অমায়িক হাসি দিয়ে হাতটা বাড়িয়ে দিলো নুরে ছফা। “তুমিও তো খুব একটা বদলাওনি, দাদা…আগের চেয়ে একটু স্লিমও হয়ে গেছে।”
হা-হা করে প্রাণখোলা হাসি দিলো সুশোভন। “তার কারণ ডায়েট নয়…কাজের ভীষণ চাপ। সেই সাথে তোমার বৌদির দারোগাগিরি।”
হেসে ফেললো ছফা।
“বসো,” ডেস্কের সামনে চেয়ারে বসার ইশারা করে নিজেও বসে পড়লো। “এক বছর ধরে আমাকে ভেজ থাকতে বাধ্য করছে সে।”
“বৌদি কিন্তু ঠিকই করছে,” বললো ছফা। “এখন বলল, আছো কেমন?”
কাঁধ তুললো সুশোভন মিত্র। “চলে যাচ্ছে। তোমার কি খবর? ক-টা প্রমোশন বাগালে?”
“মাত্র দুটো, তবে কাজের অনেক চাপ বেড়ে গেছে।”
“হুম, চাপে না পড়লে কি ঢাকা থেকে উড়ে আসতে কলকাতায়,” হেসে বললো নগর পাল। “কততদিন থাকছে এখানে?”
“সত্যি বলতে, কাজটা করতে কতোদিন লাগবে সে-ব্যাপারে আমার কোনো ধারনাই নেই। বুঝতে পারছি না কতো দিন থাকতে হবে।”
“সাসপেক্ট ট্র্যাক-ডাউন করাটা খুবই কঠিন কাজ, সুন্দর করে ছাটা পুরু গোঁফের বামপ্রান্ত মোচড়াতে মোচড়াতে বললো সুশোভন মিত্র। এই গোঁফ নিয়ে তার বাতিকের কথা ছফা জানে তাদের মধ্যে দ্বিতীয় সাক্ষাতের সময় থেকেই। ফ্রান্সের লিওঁতে ইন্টারপোলের সদর দফতরে এক সেমিনারে দেখা হয়েছিলো, তারা উঠেছিলো একই হোটেলে। রাতে ছফার রুমে এসে বেশ গল্প করতো নগরপাল।
“এক হপ্তায় তোমার কাজ হয়ে যাবে কিনা বুঝতে পারছি না।”
“না হলে আর কি, তোমাকে আরেকটু জ্বালাতে হবে,” হেসে বললো। “তবে কাজটা দ্রুত করার তাড়া আছে।”
“ইনভেস্টিগেশনের টাইমফ্রেম দেয়া আছে নাকি?”
“হুম।”
“তাহলে কঠিন হয়ে যাবে তোমার জন্য।”
“তা বলতে পারো।” পকেট থেকে মুশকান জুবেরির একটা ছবি বের করে দেখালো সে। “সাসপেক্টের ছবি।”
ছবিটা হাতে তুলে নিয়ে ভুরু কুঁচকে ফেললো সুশোভন। “এটা কবেকার?”
ভিরমি খেলো ছফা। ছবিটা যে বেশ পুরনো সেটা যেকোনো অভিজ্ঞ চোখ ধরে ফেলে, এ কারণে ডিবির ফটো রিকন্সট্রাকশন করে যে ছেলেটা তাকে দিয়ে ছবির ব্যাকগ্রাউন্ড কাট-আউট করে নিয়েছে যাতে করে পেছনের পার্কে থাকা অন্যসব মানুষজনের সত্তুর দশকের বেলবটম প্যান্ট পরা কাউকে দেখে সময়টা ধরতে না পারে। তারপরও সুশোভনের অভিজ্ঞ পুলিশি চোখ ধরে ফেলেছে, এটা বেশ পুরনো ছবি। ছফা যদি বলে এটা ১৯৭৫-৭৬ সালের দিকে তোলা তাহলে মুশকানের বয়স এখন সত্তুরেরও বেশি! এই বয়সের একজন সাসপেক্ট বেশ কিছু তরতাজা যুবকের অন্তর্ধানের সাথে জড়িত, এমন কথা কোনো মানুষ বিশ্বাস করতে চাইবে না। আর সেই মানুষটা যদি পুলিশ হয় তাহলে তো কথাই নেই।
“কতো পুরনো জানি না, মনে হয় নব্বইয়ের দিকে হবে,” অবশেষে মিথ্যেটাই বললো ছফা।
সুশোভনের কপালের ভাঁজ আরো ঘন হলো। “নব্বই!? বলো কী! দেখে তো মনে হচ্ছে আরো পুরনো,” ছবির দিক থেকে মুখ না তুলেই বললো। “হেয়ারস্টাইলটা একেবারে মিড-সেভেন্টির মতো।”
মনে মনে প্রমাদ গুনলো ছফা।
“আচ্ছা, তুমি কী সাসপেক্ট করছো?”
কয়েক মুহূর্তের জন্য ছফা বুঝতে পারলো না কী বলবে। “কী সাসপেক্ট করছি?” প্রশ্নটাই আওড়ালো আবার। “এই মহিলা হিউম্যান অগ্যান পাচারকারী চক্রের সাথে জড়িত বলে সন্দেহ করছি।”
“তুমি বলেছিলে সে একজন মেডিকেল ডক্টর?”
“হুম, দীর্ঘদিন আমেরিকায় ছিলো, ওখানেই পড়াশোনা করেছে। তারপর বেশ কবছর আগে বাংলাদেশে চলে আসে। তবে আমার মনে হয়, এখানে আসার পর ঐ চক্রের সাথে জড়িয়ে পড়ে মহিলা।”
মাথা নেড়ে সায় দিলো সুশোভন। “মহিলা দেখতে কিন্তু সেই রকম মাইরি।” কথাটা বলেই হেসে ফেললো সে। “সি হ্যাড দ্য গ্ল্যামার ইন হার আর্লি এইজ।”
এখনও তা-ই আছে, মনে মনে বললো সে। সত্যিটা তুমি যদি জানতে!
“তুমি শিওর, মহিলা একাই অপারেট করে?”
একটু গাল চুলকালো ডিবির নুরে ছফা। “সম্ভবত…তবে নিশ্চিত নই।”
“আমার তো মনে হয় না সে একা একা অপারেট করে,” ছবিটা ডেস্কের উপর রেখে বললো সুশোভন। “অগ্যান স্মাগলারদের চক্রটা বেশ বড় হয়ে থাকে। অনেকগুলো ধাপ থাকে, প্রতিটি ধাপেই থাকে একাধিক লোক। আমাদের এখানেও এরকম কিছু চক্র রয়েছে। ওদের সাথে এই মহিলার কোনো যোগসাজশ নেই তো?”
কাঁধ তুললো ছফা। “এটা তো জানি না। তবে আমার ধারণা এই মহিলা ওভাবে কাজ করে না, সে একা একাই কাজ করে। কালেক্ট করার পর হয়তো তার পরিচিত স্মাগলারদের কাছে বিক্রি করে দেয়। সেজন্যে তার সম্পর্কে তথ্য আদায় করা সহজ হয়নি, শক্ত কোনো প্রমাণও জোগাড় করতে পারিনি।”
“এরকম একজন বয়স্ক মহিলা কী করে এটা করে? এ ছবিটি যদি নব্বইর দিকের হয়ে থাকে তাহলে তো এখন তার বয়স কম হবে না।”
অবাকই হলো কলকাতা পুলিশের সহকারী নগরপাল।
“মহিলা একজন মেডিকেল ডক্টর,” একটু সামনের দিকে ঝুঁকে বললো ছফা। “তার কাজের ধরণটাও বেশ আলাদা। সে প্রতিটি ভিক্টিমের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করে তাদেরকে নিজের ডেরায় নিয়ে কাবু করে ফেলে।” কথাটা বলার পর পরই নিজের কাবু হওয়ার ঘটনাটির কথা মনে পড়ে গেলো তার। মুশকান জুবেরির ঘরে ঢোকার পর কী বোকার মতোই না সে নাকাল হয়েছিলো!
মাথা দোলালো সুশোভন মিত্র। “তুমি শিওর, মহিলা এখন কলকাতায় আছে?”
“হুম। যতোটুকু জানি, সে পালিয়ে এখানেই চলে এসেছে।”
“আচ্ছা,” মাথা নেড়ে সায় দিলো কলকাতা পুলিশ ফোর্সের নগরপাল। “তাহলে কিভাবে কাজটা শুরু করতে চাইছো তুমি?”
