“পেইজটা দেখছি,” ফোনের পর্দা থেকে চোখ না সরিয়েই বললো সে।
“ঐ সার্জন কিন্তু সেলিব্রেটিদের সাথে ইয়ে করে বেড়াতো। আমার এক কলিগ বলেছিলো, এখন মনে পড়েছে। ঐ যে, এক অ্যাক্ট্রেস আছে না?…আরে ঐ যে…” সুশোভনের বেয়াড়া স্মৃতি এখন সাড়া দিচ্ছে না ঠিকমতো। “ঐ মেয়েটার সাথে একটা কেলেঙ্কারির খবর বেরিয়েছিলো।”
“কি রকম কেলেংকারি?”
“আরে আজকাল যা শুরু হয়েছে…ওরকম,” একটু থেমে আবার বললো, “ঐ যে মিটু মুভমেন্ট চলছে না? ওটাতে ওর নাম এসছিলো। এক অ্যাক্ট্রেস অ্যাকুইজ করেছিলো ওকে।”
ছফা অবশ্য এ মুহূর্তে কেলেঙ্কারি নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না। তার সমস্ত মনোযোগ ফোনের ছোট্ট পর্দায়। প্রায় সব পোস্টই আগ্রহী কসমেটিক্স সার্জারির ক্লায়েন্টদের। কোনটা করতে কত টাকা লাগতে পারে, কতো দিন লাগবে, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে কিনা, এইসব জানতে অনেকেই আগ্রহী। ডা. মল্লিকও সব প্রশ্নের জবাব দিয়েছে। তবে ছফার ধারনা এসব জবাব ভদ্রলোক নিজে দেয়নি। এরকম পেইজগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অন্য কেউ চালায়, এখানেও সম্ভবত তাই হয়েছে। ডাক্তারের মতো ব্যস্ত কেউ দিনরাত বসে বসে প্রশ্নের জবাব দেবার কথা না।
বেশির ভাগ পোস্টই ছবিসহ। সেইসব ছবি স্ক্রল করতে করতে একটা ছবিতে এসে থমকে গেলো ছফা। ভুরু কুঁচকে তাকালো সে।
“মাই গড!” অস্ফুটস্বরে বলে উঠলো।
.
অধ্যায় ৫৭
ডা. ডিপি মল্লিকের পেইজে তার অসংখ্য সাফল্য আর কর্মকাণ্ডের ছবি রয়েছে। সেসব ছবির সংখ্যা কয়েক শ’ হবে। বিদেশের কোন্ মেডিকেল থেকে কী কোর্স করেছে, কোথায় কোন্ সম্মাননা পেয়েছে, তার চেঞ্জ মেকার ক্লিনিক কী কী সুবিধা দিয়ে থাকে, কতো অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়, এ পর্যন্ত কতোজন ক্লায়েন্টকে সেবা দিয়েছে, সে-সবের ছবিসহ ফিরিস্তি দেয়া আছে। তবে তার সেলিব্রেটি ক্লায়েন্টের মধ্যে খুব কমই নিজেদের পরিচয় কিংবা ছবি দেখাতে রাজি হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। ডাক্তার এটা নিজেই স্বীকার করেছে। তার দাবি, প্রচুর সেলিব্রেটির কসমেটিক্স সার্জারি করেছে সে, তাদের অনুরোধেই নাম প্রকাশ করা হয়নি। তবে কিছু কিছু সেলিব্রেটি উদারতা দেখিয়ে তাদের নাম আর ছবি দিয়েছে, সেইসাথে ডাক্তারের প্রশংসা করতেও ভোলেনি। তাদেরকে বিজ্ঞাপন হিসেবে ব্যবহার করেছে ডিপি মল্লিক।
এসব কিছু নিয়ে ছফার মধ্যে কোনো আগ্রহ নেই, থাকার কথাও নয়, কিন্তু একটা ছবি দেখে তার চোখ আটকে গেছে একটু আগে। এখন সেই
ছবিটার দিকেই ভুরু কুঁচকে চেয়ে আছে সে।
ডাক্তার আসকার ইবনে সায়িদ!
ডিপি মল্লিকসহ আরো অনেক ডাক্তারের সাথে দাঁড়িয় আছেন ভদ্রলোক। ছবিটা ২০১৩ সালের অক্টোবরের। আর সেটা বাংলাদেশেই।
ছবির নীচের ক্যাপশন বলছে : ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে ঢাকার নামকরা অরিয়েন্ট হাসপাতালের আমন্ত্রণে ডাক্তার ডিপি মল্লিক গিয়েছিলো সেখানকার প্লাস্টিক অ্যান্ড কসমেটিক্স সার্জারি ডিপার্টমেন্টের একটি সেমিনারে আমন্ত্রিত হয়ে।
ছফা টের পেলো উত্তেজনায় তার রক্ত টগবগ করছে। সে আরো কিছু ছবি দেখলো। মোট তিনটি ছবি পাওয়া গেলো যেগুলো ডিপি মল্লিকের অরিয়েন্ট হাসপাতাল সফরের সময়ে তোলা। তবে কেবলমাত্র একটি ছবিতেই ডাক্তার আসকারের সাথে, আর সেটা ডিপি মল্লিক নিজেই তুলেছে-সেফি। এই ছবির নীচে ক্যাপশনটা দেখলো ছফা : প্রখ্যাত সার্জন এবং অরিয়েন্ট হাসপাতালের কর্ণধার ডাক্তার আসকার ইবনে সায়িদের সঙ্গে।
কয়েক মুহূর্ত চুপ মেরে রইলো সে। ঐ সময়ে মুশকান জুবেরি অরিয়েন্ট হাসপাতালে কাজ করতো না, ততোদিনে সুন্দরপুরে চলে গেছে।
“হোগা!” বেশ জোরে বলে উঠলো সুশোভন, সেই সাথে অট্টহাসিতে ফেঁটে পড়লো।
ছফা যারপরনাই অবাক, কিছুই বুঝতে না পেরে চেয়ে রইলো তার দিকে। “কী হয়েছে? কী বলছো এসব?”
কোনোমতে হাসির দমক থামিয়ে সুশোভন বলতে লাগলো, “তোমার এই ডিপি মল্লিকের কথা শুনে আরেক মল্লিকের কথা মনে পড়ে গেছে আমার।”
মল্লিকের সাথে ‘হোগা’র কী সম্পর্ক থাকতে পারে সেটা ছফার মাথায় ঢুকছে না।
“স্কুলে আমাদের এক টিচার ছিলেন, আমরা সবাই তাকে মল্লিকস্যার বলে ডাকতাম…” একটা সেঁকুর তুললো নগরপাল। “মল্লিকস্যার একবার আমাদেরকে খুব মজার একটি গল্প বলেছিলেন,” কথাটা বলেই আবারো হেসে ফেললো সে।
“কী বলেছিলেন?”
হাসি থামিয়ে ছফার দিকে স্থিরচোখে তাকালো সুশোভন। তারপর গ্লাসের তলানিতে যতোটুকু হুইস্কি ছিলো শেষ করে ফেললো এক ঢোঁকে। “ইংরেজির শিক্ষক ছিলেন…ভালোই পড়াতেন।”
মুচকি হাসলো ছফা। তার মাথায় ঘুরছে ডা. আসকার, মুশকান আর ডিপি মল্লিক, এদিকে আরেক মল্লিকের গল্প বলে যাচ্ছে তার হোস্ট। না শুনেও উপায় নেই।
“প্রায়ই ক্লাসে পড়ার ফাঁকে মজার মজার গল্প করতেন, আমরাও বেশ এনজয় করতাম। ভগবানই জানে, বানিয়ে বানিয়ে বলতেন নাকি আসলেই সব সত্যি ঘটনা ছিলো,” হুইস্কির বোতলটা হাতে তুলে নিলো সে।
“আর খেয়ো না, দাদা…অনেক তো খেলে,” বারণ করলো ছফা। “কী বলেছিলেন উনি, সেটা বলো?”
কয়েক মুহূর্ত ভেবে বোতলটা রেখে দিলো সুশোভন। “ভদ্রলোক আবার পূর্ববাংলার লোক ছিলেন, আদিবাড়ি ছিলো তোমাদের বরিশালে, ওখান থেকেই স্কুল পাস দিয়ে কলকাতায় চলে আসেন কলেজে পড়ার জন্য। যাই হোক, হকসাহেবের বাড়ি ছিলো ওঁর গ্রামেই।”
