“বলো কি!” যারপরনাই অবাক হলো সুশোভন মিত্র।
“তোমাকে তো আগেই বলেছি, মহিলা ওখানে একটা রেস্টুরেন্ট চালাতো।”
“হ্যাঁ-হ্যা…রবীন্দ্রনাথ খেতে যাননি নাকি কী যেনো বলেছিলে?”
“রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি।”
“মাইরি, নামও দিয়েছে…দুর্দান্ত!” প্রশংসার সুরে বললো সহকারী নগরপাল।
“ডিপি মল্লিক ঐ রেস্টুরেন্টের সামনে একটা সেল্ফি তুলে পোস্ট দিয়েছিলো।” নাস্তা পর্ব শেষ করে ফেললো ছফা।
“তাহলে তো ফেসবুক তোমার বেশ কাজে দিচ্ছে।”
মাথা নেড়ে সায় দিতে বাধ্য হলো নুরে ছফা, যদিও এই সোশ্যাল নেটওয়ার্কের উপরে ভীষণ খাপ্পা সে। দিন দিন এটা যে আসক্তি তৈরি করছে সেটা আশঙ্কার বিষয়। ডিবি অফিসাররাও আজকাল অফিসে ফোন নিয়ে বসে থাকে চোখের সামনে। এমনকি তদন্তনাধীন মামলা নিয়ে ফেসবুকের বন্ধুদের সাথে কথাবার্তাও বলে! কেউ কেউ এক কাঠি উপরে-তারা নিজেকে জাহির করার জন্য ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে জানায়, আজকে কী করলো, কাকে ধরলো, কিভাবে ধরলো!
“আমি যে তালিকাটি তোমাকে দিয়েছি সেটা নিয়ে আসো। ঐ কেসটা কোন থানা দেখছে দেখি।” ন্যাপকিন দিয়ে ঠোঁট মুছে নিলো সুশোভন। তারও নাস্তা পর্ব শেষ।
ছফা উঠে বেডরুমে চলে গেলো, ফিরে এলো একটু পরই। তালিকাটা নগরপালের হাতে তুলে দিয়ে দেখিয়ে দিলো নামটা।
কেস নাম্বারটা দেখে পকেট থেকে ফোন বের করে একটা নাম্বারে ডায়াল করলো সুশভোন। কল রিসিভ হতেই নিজের পরিচয় দিলো সে। সুকুমার রঞ্জনের নাম আর কেস নাম্বারটা বলে বিস্তারিত জানতে চাইলো।
ছফা তার দিকে উদগ্রীব হয়ে চেয়ে আছে। ফোনের ওপাশে যে আছে সে নিশ্চয় কম্পিউটার দেখে তথ্যটা জেনে নিচ্ছে বলে একটু সময় লাগছে।
“ওয়াটগঞ্জ থানা? আচ্ছা…থ্যাঙ্ক ইউ,” ফোনটা রেখে দিলো সুশোভন। “ওয়াটগঞ্জ থানা এই কেস তদন্ত করছে।” ফোনের কন্ট্যাক্ট লিস্ট থেকে আরেকটা নাম্বার ডায়াল করলো নগরপাল।
সুশোভন নিজের পরিচয় দিয়ে কথা বলতে শুরু করলো ওয়াটগঞ্জ থানার কোনো অফিসারের সাথে। “আমার একটা ইনকোয়ারি ছিলো…” তালিকাটা দেখে নিখোঁজের নাম আর কেস নাম্বারটা বললো সে। “এই কেসটা যে দেখছে সে কি এখন ডিউটিতে আছে?…আচ্ছা, তার নাম্বারটা দিন…” একটু থেমে ছফার দিকে তাকালো, তার হাতে থাকা নোট প্যাড আর কলমটা ইশারায় চেয়ে নিলো সুশোভন। দ্রুত ফোন নাম্বারটা টুকে নিলো। “থ্যাঙ্ক ইউ ভেরি মাচ।” নোটপ্যাড থেকে নাম্বারটা ডায়াল করলো এবার। একটু অপেক্ষা করার পর কলটা সিরিভ করা হলো।
ফোনের ওপাশে তদন্তকারী অফিসারের কাছে সুশোভন আবারও নিজের পরিচয় দিয়ে জানতে চাইলো, সুকুমার রঞ্জনের নিখোঁজ হবার কেসটা কী অবস্থায় আছে, সে ব্যাপারে একটু কথা বলতে চায়। ওপাশ থেকে কিছুক্ষণ শুনে গেলো সে। “হুম…কোনো সাসপেক্ট?…” ছফার দিকে চকিতে তাকালো, “ওহ্, পালিয়েছে?…তারপর?”
উৎসুক হয়ে চেয়ে রইলো নুরে ছফা।
“সাসপেক্ট ওই ছেলেটার ফ্রেন্ড সার্কেলেরই একজন?”
পরিচিত! মনে মনে বলে উঠলো ছফা। মুশকান জুবেরি পরিচিত সার্কেলে কখনও শিকার করবে না বলেই তার ধারণা। তারপরও, কলকাতায় এসে ডিপি মল্লিককে শিকার বানিয়েছে। সুতরাং আবারো পরিচিত মহল থেকে শিকার করার সম্ভাবনাটা উড়িয়ে দেয়া যায় না।
“নাম কি?…আচ্ছা…হুম,” ছফার দিকে তাকালো নগরপাল। “নো প্রবলেম…আমি একটু পর কল দিচ্ছি,” বলেই কলটা কেটে দিলো।
“কি বললো?”
“ও অফিসের পথে আছে…হেভি নয়েজ। একটু পর কল দিতে বললো।”
“সাসপেক্ট পালিয়ে গেছে বললো না?” উদগ্রীব হয়ে জানতে চাইলো ছফা।
“হুম,” সহকারী নগরপাল বললো।
“নাম কি?”
“বললো তো ওর ফ্রেন্ডসার্কেলেরই এক মেয়ে…সুস্মিতা সমাদ্দার।”
.
অধ্যায় ৬১
সাসপেক্ট একজন মেয়ে!
সুকুমার রঞ্জনের নিখোঁজ ঘটনায় পুলিশ প্রাথমিকভাবে সুস্মিতা সমাদ্দার নামের একজনকে সন্দেহ করেছিলো, কিন্তু তন্ত এগোতেই মেয়েটা পালিয়ে যায়। ছফার কাছে এর অর্থ একদম পরিস্কার-সুস্মিতাই সত্যিকারের খুনি! আর মহিলা খুনির কথা জানতে পেরে সে আরো বেশি আশাবাদী হয়ে উঠেছে।
“কিছু বুঝতে পেরেছে, দাদা?”
মাথা নেড়ে সায় দিলো সুশোভন। “সাসপেক্ট একজন মেয়ে…তোমার ঐ ডেঞ্জারাস লেডিই হবে মনে হচ্ছে।”
“আমি নিশ্চিত, জোর দিয়ে বললো নুরে ছফা। “এটা মুশকান।”
“তদন্তকারী অফিসারের সাথে আরেকটু কথা বললেই অনেকটা পরিস্কার হয়ে যাবে।”
“হুম,” বললো ছফা।
এমন সময় সুশোভন মিত্রের ফোনে ইনকামিং কল এলো।
“অতনু মজুমদার…ঐ ইন্সপেক্টর,” বললো নগরপাল। তারপরই কলটা রিসিভ করলো। “হ্যাঁ, বলুন।” কথাটা বলেই ফোনের স্পিকার অন করে দিলো যাতে ছফা শুনতে পায়। কানে চেপে না রেখে হাতে নিয়ে মুখের সামনে ধরে রাখলো সেটটা।
“কেসটার এখন কী অবস্থা? আর কোনো ডেভেলপমেন্ট?”
“খুব বেশি ডেভেলপমেন্ট হয়নি, স্যার, ওপাশ থেকে অতনু মজুমদারের কণ্ঠটা শুনতে পেলো ছফা। “মরেটরে গেলে তো একটা ডেডবডি পাই, ওটার সূত্র ধরে এগোতে পারি, কিন্তু নিখোঁজ কেসগুলো বড্ড টাফ হয়…বুঝতেই পারছেন।”
“হুম, তা ঠিক।” সায় দিলো সুশোভন মিত্র। পুলিশ হিসেবে সে-ও জানে, অনেক বিচিত্র কারণে মানুষ নিখোঁজ হয়-প্রেমের বিরহে বিবাগী হয় অনেকে; নায়িকা হবার বাসনায় বাড়ির কাউকে না জানিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শহরে চলে আসে কেউ কেউ; টাকা ধার নিয়ে উধাও হয়ে যায় মানুষজন; এমনকি, হুট করে ইসকনে যোগ দেবার ঘটনার কথাও তার জানা আছে। বলা নেই কওয়া নেই একজনকে পাওয়া যাচ্ছে না-অনেক পরে খোঁজ নিয়ে দেখা গেলো, ইসকনের কোনো আশ্রমে পড়ে আছে।
