“না। মাত্র উঠলাম।”
“ঘুম ভালো হয়েছে তো?” জানতে চাইলো কলকাতা পুলিশের সহকারী নগরপাল।
মাথা দোলালো ছফা।
“চাইলে আরেক দফা ঘুমিয়ে নিতে পারো। হ্যাঁঙ্গওভার খুব বাজে লাগে আমার কাছে।” ইয়োগা ম্যাট থেকে উঠে দাঁড়ালো। “আমি একটু পর অফিসে চলে যাবো। বাসু আছে…তোমার নাস্তা রেডি করে রাখবে ও। যেকোনো দরকারে ওকে বললেই হবে।”
“ঠিক আছে।”
“আমি অফিসে গিয়েই তোমাকে ঐ লিস্টটা পাঠিয়ে দেবো।”
“থ্যাঙ্কস।”
গত রাতে প্রথম কয়েক পেগ পেটে যেতেই সুশোভন কবি হয়ে উঠেছিলো, তারপর রাজনৈতিক ভাষ্যকার, ভারতবর্ষের রাজনীতি নিয়ে তিক্ত বক্তৃতা। শেষে চড়াও হয় হাল আমলের সঙ্গীত নামের অসঙ্গতির উপরে! সুরের নামে নাকি অসূরের বজ্জাতি চলছে! অটোটিউন নিয়ে কী সব বলেছে, ছফার মনেও নেই। এককালে সে ক্লাসিক গানের চর্চা করেছিলো, সে কথা জানিয়ে একটা ঠুমরির কয়েক লাইন গেয়েও শুনিয়েছে। খুব একটা মন্দ ছিলো না তার গান। চর্চা করলে আরো ভালো গাইতে পারবে সেন্দহ নেই।
ছফা একমনে শুনে গেছে তার কথা। বেশির ভাগ সময় মাথা নেড়ে, হু হা করে সায় দিয়ে গেছে। হুইস্কির বোতল যখন অর্ধেক খালি তখনও ছফার গ্লাস শেষ হয়নি। সুশোভন অবশ্য তাকে আরো বেশি পান করার জন্য বললেও জোর খাটায়নি।
এরপর নিজের ঘরে ফিরে এসে কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঘুমে তলিয়ে যায় আবার, সুশোভন কখন অফিসে চলে গেছে টেরই পায়নি ছফা।
যখন ঘুম ভাঙলো তখন বেলা প্রায় ১১টা বেজে গেছে। বিছানা থেকে জোর করে নিজেকে তুলতে হলো। ঘর থেকে বের হয়েই দেখতে পেলো ড্রইংরুমের ফ্যাক্স মেশিনে একটি লম্বা ফ্যাক্স চলে এসেছে। সুশোভন যে এতোটা করিৎকর্মা বুঝতে পারেনি। অফিসে গিয়ে প্রথমেই তার কাজটা করেছে। ফ্যাক্সের কাছে গিয়ে চোখ বুলালো সে। যেমনটা আশা করেছিলো, সুদীর্ঘ তালিকা। এটাতে মনোযোগ দেবার আগে ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করবে বলে ঠিক করলো।
ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে দেখতে পেলো ডাইনিং টেবিলে নাস্তা দেয়া আছে। সুশোভনের হাউজকিপার ছেলেটার নাম সম্ভবত বাসুদেব।
দ্রুত ব্রেকফাস্ট করে নিলো সে, চোখ বুলালো এরপর ফ্যাক্সের কাগজে। এতোগুলো মানুষের মধ্যে থেকে মুশকান জুবেরির শিকার খুঁজে বের করা সহজ হবে না, তবে সে ভেবেছিলো, বয়স আর লিঙ্গ নির্দিষ্ট করে দেয়ার ফলে তালিকাটি অতত বড় হবে না হয়তো। এখন যে সুদীর্ঘ তালিকা দেখতে পাচ্ছে সেটা তাকে ভাবনায় ফেলে দিলো কিছুটা।
ডাইনিং টেবিলের উপর আজকের আনন্দবাজার আর আজকালসহ ইংরেজি দৈনিক স্টেটসম্যান রাখা থাকলেও তাতে চোখ বুলালো না। নাস্তার পর চমৎকার এক মগ কফি খেয়ে তালিকাটা নিয়ে চলে এলো গেস্টরুমে। রোল করা দীর্ঘ লম্বা কাগজের শুরু থেকে পড়তে শুরু করলো। ভালো করেই জানে, এ কাজ করতে যে জিনিসটার সবচেয়ে বেশি দরকার হবে সেটা হলো ধৈর্য। সেই সাথে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিও, যেনো নিখোঁজদের মধ্যে কোনো প্যাটার্ন তার চোখ এড়িয়ে না যায়।
সুশোভনের ছিমছাম নির্জন ফ্ল্যাটে বসে একের পর এক সিগারেট ধ্বংস করতে করতে নিখোঁজদের তালিকায় চোখ বুলিয়ে যেতে শুরু করলো নুরে ছফা। বিগত তিন বছরের সুদীর্ঘ তালিকা দেখে বুঝতে পারছে, সারাটা দিন এ কাজেই চলে যাবে।
.
অধ্যায় ৫২
আসলাম আবারো ফিরে এসেছে অরিয়েন্ট হাসপাতালের সামনে।
গতকাল পিএস তাকে ফোন করে মূল্যবান একটি তথ্য দিয়েছিলো-বুড়ো ডাক্তার নিজের হাসপাতালের একটি সুরক্ষিত ‘স্পেশাল কেবিন’-এ আছে। তবে ভদ্রলোক মোটেও অসুস্থ নয়।
আসলাম অবাক হয়নি একটুও। এরপরই সে হাসপাতালে চলে আসে, ডাক্তারকে নজরদারি করতে শুরু করে দেয়-কিন্তু সারা দিনেও উল্লেখযোগ্য কিছু চোখে পড়েনি। জানতেও পারেনি নতুন কিছু।
কিন্তু একটু আগে আশেক মাহমুদ আরেকটি তথ্য দিয়েছে তাকে : ডাক্তারের সব চাইতে বড় দুর্বলতার সন্ধান পাওয়া গেছে, আর সেটাকে কাজে লাগাতে পারলে, ঐ ধুরন্ধর লোকটাকে বাগে আনা যাবে খুব সহজে। পিএসের ক্ষমতা সম্পর্কে ভালোই অবগত আছে সে। অরিয়েন্ট হাসপাতালের ভেতরেও তার লোক আছে, সম্ভবত ঐ লোকই এরকম খবর দিয়েছে।
এখন কালো রঙের গাড়িটা নিয়ে হাসপাতাল থেকে একটু দূরে পার্ক করে বের হয়ে এলো সে। মেইনগেটের পরে যে বিশাল ওয়েটিং এরিয়া আর রিসেপশনটি আছে সেখানে এসে কিছু উদ্বিগ্ন মুখ দেখতে পেলো। হাসপাতালে এমন দৃশ্যই স্বাভাবিক-রোগীর নিকটাত্মীয়েরা বসে থাকে। রাজ্যের যতো দুশ্চিন্তা নিয়ে। কাঁচের বিশাল দরজাটার পাশেই অর্ধচন্দ্রাকৃতির রিসেপশন ডেস্ক, ওখানে বসে আছে এক তরুণ আর তরুণী। ছেলেটা মনোযোগ দিয়ে কী যেনো দেখছে, কিন্তু মেয়েটা কানে ফোন ঠেকিয়ে আলাপে ব্যস্ত। তার দিকে তাকালো মেয়েটা। গতকাল থেকে দেখছে তাকে, চেহারাটা চিনে ফেলেছে সম্ভবত। তাতে অবশ্য সমস্যা নেই। রোগীর আত্মীয়স্বজন তো ঘনঘন হাসপাতালে আসতেই পারে।
রিসেপশন এরিয়া থেকে সোজা লিফটের দিকে চলে গেলো সে। তার গন্তব্য আবারো পাঁচ তলায়-ওখানেই এক স্পেশাল কেবিনে আছে বুড়োটা।
প্রায় বিশ মিনিট ইনটেনসিভ কার্ডিয়াক কেয়ার ইউনিটের সামনে অপেক্ষা করার পর দেখতে পেলো, ওয়াশরুমের পাশে ছোট্ট একটি প্যাসেজ দিয়ে এক তরুণী আর অল্প বয়েসী এক ছেলে বেরিয়ে আসছে। পিএসের দেয়া তথ্যমতে ওখানেই আছে স্পেশাল কেবিনটা। তাহলে এই মেয়েটাই ডাক্তারের দুর্বলতা!
