“বিগত তিন বছরে কলকাতা মহানগরীতে যেসব মানুষ নিখোঁজ হয়েছে তাদের তালিকাটা আমার দরকার…ইন ডিটেইল্স।”
“শুধু কলকাতার?” অবাক হয়ে জানতে চাইলো সুশোভন।
মাথা নেড়ে সায় দিলো ছফা। মুশকান জুবেরি সুন্দরপুর নামক প্রত্যন্ত এক মফশ্বলে বসে শিকার করলেও তার সব শিকার এসেছিলো ঢাকা শহর থেকে। অন্তত ছফার জানা যে কয়জন শিকার আছে তাদের বেলায় এ কথা খাটে। সুতরাং মহিলা কলকাতায় থাকলেও এখান থেকেই শিকার খুঁজে বের করবে। শহুরে শিকার!
“সাসপেক্ট পুরো রাজ্যে অপারেট করছে না, কী করে শিওর হলে?”
একটু ভাবলো ছফা। “প্রথমে আমি শুধু কলকাতা মহানগরীর তালিকাটাই খতিয়ে দেখবো, যদি ওখান থেকে কিছু না পাই তাহলে পুরো পশ্চিমবঙ্গের তালিকা দেখতে হবে।”
চোখ কপালে তুললো সুশোভন। “গোটা রাজ্যে প্রচুর মানুষ নিখোঁজ হয় প্রতি বছর। সংখ্যাটা অনেক হবে কিন্তু!”
“তা জানি, তবে শুধুমাত্র ২০ থেকে ৩৫ বছরের পুরুষ মানুষই খুঁজবো…আর অবশ্যই মার্জিত এবং শিক্ষত।”
অবাক হলো সুশোভন। “মার্জিত আর শিক্ষিত? বাপরে! অগ্যান সিলেক্ট করার বেলায় মহিলা এসবও দেখে নাকি!”
ছফা একটু হাসার চেষ্টা করলো। “তা জানি না, তবে এখন পর্যন্ত সে এভাবেই টার্গেট সিলেক্ট করেছে। এটা তার প্যাটার্ন বলতে পারো।”
মাথা নেড়ে সায় দিলো নগরপাল। “তারপরও সংখ্যাটা নেহায়েত কম। হবে না মনে হচ্ছে।”
“সবার ডেটা তো থাকে তোমাদের কাছে, তাই না?”
“তা থাকে। রাজ্যের সবগুলো পুলিশস্টেশন থেকে সব ধরণের ক্রাইমের ডেটাই সংরক্ষণ করা হয়। বিশাল ডেটা-বেইজ। তবে মার্ডার, হাইজ্যাক, ছিঁচকে চুরি থেকে শুরু করে নিখোঁজদের তালিকাগুলো ক্যাটাগরাইজড করা আছে।”
ছফা হাফ ছেড়ে বাঁচলো। তাদের ডিটেক্টিভ ব্রাঞ্চ এখনও পুরোপুরি ডিজিটাল হতে পারেনি। যেটুকু তথ্য সংরক্ষণ করা হয় তা বেশ অপ্রতুল। ওসব তথ্য থেকে খুব কম সময়ই সাহায্য পাওয়া যায়।
“ডেটা বেইজ থেকে তথ্যগুলো পেতে কি কোনো সমস্যা হবে?” এবার আসল প্রসঙ্গে চলে এলো সে।
“উমমম…” একটু ভেবে নিলো সুশোভন। “অফিশিয়াল রিকোয়েস্ট ছাড়া ডেটাগুলো অন্য কারোর সাথে শেয়ার করি না আমরা। তবে, আমি চাইলে তোমাকে সেটা দিতে পারবো। আমার অ্যাকসেস আছে ওটাতে। মাঝেমধ্যে এরকম রিকোয়েস্ট আমরা নন-গভমেন্ট অর্গানাইজেশন থেকেও পেয়ে থাকি। বিভিন্ন ধরণের অপরাধের স্ট্যাটিস্টিক্স চায় তারা। প্রেসও চায়। তারপরও বলবো, তুমি যদি তোমাদের ওখান থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে রিকোয়েস্ট করো তাহলেই বরং বেটার হয়। নইলে সাসপেক্টকে লোকেট করার পর অ্যারেস্ট করতে পারবে না। বুঝতে পেরেছো তো?”
মাথা নেড়ে সায় দিলো ছফা। “আমিও সেটা বুঝি। কাল-পরশুর মধ্যেই ওখান থেকে একটা রিকোয়েস্ট করা হবে। তবে আমি চাইছি তার আগেই সাসপেক্ট লোকেট করার কাজটা শুরু করে দিতে।”
মাথা নেড়ে সায় দিলো সুশোভন। “আচ্ছা, তুমি ইন্টারপোলের হেল্প নিচ্ছো না কেন?”
“অনেক সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। খুব দ্রুত মহিলাকে ট্র্যাক করতে না পারলে সে হয়তো এখান থেকেও সটকে পড়বে, তাই আমি সময় নষ্ট করতে চাইছি না। তোমার কাছ থেকে একটু হেল্প পেলেই আশা করি কাজটা শুরু করতে পারবো। “
“ওকে,..কালকেই পেয়ে যাচ্ছো ওটা।”
“থ্যাঙ্কস দাদা।”
“এখন বলো, উঠবে কোথায়? তুমি তো সঙ্গে করে ছোট্ট একটা হ্যান্ডলাগেজ ছাড়া আর কিছুই আনননি দেখছি।”
ছফা কখনও ভ্রমণের সময় বড়সর লাগেজ বয়ে বেড়ায় না। ব্রিফকেস আকারের ছোট্ট একটা হ্যান্ডলাগেজই তার সম্বল। প্রয়োজনীয় জামা-কাপড় আর দরকারি জিনিসপত্র ছাড়া বাড়তি কিছুই সঙ্গে নেয়নি।
“কোথায় উঠলে সুবিধা হয়, বলো তো?”
সুশোভন একটু ভেবে বললো, “চাইলে হোটেলের খরচাটা সেভ করতে পারো। তবে শেষ পর্যন্ত ওটা অবশ্য জলেই যাবে!” চোখ টিপে দিলো নগরপাল।
হেসে ফেললো ছফা। জলে যাবে বলতে, মদের পেছনে যে ব্যয় করতে হবে সেটা বুঝতে পারছে।
“তোমার বৌদি বাপের বাড়িতে আছে এখন। তুমি আমার ওখানেই উঠছে, ঠিকাছে?”
“বাপের বাড়িতে চলে গেছে? ঝগড়া করেছো নাকি?”
“আরে না, মেয়েছেলেদের সাথে আমি ঝগড়া-টগড়া করি না। ওকে কয়েকটা মাস ওখানেই থাকতে হবে।”
“কেন? অসুখ করেছে?”
“হুম।”
সুশোভনের মুখের হাসি দেখে ছফা অবাক হলো, কারণটাও ধরতে পারলো না সে।
“আরে, সিরিয়াস কিছু না…সি কন্সিড।”
“ওহ্,” হেসে ফেললো ছফা। হাতটা বাড়িয়ে দিলো সুশোভন মিত্রের দিকে। “কগ্র্যাচুলেশন্স।”
“থ্যাঙ্কস, করমর্দন করতে করতে বললো সহকারী নগরপাল।
“ফার্স্ট ইস্যু?”
মাথা নেড়ে সায় দিলো সুশোভন। “তুমি তাহলে আমার ওখানেই উঠছে।”
মুচকি হেসে মাথা নেড়ে সায় দিলো নুরে ছফা।
৫০. লাইব্রেরিটা ফাঁকা
অধ্যায় ৫০
ওই আসে ওই অতি ভৈরব হরষে
জলসিঞ্চিত ক্ষিতি সৌরভ রভসে…
বিকেলের পরই নতুন এই লাইব্রেরিটা ফাঁকা হয়ে যায়, আর তখনই সে চলে আসে এখানে। লোকজন থাকলে কখনও আসে না।
একজন নারী হিসেবে লক্ষ্য করে দেখেছে, তাকে দেখলেই লোকজন কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। অবশ্য এটা এ দেশের সবখানেই দেখা যায়-একটা মেয়েমানুষ আশেপাশে থাকবে, হেঁটে যাবে আর তার দিকে তাকাবে না, মনোযোগ আকর্ষিত হবে না কোনো পুরুষমানুষের?
এমনকি, মেয়েরাও মেয়েদের দিকে তাকায়, যদি সেই মেয়েটি চোখে পড়ার মতো হয়, কিংবা তার ব্যক্তিত্ব হয় প্রখর। ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের এই তাকানোর মধ্যে বেশ পার্থক্য আছে-ছেলেগুলো যেখানে চোখ দিয়ে খেয়ে ফেলতে চায়, মেয়েগুলো সেখানে অবধারিতভাবেই ঠোঁট বেঁকিয়ে, এমন একটি অভিব্যক্তি করে, যেনো নিজের ভেতরে বাম্পায়িত ঈর্ষা ঠেলেঠুলে উদগীরিত করতে চাইছে।
