“আজকে আমি কিন্তু নেই,” ছফা আত্মসমর্পন করার ভঙ্গিতে বললো। “তোমাকে একাই ড্রিঙ্ক করতে হবে, দাদা।” সে বসে আছে সুশোভনের ড্রইংরুমে। ডিনারের পর টিভি দেখছিলো।
সুশোভন হেসে ফেললো। “তুমি না বড় ইয়ে…এতো কম খাও এ। জিনিস! লিও’তে কনিয়াক-এর মতো জিনিসও ছুঁয়ে দেখলে না।” ছফার পাশে এসে বসলো সে।
“ওসব খেলে আমার হ্যাঁঙ্গওভার হয়…কালকেও হয়েছিলো।”
“বেশি করে মেরে দিলে হ্যাঁঙ্গওভার হতো না,” বোতলটায় টোকা মেরে বললো, “লন্ডন থেকে এক বন্ধু গিফট করেছে…গ্লেনফিডিখ…কুড়ি বছরের পুরনো মাল! চেখে না দেখলে হয়?”
“একশ’ বছরের হলেও আমি নেই আজ,” ছফা হেসে বললো।
কাঁধ তুললো সুশোভন। “কী আর করা।” একটু থেমে আবার বললো সে, “তা বলো, সারাদিন খেটেখুটে কী পেলে?”
“এই লিস্ট থেকে মাত্র দু-জনকে পেয়েছি, যারা ঐ মহিলার সম্ভাব্য টার্গেট হতে পারে,” বললো ছফা।
“সেটা তো বিকেলেই বলেছো, এরপর আর কাউকে পাওনি?”
মাথা দোলালো সে। “তবে যে-দুজনকে পেয়েছি তাদের ডিটেইলস ইনফো লাগবে আমার।”
“ও তুমি পেয়ে যাবে। ওদের নিখোঁজ কেসগুলোর তদন্ত চলছে এখনও।”
“তাহলে তদন্তকারী অফিসারের কাছ থেকে হেল্প পাওয়া যাবে নিশ্চয়?”
“সেটার ব্যবস্থা করা যাবে, চিন্তা কোরো না।” একটু ভেবে আবার বললো সুশোভন, “তুমি বলেছিলে দুজনের মধ্যে একজন ডক্টর আছে?”
“হুম। কিন্তু কীসের ডাক্তার, কোথায় কাজ করতো সেসব কিছু ডিটেইল্স নেই তালিকায়।”
“ডেটাবেইজে অতো ডিটেইল্স থাকে না। যেগুলো দিয়েছি তার সবগুলোরই তদন্ত হচ্ছে, কেস প্রগ্রেস করলে আপডেট করা হয়।”
“আনসভ কেসগুলোর লিস্ট দিয়েছো বলে থ্যাঙ্কস। এটা আমার আগেই বলে দেয়া উচিত ছিলো তোমাকে।”
হেসে ফেললো সুশোভন মিত্র। “আরে ভুলে যাচ্ছো কেন, আমিও পুলিশ! ঘটে কিছু বুদ্ধি তো রাখিই, নাকি?”
“রাখো মানে…বেশিই রাখো।”
“হা-হা-হা,” করে প্রাণখোলা হাসি দিলো সহকারী নগরপাল।
“তবে তালিকা অনেক বড় দেখে আমি কিন্তু অবাক হয়েছি, দাদা।”
“কেন? কলকাতা মহানগরী কি কম বড় নাকি? কতো মানুষ থাকে জানো? দিন দিন এসবের সংখ্যা বাড়ছে।”
“আমাদের ওখানেও তাই।”
একটু চুপ থেকে বললো নগরপাল, “ডিনার করে ফেলেছে তো?”
“হুম। তুমি তো ফোনে বলেই দিয়েছিলে তোমার জন্য ওয়েট না করতে।”
“হ্যাঁ, আমি ওখান থেকেই খেয়ে এসেছি,” উঠে দাঁড়ালো সুশোভন। “তুমি বসো, আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।” বোতলসহ শোবার ঘরের দিকে যেতেই থমকে দাঁড়ালো সে।
“তোমার ঐ ডাক্তারের নামটা কি?”
“ডা. দয়াল প্রসাদ মল্লিক।”
“কি!” অবাক হলো নগরপাল। ভুরু কুঁচকে গেলো তার। “ডিপি মল্লিক??”
“চেনো তাকে?”
“আমি তো ভেবেছিলাম তার কেসটা এরইমধ্যে সল্ভ করে ফেলেছে পুলিশ।”
ছফা আরো কিছু জানার জন্য উদগ্রীব হয়ে রইলো। “তোমার ঐ সাসপেক্ট…কী যেনো নাম?”
“মুশকান জুবেরি।”
“হুম। মহিলা তো দারুণ টার্গেট বেছে নিয়েছে, মাইরি,” প্রশংসার সুরে বললো।
“কী রকম?” উৎসুক হয়ে উঠলো সে।
“ডিপি মল্লিক একজন ফেমাস প্লাস্টিক অ্যান্ড কসমেটিক্স সার্জন, বুঝতে পেরেছো তো?”
কথাটার মধ্যে যে ইঙ্গিত আছে সেটা ধরতে পারলো ছফা।
.
অধ্যায় ৫৫
মুশকান জুবেরির সম্ভাব্য শিকার একজন প্লাস্টিক সার্জন?!
চিন্তাটা ছফার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে বিগত দশ-পনেরো মিনিট ধরে।
একজন সন্দেহভাজন পালিয়ে গেলো পাশের দেশে, তারপর দ্বারস্থ হলো এক প্লাস্টিক সার্জনের। কেন-এর জবাব পেতে কোনো কিছু ভাবার দরকার নেই। সুশোভনের মতো সে-ও জানে জবাব একটাই-মুশকান জুবেরি সম্ভবত তার চেহারাটা পাল্টে ফেলার চেষ্টা করেছে।
না, পাল্টে ফেলেছে! নিজেকে শুধরে দিলো মনে মনে।
“মহিলা দারুণ স্মার্ট,” বললো সুশোভন মিত্র। “এক ঢিলে দুটো পাখি মেরেছে।”
ছফাও জানে কথাটা সত্যি হবার সম্ভাবনাই বেশি।
“চেহারাটা পাল্টে ফেলে শিকারকে হত্যা করে তার অগানটারও একটা বন্দোবস্ত করেছে।”
মাথা নেড়ে সায় না দিলেও মনে মনে ঠিকই সায় দিলো ছফা। “এই কেসটা যে অফিসার দেখছে তার সাথে কথা বলা যাবে?”
“অবশ্যই যাবে,” জোর দিয়ে বললো সুশোভন। চাইলে এখনই কথা বলিয়ে দিতে পারি।”
“এখনই?” অবাক হলো সে।
“যদি তুমি চাও তো…রাত খুব একটা বেশি হয়নি কিন্তু।”
একটু ভেবে নিলো ছফা। তর সইছে না তার, তবে রাত দশটার পর কোনো অফিসারকে বিরক্ত করাটা ঠিক হবে না। ডিউটি শেষে নিশ্চয় বাড়িতে গিয়ে বৌ-বাচ্চার সাথে সময় কাটাচ্ছে। “এখন কল করলে বিরক্ত হবে না?”
“তা তো হবেই,” হাসিমুখে বললো সুশোভন। “কিন্তু আমার কাছ থেকে রাত দশটার পর ফোন পেলে মোটেও বিরক্ত হবে না, এ আমি দিব্যি দিয়ে বলতে পারি।”
হেসে ফেললো ছফা। “তাহলে কল দাও।”
“ওকে।” উঠে পাশের ঘরে গিয়ে মোবাইলফোনটা নিয়ে এলো। “আমি জানি কোন্ অফিসার এই কেসটা দেখছে,” এ কথা বলে একটা নাম্বারে ডায়াল করে ছফার পাশে এসে বসলো সে। কলটা রিসিভ হতেই কানে চেপে বললো : “হ্যা…দেবাঞ্জন, একটা ভীষণ দরকারে ফোন না দিয়ে পারলাম না…” ওপাশ থেকে কিছু শুনে গেলো নগরপাল। “তুমি তো ঐ। প্লাস্টিক সার্জন ডিপি মল্লিকের কেসটা দেখছো, তাই না?…কেসের আপগ্রেডটা জানতে চাইছি আমি,” একটু থেমে উৎসুক ছফার দিকে তাকালো সে, মুচকি হেসে চোখও টিপে দিলো। ওপাশের কথা শুনে গেলো কিছুক্ষণ। “কোনো কূলকিনারাই করা যায়নি, বলো কি!” ছফার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট ওল্টালো। “আচ্ছা…বুঝতে পেরেছি…হুম…সেটাই…ঠিক আছে…থ্যাঙ্কস…পরে দরকার হলে আবার কল দেবো তোমাকে।”
