“শেরেবাংলা ফজলুল হক?”
“হ্যা…ওঁ-ই…ফজলুল হক। ঘটনাটা সম্ভবত চল্লিশের দশকে, ভারতবর্ষ তখনও বৃটিশরাজের অধীনে। হকসাহেব তো করতেন মুসলিমলীগ…তার এক বাল্য বন্ধু ছিলো বেশ নামকরা রাজনীতিক, সম্ভবত কমিউনিস্ট পার্টি করতো সে। তো, হকসাহেব সবাইকে অবাক করে দিয়ে কংগ্রেসের সাথে জোট বাঁধলে ওঁর সেই বাল্যবন্ধু ভীষণ ক্ষেপে যায়। ওদের গ্রামের বাড়ি ছিলো আবার খুব কাছাকাছি…খাল-বিল দিয়ে যেতে হতো নৌকোয় করে।”
মাথা নেড়ে সায় দিলো ছফা।
“হকসাহেব গ্রামের বাড়িতে গেলে সেই বাল্যবন্ধুর বাড়িতে একবার হলেও দেখা করে যেতেন। তো, কংগ্রেসের সাথে জোট বাঁধার পর গ্রামে গেলে এক বিকেলে তিনি নৌকো নিয়ে বন্ধুর বাড়িতে গেলেন। নৌকোটা যখন ঘাঁটে ভিড়ছে তখন সেই বন্ধু ঘাঁটের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ছিলো, হকসাহেবকে দেখে রাগেক্ষোভে বলে উঠলো, ‘কিরে ফৈজ্যা, তর লাইগ্যা তো মাইনুষের কাছে আর মুখ দেহাইতে পারতেসিনা।’” সুশোভন বেশ চেষ্টা করলো বরিশালের আঞ্চলিক ভাষাটা বলার জন্য, তার প্রচেষ্টা মোটামুটি সফলও বলা যায়। “হকসাহেব ছিলেন খুবই আউটম্পোকেন পার্সন, বুঝলে…সেইরকম রসবোধও ছিলো। কথাটা আর মাটিতে পড়তে দিলেন না। নৌকো থেকে নামতে নামতেই জবাব দিলেন, ‘মুখ দেহাইতে পারলে হোগা দেখাগিয়া!’” কথাটা বলার পর ছফা আর কী হাসবে, সুশোভন হাসতে হাসতে সোফার উপর গড়িয়ে পড়লো।
ছফাও হাসি ধরে রাখতে পারলো না।
“ওঁর সেন্স অব হিউমারটা দেখেছে? মুখ না দেখাতে পারলে হোগা দেখা! হা-হা-হা!” হাসতে হাসতে পেট ফেঁটে যাবার উপক্রম হলো তার। “চিন্তা করো, কী জবাবটাই না দিয়েছিলেন! আই ক্যান ইমাজিন…সেই বন্ধুর চেহারাটা কেমন হয়েছিলো এ কথা শুনে! একেবারে লাজওয়াব!”
গল্পটা সত্যি হোক আর মিথ্যে, হাসি পাবার মতোই। কিন্তু ছফার মাথায় ঘুরছে অন্য চিন্তা। সুশোভনের হাসিটা যেনো ব্যাকগ্রাউন্ড সাউন্ড হয়ে গেলো নিমেষে। আবারো সে মনোযোগ দিলো ফোনের পর্দার দিকে। বেশ ধৈর্য নিয়ে ডা. ডিপি মল্লিকের পেইজের বাকি ছবিগুলো স্লাইড করে করে দেখতে শুরু করলো। এভাবে এভাবে দেখতে দেখতে হঠাৎ একটা ছবি দেখে নড়ে চড়ে উঠলো সে-সার্জন দয়াল প্রসাদ মল্লিকের অসংখ্য সেল্ফির একটি-ছবিতে ভদ্রলোক একাই আছেন, তবে তার ব্যাকগ্রাউন্ডে যেটা দেখা যাচ্ছে সেটা নুরে ছফা মোটেও আশা করেনি।
রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি।
.
অধ্যায় ৫৮
ডাক্তার দয়াল প্রসাদ মল্লিক রবীন্দ্রনাথে গেছিলো!
নুরে ছফা প্রবল উত্তেজনা নিয়ে বসে আছে, ওদিকে সুশোভন মিত্র আরেকটি নতুন উপাখ্যান শুরু করেছে কলেজ জীবনের এক বান্ধবীকে নিয়ে কিন্তু সেটা তার কানে ঢুকলেও মনোযোগ পাচ্ছে না একদমই। নগরপালের কথাগুলো দূর থেকে ভেসে আসা শব্দের মতো লাগছে যেনো!
ডিপি মল্লিকের পেইজটার সবগুলো ছবিই দেখে ফেলেছে ছফা, ঐ দুটো ছবি ছাড়া উল্লেখযোগ্য আর কিছু পায়নি। কিন্তু দুটো ছবিই যথেষ্ট একটি সংযোগ স্থাপনের জন্য নিখোঁজ প্লাস্টিক সার্জন ডিপি মল্লিকের সাথে ডাক্তার আসকারের সম্পর্ক ছিলো, আর সুন্দরপুরের মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের স্বাদও নিয়েছে ভদ্রলোক। রবীন্দ্রনাথকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে যে সেল্ফিটা তুলেছে সার্জন, তার ক্যাপশনে লেখা আছে : অদ্ভুত নামের এক রেস্টুরেন্ট! অসাধারণ সব খাবার!
তাহলে কি মুশকানকেও ডিপি মল্লিক চিনতো?
অবশ্যই চিনতো, নুরে ছফা মনে মনে বললো। ডাক্তার আসকারের আমন্ত্রণে গেছিলো ভদ্রলোক, সম্ভবত সুন্দরপুরেও তার সঙ্গি ছিলেন অরিয়েন্ট হাসপাতালের মালিক। ওখানে যাবার একটাই উদ্দেশ্যই থাকতে পারে-রবীন্দ্রনাথের অসাধারণ খাবারের আস্বাদন। তার মানে মুশকান জুবেরি তাকে আগে থেকেই চিনতো। যদি তা-ই হয়ে থাকে, তাহলে কলকাতায় আসার পর তাকে শিকার বানানোর একটাই কারণ থাকতে পারে-সার্জন ডিপি মল্লিককে দিয়ে নিজের চেহারা পাল্টে ফেলার পর ব্যাপারটা চিরতরের জন্য গোপন রাখতে তাকে হত্যা করা। তবে এরকম মার্জিত আর তরতাজা একজনকে নিশ্চয় অপচয় করেনি মহিলা শিকার হিসেবে ভদ্রলোক যথেষ্ট উপযুক্ত।
“বুঝলে, ও আবার প্রটেকশন ছাড়া ওসব করতে রাজি ছিলো না।”
সুশোভন মিত্রের এমন কথায় সম্বিত ফিরে পেয়ে তাকালো ছফা। “কীসে রাজি ছিলো না?”
“আরে প্রটেকশানের কথা বলছি…” এক কথা দু-বার বলতে গিয়ে সামান্য বিরক্ত হলো মাতাল।
“ও।”
“কিন্তু আমি তখন ওরকম সময়ে কী করে ও জিনিস জোগাড় করি, বলো?”
হ্যাঁ-না কিছুই বললো না। ছফার মাথায় অনেক কিছুই ঘুরপাক খাচ্ছে এখন।
“আমি বললাম, তুমি কিছু চিন্তা কোরো না, বাইরেই-”
“আহ, দাদা!” কথার মাঝখানে থামিয়ে দিলো তাকে। “কী শুরু করলে?” এ মুহূর্তে পর্নোগ্রাফির বয়ান শোনার মেজাজে নেই সে।
“আরে শালা! লজ্জা পাচ্ছো নাকি!” ভুরু কুঁচকে তাকালো সুশোভন।
মাখা দোলালো ছফা।
একটা ঢেঁকুর তুললো মাতাল। “যাই হোক, ও তো রাজিই হয় না, তখন আমার কি ইচ্ছে করলো জানো?” প্রশ্নের জবাবের অপেক্ষা না করেই বললো, “রেইপ করে বসি!”
ভুরু কপালে তুললো ছফা। “তুমি কি সেটা করেছে নাকি?”
“আরে ধুর, হাত নেড়ে উড়িয়ে দিলো কথাটা। “আমি কি অতোটা ইয়ে নাকি। রিল্যাক্টান্ট কারোর সাথে আমি কখনও কিছু করিনি,” একটু থেমে আবার বললো, “তুমি কখনও করেছো?”
