলে পাঠিয়ে দিতে পারবো।”
“গুড। আপনি আমার হোয়াটসআপে দিয়ে দেবেন, ঠিকাছে?”
“ওকে, স্যার,” অতনু মজুমদার বললো। “মেয়েটা আমায় বলেছিলো, ওর বাবা বিদেশে থাকে, ওর সাথে তেমন একটা যোগাযোগ নেই। ওর বাবা-মার ইন্টার-রিলিজিওন ম্যারেজ…বাবা মুসলিম, মা ব্রাহ্ম। সল্টলেকের বাড়িটা ওর মা পেয়েছিলো বড়বোনের কাছ থেকে…দ্রমহিলা বিয়েটিয়ে করেননি। মারা যাবার আগে ওই বাড়িতেই ছিলেন।”
মাথা নেড়ে সায় দিলো সুশোভন মিত্র।
“আমি আরেকটু খোঁজবর নিয়ে জানতে পারলাম, সাসপেক্ট মেয়েটা শান্তিনিকেতনে ভর্তি হলেও পড়াশোনার পাট সম্ভবত চুকোতে পারেনি, একটু থামলো পুলিশ অফিসার। “মায়ের মৃত্যুর পরও ওখানেই ছিলো কিছু দিন তারপর হুট করেই আবার চলে আসে কলকাতায়।”
ছফা আস্তে করে সুশোভনের কনুইতে হাত রাখলো। ইশারা করলো-ঘটনাটা কবেকার।
“এটা কবেকার ঘটনা…মানে, মেয়েটা কলকাতায় এসেছিলো কবে?”
“সম্ভবত সুকুমার নিখোঁজের কয়েক মাস আগে।”
ছফার দিকে তাকালো সুশোভন। সে এরইমধ্যে নোটপ্যাডে টুকে রাখতে শুরু করে দিয়েছে তথ্যটা।
“মেয়েটাকে যখন প্রথম বার জিজ্ঞেস করি তখন সে আমায় বলেছিলো, ওর সাথে সুকুমারের পরিচয় শান্তিনিকেতনের এক বন্ধুর মাধ্যমে।”
