লালসা আর ঈর্ষা-মুগ্ধতার দেখা সে খুব কমই পেয়েছে।
অবশ্য এটাও ঠিক, এরকম প্রত্যন্ত এক গ্রামে তাকে দেখে হয়তো বেমানান লাগে লোকজনদের কাছে। তার বেশভূষা আর সৌন্দর্য তাদেরকে বাধ্য করে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতে। আর এই ব্যাপারটা যখন ঘটে তখন খুবই বিব্রতকর অনুভূতি হয়। মাঝে মাঝে কারো কৌতূহলি দৃষ্টি দেখে সে ঘাবড়েও যায়-তাকে চিনে ফেললো না তো?!
না। এখন পর্যন্ত এরকমটি হয়নি। তবে যেকোনো সময়ই যে হতে পারে সে-ব্যাপারে প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। সতর্কতার অংশ হিসেবেই, এই প্রত্যন্ত গ্রামে যারা বেড়াতে আসে তাদের কাছ থেকে নিজেকে সযত্নে আড়ালে রাখে সে।
একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো ভেতর থেকে। যখনই কোনো জায়গার প্রতি তার মায়া জন্মে, সেটা ছেড়ে চলে যেতে হয় তাকে-এখন পর্যন্ত এরকমটিই হয়ে আসছে।
ঔষধি গাছ আর নানান ধরণের ফুলের বাগান করার বাতিক জন্মেছে এখানে আসার পর। তার ঘরের সামনে এক চিলতে জায়গাটা ভরিয়ে তুলেছে শুভ্র কালেনডুলা, লালাভ লাভেন্ডার, গোলাপী-বেগুনীর পাঁচ পাপড়ির ক্যালোট্রপিস, সাদা মুক্তোর দানার মতো পার্থেনিয়াম, সবুজ-লাল পাতার ক্যালাডিয়াম, লালচে-গোলাপীর ওলিয়েন্ডার, সাদা-লালের অশ্বগন্ধা, শুভ্র বেগুনীর স্বর্পগন্ধা, শুভ্র লিলি, সবুজ আইভি, মধুনাশিনী, গোলাপী জটামানসি আর শুভ্র-গোলাপীর নাগালিঙ্গ দিয়ে। ওদের পরিচর্যা করেই কাটিয়ে দেয় অখণ্ড অবসরের প্রায় সবটুকু। যত্নে বড় করা গাছগুলো, এখানকার প্রকৃতি আর এই লাইব্রেরিটার প্রতি তার মায়া জন্মে গেছে অল্প ক-দিনেই।
চারপাশে তাকালো সে। দিন দিন নতুন নতুন বইয়ের আগমণে সমৃদ্ধ হয়ে উঠছে গ্রন্থাগারটি। এখানকার খুব কম মানুষজনই জানে, নতুন এই লাইব্রেরিটির পেছনে তার অবদানের কথা।
রবীন্দ্রনাথের স্মরণে দেয়া এই লাইব্রেরিটির দক্ষিণ দিকের এককোণের ফ্রেঞ্চ জানালার পাশে যে রিডিং টেবিলটা আছে, সেটা তার খুব প্রিয়। একান্তে, নির্জন লাইব্রেরিটি হয়ে ওঠে তার সময় কাটানোর জায়গা। ইচ্ছে। করলে এখান থেকে বই নিয়ে নিজের ঘরে গিয়েও পড়তে পারে, লাইব্রেরি থেকে খুব কাছেই সেটা, কিন্তু তার এখানে এসে বই পড়তেই বেশি ভালো। লাগে।
এ মুহূর্তেও তার কানে গোঁজা আছে হেডফোন, বাজছে আরেকটি প্রিয় একটি রবীন্দ্রসঙ্গীত :
আমি নিশিদিন তোমায় ভালোবাসি,
তুমি অবসরমত বাসিয়ো।
নিশিদিন হেথায় বসে আছি,
তোমার যখন মনে পড়ে আসিয়ো…
কিছু একটা টের পেয়ে পাশ ফিরে তাকালো।
“নমস্কার দিদি,” লাইব্রেরিতে কর্মরত এক ছেলে এক কাপ গরম চা টেবিলের উপর রেখে চুপচাপ চলে গেলো।
ধূমায়িত চায়ের কাপটা তুলে নেবে, এমন সময় বন্ধ হয়ে গেলো গান। থমকে গেলো সে। পরক্ষনেই বেজে উঠলো ফোনের রিংটোন।
হাতেগোণা দুয়েকজন ছাড়া তাকে সচরাচর কেউ ফোন দেয় না। কিন্তু এখন যে তাকে ফোন দিয়েছে সে তার সবচাইতে কাছের একজন মানুষ। নিরাপত্তার কথা ভেবে তাকে খুব কমই ফোন করে সে। তারপরও যখন ফোন দেয়, দেখা যায় সেটা সুসংসবাদ দেবার জন্য নয়। এখনও সেরকমই কিছু আশঙ্কা করছে।
কলটা দ্রুত রিসিভ করলো। ওপাশে যে আছে তার উদ্বিগ্ন কণ্ঠটা শুনেই বুঝতে পারলো, সত্যি খারাপ কিছু ঘটে গেছে। তারপরও ধীরস্থিরভাবে শুনে গেলো কিছুক্ষণ। তার প্রশান্তিময় অভিব্যক্তি পাল্টে গেলো সবটা শোনার পর। নীচের ঠোঁটদুটো কামড়ে ধরলো। চা পানের রুচি উবে গেছে। দুচোখ বন্ধ করে ফেললো কয়েক মুহূর্তের জন্য। এরকম পরিস্থিতিতে কী করতে হবে, আর কতোটা সতর্ক থাকতে হবে ঠাণ্ডা মাথায় বলে দিয়ে ফোনালাপটি শেষ করলো সে।
অনেক সতর্ক আর সজাগ থাকলেও এরকম খবর শোনার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলো না। কলটা শেষ হতেই এক ধরণের বিষণ্ণতা জেঁকে বসলো। তার কারণে ঘনিষ্ঠ কোনো মানুষের উপর দুর্ভোগ নেমে আসুক এটা সে চায় না।
একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো ভেতর থেকে। জানালা দিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে তাকালো। গাছগাছালির ভীড়ে অনতি দূরে প্রবাহিত ভৈরব নদীটি এখান থেকে দেখা না গেলেও ভেসে আসা শীতল বাতাসে নদীর গন্ধটা ঠিকই অনুভব করা যায়।
জায়গাটা তার নামের মতোই সুন্দর!
.
অধ্যায় ৫১
সুশোভন মিত্রের ফ্ল্যাটটা লালবাজার পুলিশ হেডকোয়াটার্স থেকে খুব কাছেই, বেনটিঙ্ক স্ট্রিটে অবস্থিত।
গৃহকত্রীর অনুপস্থিতি ছফাকে এক ধরণের স্বস্তিই দিলো। তবে গৃহকর্তার বেলায়ও একই কথা খাটে! সুশোভনের ভাষায়, নিজেকে নাকি আপাতত ব্যাচেলর ভাবতে শুরু করে দিয়েছে। ডিনারের পরই সিগারেট নিয়ে বসলো সে, তারপর অর্ধেক খাওয়া হুইস্কির একটি বোতল। কিন্তু দুই পেগের পরই ছফা ক্ষান্ত দিলো। হালকা মাথাব্যথার কারণে রাত একটার পরই ঘুমোতে গেলো সে। হ্যাঁঙ্গওভারের জন্য ভালো ঘুমও হলো না, তারপরও খুব সকালেই বিছানা ছাড়লো। নিজের ঘর থেকে বের হয়েই দেখতে পেলো ড্রইংরুমে ইয়োগা ম্যাট বিছিয়ে ধ্যানে মগ্ন সুশোভন। কোনো এক দুর্বোধ্য যোগাসনে বসে আছে মূর্তির মতো।
ছফার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠলো। হুইস্কির বোতল শেষ করেও সাত সকালে এমন ধ্যানমগ্ন ঋষিকে দেখবে আশা করেনি।
ছফা যে-ই না ধ্যানমগ্ন সুশোভনকে একা রেখে চলে যাবে ঠিক তখনই সে বলে উঠলো : “ফ্রেশ হয়েছে?”
