ওয়েটিং এরিয়া থেকে উঠে দাঁড়ালো আসলাম। তরুণী আর ছেলেটা লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এখন। চুপচাপ তাদের পেছনে এসে দাঁড়ালো সে। লিফটের দরজা খুলে গেলে ঢুকে পড়লো ঐ দুজন, তাদের পেছন পেছন ঢুকে পড়লো আসলাম। তিন জন মানুষকে নিয়ে লিফটটা নামতে শুরু করলো এবার।
লিফটের ভেতরে কেউ কোনো কথা বলছে না। আসলাম ভালো করে তরুণীকে দেখে নিলো। চেহারাটা তার মুখস্ত করে রাখা দরকার। সঙ্গে থাকা তরুণকেও দেখে নিলো। একেবারেই সাদামাটা চেহারার। দেখে মনে হয়, মেয়েটার বাসায় কাজ করে। বড়লোকের বাড়িতে যে-রকম গরীব আর অভাবী আত্মীয়স্বজন আশ্রয়ে থাকে, ঠিক সেরকম।
গ্রাউন্ডফ্লোরে থামলে ওই দু-জন লিফট থেকে বের হয়ে গেলে আসলামও তাদের অনুসরণ করলো নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে। ওরা কেউই তাকে একবারের জন্যে লক্ষ্য করেনি। আসলাম মেয়েটার দিকে এক ঝলক
তাকিয়ে পারলো না। তাদেরকে পাশ কাটিয়ে কাঁচের দরজাটা খুলে বের। হয়ে এলো সে। ওদের আগে তাকে তার গাড়ির কাছে পৌঁছাতে হবে।
হাসপাতালের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা একটি গাড়িতে উঠে বসলো ঐ তরুণী আর ছেলেটা। গাড়িটা সম্ভবত উবার হবে। দূর থেকে দেখলো, ড্রাইভার মোবাইলফোন হাতে নিয়ে ট্রিপটা কনফার্ম করছে।
গুলশান থেকে উবারের গাড়িটা চলে যাচ্ছে ঢাকা শহরের আরেক অভিজাত এলাকা বনানীর দিকে। যেমনটা ভেবেছিলো, গাড়িটা এসে থামলো বনানীর তিন নাম্বার রোডে ডাক্তারের বাড়ির সামনেই।
তরুণী আর অল্পবয়েসী ছেলেটা গাড়ি থেকে নামতেই ভেতর থেকে গেটটা খুলে দিলো দারোয়ান, বাড়িতে ঢুকে পড়লো ওরা।
গাড়িতে বসে, একটু দূর থেকে সবটাই দেখলো আসলাম। তার ঠোঁটে ফুটে উঠলে হাসি।
পিএসের তথ্য একেবারেই ঠিক।
.
অধ্যায় ৫৩
এদিকে ঢাকা থেকে আধঘণ্টা পিছিয়ে থাকা কলকাতা মহানগরীর বেনটিঙ্ক স্ট্রিটে সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে প্রায় উদ্দেশ্যবিহীনভাবেই হেঁটে যাচ্ছে নুরে ছফা। তার মাথায় একটা ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছে অনেকক্ষণ থেকেই। চিন্তাভাবনা পরিস্কার করার জন্যই ঘর থেকে বের হয়েছে সে। প্রায় সারাটা দিনই সুশোভনের ফ্ল্যাটে ছিলো।
সন্ধ্যা নামার একটু আগে মাথাটা ভার হয়ে এলে সুশোভনের ফ্ল্যাট থেকে বের হয়ে পড়ে একটু হাটাহাটি করার জন্য। বিকেলের দিকে সহকারী নগরপাল ফোন দিয়ে জানিয়েছিলো তার ফিরতে একটু দেরি হবে আজ। কাজ শেষে শ্বশুড়বাড়িতে গিয়ে বৌকে দেখে আসবে। ছফার কাজের অগ্রগতি সম্পর্কেও জানতে চেয়েছিলো সে। তাকে জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত নিখোঁজদের সুদীর্ঘ তালিকা থেকে মাত্র দু-জনকে পেয়েছে যাদের ব্যাপারে আরো খোঁজ নেওয়া দরকার। সুশোভন তাকে বিস্তারিত তথ্য দেবার আশ্বাস দিয়েছে।
যাই হোক, নিখোঁজদের তালিকার বেশির ভাগ মানুষই নিম্নবর্গের। কিছু অপ্রকৃতিস্থ লোকজনও আছে। ছফা মনে করে না, মুশকান জুবেরি প্রতিবন্ধীদের উপর চড়াও হবে! মহিলার রুচিবোধ আছে। তার আগের কোনো শিকারই এমন ছিলো না। কিন্তু তারপরও কথা থাকে-অভাবে পড়লে বাঘ যেমন ঘাস খাওয়া শুরু করে, তেমনি মুশকানের পক্ষেও শিকারের ধরণ পাল্টানো সম্ভব। হয়তো ‘সফট টার্গেট’ বেছে নেবার সিদ্ধান্ত নিতে পারে মহিলা। তবে এটাও ঠিক, কলকাতা মহানগরীতে শিক্ষিত আর মার্জিত পুরুষ মানুষের অভাব হবার কথা নয়। বিগত তিন বছরের তালিকায় কিছু শিক্ষিত-মার্জিত পুরুষ মানুষও রয়েছে যারা মুশকান জুবেরি পালিয়ে যাবার পর নিখোঁজ হয়েছে, তবে তাদের মধ্যে কেবল দুজনই সব দিক থেকে শিকার হবার যোগ্যতা রাখে বলে মনে করছে ছফা।
নিখোঁজদের অনেকের বিরুদ্ধে ড্রাগ অ্যাডিকশনের অভিযোগ থাকায় ছফা তাদেরকে বাদ দিয়েছে। সে মনে করে না, নেশাগ্রস্ত কোনো মানুষকে মুশকান জুবেরি শিকার বানাবে। যে প্রত্যঙ্গটি ঐ মহিলার বিশেষভাবে দরকার, সেটা সুস্থ থাকা চাই।
তবে দু-জন সম্ভাব্য শিকারের মধ্যে একজনকে নিয়ে ছফা বেশি আগ্রহী-ভদ্রলোক একজন ডাক্তার! বয়স আটত্রিশের মতো হবে। মুশকানের শিকার হিসেবে সামান্য বেশি কিন্তু পদমর্যাদা আর শিক্ষার ব্যাপারটা হিসেবে নিলে তার দিকেই মনোযোগ চলে যায়। ঐ ডাক্তার নিখোঁজ হয়েছে। মুশকান জুবেরি পালিয়ে যাবার প্রায় এক বছর মাস পর। কলকাতায় গিয়ে আশ্রয় নেবার পর পরই মহিলা শিকারে নামবে, এমনটা আশা করে না ছফা। তবে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাবে না। মুশকান ঠিক কবে থেকে শিকার শুরু করেছে কে জানে!
তালিকাটা এখনও পুরোপুরি শেষ করতে পারেনি, ফ্ল্যাটে ফিরে গিয়ে বাকি নামগুলো দেখবে। আশা করছে, সুশোভন ফিরে আসার আগেই কাজটা শেষ করতে পারবে। এই দীর্ঘ তিন বছরে কমপক্ষে পাঁচ-ছয়জনকে শিকার বানানোর কথা ঐ মহিলার-এটা বিবেচনায় নিলে তালিকাটি এখন পর্যন্ত ছফার জন্য হতাশাজনকই। তবে, নতুন জায়গায় এসে মুশকান যদি নিজেকে সংযত রেখে থাকে, তাহলে এরকমটি হতেই পারে।
তালিকায় নিখোঁজদের শুধু নাম, বয়স, নিখোঁজ হবার দিনক্ষণ আর পেশার উল্লেখ আছে। তার দরকার সম্ভাব্য দু-জন শিকারের ব্যাপারে আরো বিস্তারিত তথ্য।
দ্বিতীয় সিগারেটটা শেষ করে নুরে ছফা পা বাড়ালো সুশোভনের ফ্ল্যাটের দিকে।
.
অধ্যায় ৫৪
রাত দশটার পর নিজের ফ্ল্যাটে ফিরলো সুশোভন, সঙ্গে করে একটা বোতলও এনেছে। ছফার বুঝতে বাকি রইলো না ওটা কি। আৎকে উঠলো সে। আবারো মদ্যপান! না। তার পক্ষে আজ আর এ জিনিস পান করা সম্ভব হবে না। সে ওকেশনাল ড্রিঙ্কার, বছরে টেনেটুনে তিন-চার বার খায়। তা-ও এক বসায় দুই পেগের বেশি না। কাল রাতে হাফ গ্লাস শেষ করতেই বেগ পেয়েছে, বুঝে গেছে তার শরীর এর চেয়ে বেশি অ্যালকোহল সহ্য করতে পারে না।
