মাথায় খুন চেপে গেলো আসলামের। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে বেগই পেলো সে। কিন্তু যেই না দেখলো কলটা করেছে পিএস, হকচকিয়ে গেলো। এরকম সময় আশেক মাহমুদ সচরাচর তাকে ফোন দেয় না।
কলটা রিসিভ করার সঙ্গে সঙ্গে টের পেলো, ভেতরের সমস্ত উত্তেজনা দপ করে নিভে গেছে। নেতিয়ে পড়েছে তার ধর্ষকামী ছোট্ট পশুটি!
.
অধ্যায় ৪৯
কলকাতা শহর থেকে বেশ খানিকটা দূরে দমদম নামক স্থানে যে বিমানবন্দরটি অবস্থিত সেটার অফিশিয়াল নাম ‘নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’, কিন্তু লোকমুখে দমদমই বেশি উচ্চারিত হয়।
এই বিমানবন্দর দিয়ে কলকাতায় প্রবেশের অভিজ্ঞতা ছফার জন্য নতুন নয়, তবে বিগত দু-বছরে এই প্রথম পদার্পণ করলো সে। ছাত্রজীবনে বন্ধুবান্ধবদের সাথে অবশ্য দুয়েকবার সড়কপথে যশোর-বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে কলকাতায় যাবার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তবে চাকরি জীবনে ঢোকার পর যতোবারই গেছে কাজের প্রয়োজনেই গেছে। দু-বছর আগে, এক স্ত্রী আর তার পাঁচ বছরের শিশুকন্যার রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হবার যে কেসটা তদন্ত করেছিলো সেটার এক পর্যায়ে তাকে কলকাতায় যেতে হয়। ঐ সময়ই প্রথমবারের মতো কলকাতা পুলিশ ফোর্সের সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা হয়েছিলো তার, আর তখন বেশ কিছু পুলিশ অফিসারের সাথে সখ্যতা গড়ে ওঠে। সেই সব অফিসাররা ছফার মতোই উচ্চপদে অধিষ্ঠিত। তাদের কারো কারোর সাথে বিদেশের মাটিতে ইন্টারপোলের সম্মেলনে দুয়েকবার দেখাও হয়েছে, তবে নিয়মিত যোগাযোগ মাত্র একজনের সাথেই হয়-ছফার গন্তব্য এখন সেই মানুষটির অফিস।
কোনো এক অদ্ভুত কারণে, প্রিয় মানুষজনের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে পারে না সে। এক ধরণের অনীহা জেঁকে ধরে তাকে। এমন না যে, ঐসব মানুষের সঙ্গ কিংবা আলাপচারিতা তার ভালো লাগে না। সম্ভবত দীর্ঘকাল একা একা থাকার কুফল এটি।
রিগ্যাল এয়ার ওয়েজের বিমানটি রানওয়ে স্পর্শ করতেই নুরে ছফার মধ্যে অদ্ভুত এক অনুভূতি তৈরি হলো। তার মন বলছে এখানেই আছে মুশকান জুবেরি। যুক্তিবুদ্ধিও তাতে পুরোপুরি সায় দিচ্ছে। ইনভেস্টিগেটর হিসেবে সে কখনও এমনও দেখেছে, যুক্তি নয়, ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় তাকে পরিচালিত করে নিয়ে গেছে সত্যের কাছাকাছি। কিন্তু এবার তার যুক্তি-বুদ্ধি আর সজ্ঞা একই কথা বলছে!
কলকাতায় আসার আগেই ওখানকার পুলিশ হেডকোয়াটারের সহকারী নগরপাল সুশোভন মিত্রের সাথে সে যোগাযোগ করেছে। বয়সে তার থেকে কয়েক বছরের বড় হলেও তাদের মধ্যে রয়েছে দারুণ সখ্যতা। সুশোভনকে এই সফরের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সংক্ষেপে ওয়াকিবহাল করেছে সে। তবে কাজটা কিভাবে করবে সে নিয়ে কিছু বলেনি। অভিজ্ঞতা থেকে সে জানে, সব কথা আর অনুরোধ টেলিফোনে সেরে ফেলাটা বোকামি। ঢাকা থেকে কলকাতায় উড়ে এসে কোনা অনুরোধ করলে সেটা রক্ষা করার তাগিদ অনেক বেশি অনুভব করবে। সেজন্যে ছফা শুধু জানিয়েছে, তার কাছে। নিশ্চিত তথ্য আছে, বাংলাদেশ থেকে এক সাসপেক্ট কলকাতায় আত্মগোপন করে আছে, তাকে ট্র্যাক ডাউন করতে চাইছে সে। এ কথা শুনে সুশোভন তাকে আশ্বাস দিয়েছে যথাসম্ভব সাহায্য করার জন্য।
ছফাও জানে তার কাছ থেকে ভালো রকম সাহায্য পাওয়া যাবে, কিন্তু সমস্যা অন্যখানে। এই সাহায্যের আবেদনটি ইন্টারপোলের মাধ্যমে করা হয়নি, কিংবা দু দেশের পুলিশ বিভাগের মধ্যেকার কোনো অনুরোধের ভিত্তিতেও নয়-এটা হচ্ছে একান্তই ব্যক্তিগত সম্পর্কের খাতিরে। এর কারণও রয়েছে-মুশকান জুবেরির বিরুদ্ধে এমন কোনো অভিযোগ আনা যায়নি যে, ইন্টারপোলে মহিলাকে ফেরারি আসামি হিসেবে তালিকাভূক্ত করানো যাবে। তাছাড়া, মুশকানের সত্যিকারের কাহিনীটাও কারো কাছে বলেনি ছফা। তাই অন্য অনেকের মতো সুশোভন মিত্রের কাছেও গোপন রেখেছে।
আমি কি তাকে উদ্ভট গল্পটা বলবো? কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন কেউ এটা বিশ্বাস করবে?
নিজেকে অনেকবার এ প্রশ্ন করেছে। কেউ যদি মুশকানের এই গল্পটা বিশ্বাসও করে, তাতেও ঝুঁকি আছে। যে কারনে খোদাদাদ শাহবাজ খান তাকে ছাড়া আর কাউকেই বলেনি, মানুষের শরীরের বিশেষ একটি প্রত্যঙ্গ খেয়ে মুশকান জুবেরি নিজেকে চিরযৌবনা করে রেখেছে। গল্পটা যে বিশ্বাস করবে সে হয়তো হন্যে হয়ে জানতে চাইবে, ঠিক কোন প্রত্যঙ্গটি খেলে এমন আরাধ্য লাভ করা যায়-আর এটা করার একটাই উপায় আছে-মুশকান জুবেরিকে নিজের কজায় নিয়ে, নির্যাতন করে তার কাছ থেকে তথ্যটা জেনে নেয়া। সিক্রেটটার আর্থিক মূল্য হতে পারে কয়েক কোটি টাকা। আর এজন্যে যেকোনো কিছু করতেও পিছপা হবে না এ পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ।
বিমানবন্দর থেকে একটা ট্যাক্সি নিয়ে ছফা চলে গেলো লালবাজারে অবস্থিত কলকাতা পুলিশ ফোর্সের সদর দপ্তরে, সুশোভন মিত্র বর্তমানে সেখানেই কর্মরত আছে। লালবাজারের লাল ইটের বিশাল আর মনোরম ভবনের সামনে যখন ছফার ট্যাক্সিটা থামলো তখন বিকেল প্রায় চারটা।
মেইন গেটের সিকিউরিটিকে আগেই বলে দিয়েছিলো সুশোভন, তাই পরিচয় দেবার সঙ্গে সঙ্গে তাকে বলে দেয়া হলো কতো তলার কলো নম্বর রুমে যেতে হবে।
“আরে ছফা, তুমি দেখি একই রকম আছো, তাকে ঘরে ঢুকতে দেখে নিজের ডেস্ক থেকে উঠে দাঁড়ালো সুশোভন মিত্র। “একটুও বদলাওনি! ঘটনা কি?” সহাস্যে বললো কলকাতা পুলিশ ফোর্সের সহকারী নগর পাল।
