ছফার ভুরু কপালে উঠে গেলো। আমাকে আবার এরমধ্যে টানছো কেন?”
“তুমি দেখি এসব কথা শুনতেও লজ্জা পাও, বলতেও লজ্জা পাও…বোকাচোদা!” বলেই মদের বোতলটা হাতে তুলে নিলো আবার।
“আর খেয়ো না, দাদা,” ছফা তাকে বাধা দিলো দ্বিতীয়বারের মতো। “অনেক খেয়েছো, এবার থামো। শোবার ঘরে চলে যাও, রাত অনেক হয়েছে। কাল তোমার অফিস আছে না?”
যেনো বিষম খেলো কলকাতা পুলিশের সহকারী নগরপাল। “কাল তো হলিডে…অফিস থাকবে কেন?”
“ওহ্! যাই হোক, তোমার রেস্ট নেয়া উচিত।”
“গেস্ট রেখে রেস্ট নেবো আমি?!” খুবই অবাক হলো সুশোভন। “তুমি আমাকে কী ভাবো, অ্যাঁ?”
“আমিও একটু পর শুয়ে পড়বো। তুমি শোবার ঘরে চলে যাও, আমি ঘরের বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়বো।”
সুশোভন তার লালচে আর ঢুলু ঢুলু চোখে তাকিয়ে রইলো ছফার দিকে। “আমি এখন ঘুমাবো? হাহ! নাইট ইজ স্টিল ইয়াং…ম্যান। আর বোতলটা তো অর্ধেকও খালি হয়নি!”
ছফা কিছু বলতে যাবে তার আগেই সুশোভন মিত্র সোফার উপরে শুয়ে পড়লো।
“ধুর…তুমি একটা মাজুল! মদ খাও না, ইয়েও করো না, কিছু করো না। শুধু ঐ ডেঞ্জারাস লেডিকে নিয়ে পড়ে আছে। তুমি যে বড় বোরিং একটা মানুষ সে-কথা কি কেউ কোনো দিন বলেছে তোমায়?” সোফায় শুয়ে শুয়েই জিজ্ঞেস করলো সহকারী নগরপাল।
মাথা নেড়ে সায় দিলো ছফা। “অনেকেই বলেছে।” যদিও সামনাসামনি কেউ তাকে এ কথা বলেনি, তবে তার ধারণা, মানুষ হিসেবে সে যথেষ্ট বোরিং।
“যারা বলেছে তাদেরকে আমি স্যালুট দেই,” বলেই সোফা থেকে ওঠার চেষ্টা করলো সুশোভন, আধশোয়া অবস্থায় স্যালুট ঠুকেই ধপাস করে শুয়ে পড়লো, তারপর আর কোনো রা নেই।
ছফা ভালো করে দেখলো তাকে। বেঘোরে চলে গেছে। বাঁচা গেলো! মনে মনে বললো সে।
.
অধ্যায় ৫৯
সুশোভনের এক হাত আর এক পা সোফার প্রান্ত থেকে ঝুলছে। বেঘোরে পড়ে আছে সে। তার ভারি নিশ্বাসের শব্দ ছাড়া ঘরে আর কোনো শব্দ নেই। এ মুহূর্তে। পুরো ঘরটা অন্ধকারে ঢাকা।
নুরে ছফা নিজের ঘরে এসে চুপচাপ বসে আছে বিছানার পাশের চেয়ারে। তার হাতে মোবাইলফোন। চার্জ শেষ হয়ে যাওয়াতে রিচার্জ করতে দিয়েছে, তবে ফোনটা এখনও তার হাতে। রাত প্রায় একটা বাজে। কলকাতা শহরও ঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ছফা টের পেলো তার দুচোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। দীর্ঘক্ষণ ফোনের ছোট্ট ডিসপ্লেটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে এ অবস্থা। আজকে সে যা জানতে পেরেছে তারপর মনে হয় না রাতে ঘুমাতে পারবে।
ছফা এখন আর ডিপি মল্লিকের পেইজ ব্রাউজ করছে না। ওটা এ পর্যন্ত কতোবার দেখেছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। পুরো পেইজের হিস্ট্রি যতোটুকু সম্ভব ঘেঁটে দেখেছে, কোথাও নতুন কিছু পায়নি। যতোটুকু পেয়েছে তাতেই সে বিস্মিত।
ডাক্তার আসকারের সাথে কলকাতার নিখোঁজ প্লাস্টিক সার্জন ডিপি মল্লিকের সখ্যতা আছে। আর সেই নিখোঁজ সার্জন বাংলাদেশ সফর করার সময় সুন্দরপুরেও গিয়েছিলো-রবীন্দ্রনাথে! ছফা ধরেই নিলো, মুশকান জুবেরির সাথে ভদ্রলোকের পরিচয় কিংবা সখ্যতা ছিলো। ছফা একদম নিশ্চিত, ডিপি মল্লিককে হত্যা করার পর তার নিজস্ব ফেসবুক অ্যাকাউন্টটা ডিলিট করে দিয়েছে মুশকান।
পেইজটা কেন ডিলিট করতে পারলো না, সে প্রশ্নের জবাব একটু আগে দিয়ে দিয়েছে সুশোভন : পেইজটা ডিপি মল্লিক একা চালাতো না। আরো দু-জন অ্যাডমিন আছে, এ কারণে মুশকানের পক্ষে ওটা ডিলিট করা সম্ভব হয়নি।
আবার এমনও হতে পারে, মুশকানের হয়তো পেইজের কথা খেয়ালই ছিলো না। ভুল তো সবারই হয়, আর ভুলের চেয়েও বেশি হয় সমস্যা। হাসিবের বেলায়ও মুশকান হয়তো সমস্যায় পড়ে গেছিলো। কারণ যা-ই হোক, তার অ্যাকাউন্টটা হাতিয়ে নিতে পারেনি সে।
কয়েক মুহূর্ত ফোনটা নামিয়ে রেখে চোখ বন্ধ করে রাখলো সে। একমনে অনেকক্ষণ ভেবে গেলো। কিছু বিষয়ে ছফা এখন অনেকটাই নিশ্চিত : মুশকান জুবেরি সুন্দরপুর থেকে পালিয়ে ঢাকায় চলে যায়, সেখান থেকে কলকাতায়। আর পুরো কাজে তাকে সাহায্য করেছেন ডাক্তার আসকার ইবনে সায়িদ। কলকাতায় আসার পর এখানেও শিকারের সন্ধান করেছে মহিলা। এটা না করে সে থাকতে পারেনি। নেশায় আসক্ত মানুষ নেশাদ্রব্য খুঁজে বেড়ায় হন্যে হয়ে, মুশকানও কয়েক মাস পরই শিকারে নেমে পড়ে। আর তার প্রথম শিকার সম্ভবত প্লাস্টিক সার্জন ডিপি মল্লিকই। লোকটাকে দিয়ে নিজের চেহারা পাল্টে নিয়েছে মহিলা, তারপর ব্যাপারটা চিরকালের জন্য গোপন রাখতে হত্যা করেছে তাকে। এখানেই থেমে থাকেনি, এরপরও শিকার করেছে, আর ছফার কাছে এরকম আরেকজনের খোঁজও আছে।
দ্বিতীয়জন!
হঠাৎ করেই তার মনে পড়ে গেলো, দ্বিতীয় শিকার নিয়ে সে এখনও কোনো খোঁজাখুঁজি করেনি। সঙ্গে সঙ্গে চোখ মেলে ফোনটা নিয়ে আবার ব্যস্ত হয়ে পড়লো।
মুশকানের সম্ভাব্য দ্বিতীয় শিকারের নাম সুকুমার রঞ্জন। আইডিয়াল অ্যানালিটিকস সলিউশন নামের একটি প্রতিষ্ঠানের এক্সিকিউটিভ। বয়স ২৮। অবিবাহিত। মুশকানের শিকারের জন্য একদম উপযুক্ত।
সুকুমার নিখোঁজ হয়েছে বছরখানেক আগে। তার নিখোঁজের সময়কাল হিসেব করে দেখলো ছফা-ডিপি মল্লিকের নিখোঁজ হবার প্রায় এক বছর পর। দুটো মানুষ নিখোঁজ হবার সময়ের মধ্যে যে ব্যবধান আছে সেটা একটু বেশি বলেই মনে হচ্ছে। তবে সে নিশ্চিত করে জানেও না, মুশকান জুবেরি আসলে কততদিন পর পর শিকার খোঁজে, কিংবা কতোদিন পর তার ঐ বিশেষ প্রত্যঙ্গটির দরকার পড়ে! তাছাড়া, এই সময়ের মধ্যে যদি শিকার করেও থাকে ছফার পক্ষে সবগুলো জানা সম্ভবও নয়।
