খোদাদাদ শাহবাজ খান আবারও নজর দিলো বইয়ের পৃষ্ঠায়। এখন যে বইটা পড়ছে সেটা পল্টনের ফুটপাত থেকে কয়েক দিন আগে কিনেছে মাত্র আশি টাকা দিয়ে। দোকানির বইয়ের স্তূপে অবহেলায় পড়েছিলো। গ্রাহাম হ্যাঁনককের বেস্টসেলার নন-ফিকশন ম্যাজিশিয়ান্স অব দি গডস যে পল্টনের ফুটপাতে গড়াগড়ি খাবে সেটা ঘুনাক্ষরেও ভাবেনি। বইয়ের কাভারটা ছেঁড়াফাড়া হলেও ভেতরের পাতাগুলো সব অক্ষত ছিলো। দোকানি সম্ভবত কাভারের করুণ দশার জন্য বেশি দাম হাঁকেনি তার কাছে।
এই লেখকের ফিঙ্গারপ্রিন্ট অব গড আগেই পড়া ছিলো তার। ম্যাজিশিয়ান্স পড়ে আরো মুগ্ধ হচ্ছে। তুরস্কের গোবেলি তেপে নামক একটি জায়গায় প্রায় ১২০০০ বছরের প্রাচীন পূরাকীর্তি পাওয়া গেছে, আর সেটা নাকি তৈরি করেছিলো মহাপ্লাবন সংঘটিত হবার পর বেঁচে যাওয়া উন্নত প্রজাতির কিছু মানুষ! লেখক বলার চেষ্টা করছেন, এরা সেই আটলান্টিসের অধিবাসী যাদের উন্নত মহাদেশটি তলিয়ে গেছিলো জলরাশির তলে।
এমন সময় কেএস খানের ফোনটা বেজে উঠলে বিরক্তি ভর করলো চোখেমুখে। পড়ার সময় দু-জন মানুষের ফোন তাকে বিরক্ত করে না। একজনের ফোন পেলে বরং খুশিই হয়, আর অন্যজনের ফোন নিয়মিত ব্যাপার, অনেকটা তার দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে। কিন্তু ডিসপ্লের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলো, এদের কেউ না, ফোনটা দিয়েছে ডিবির ইনভেস্টিগেটর নুরে ছফা। সঙ্গে সঙ্গে চোখেমুখে কৌতূহল ফুটে উঠলো তার।
“আরে, ছফা যে…কী খবর আপনের?” হাসিমুখে বললো খোদাদাদ শাহবাজ খান।
“স্যার, খবর ভালো। আপনি কেমন আছেন?”
“আছি ভালাই…আপনের খবর বলেন, সুন্দরপুরেই আছেন নাকি ঢাকায়?”
সুন্দরপুর থেকে ফিরে এসে কেএস খানের সঙ্গে দেখা করেনি ছফা, এমনকি ফোনও দেয়নি, সোজা চলে গেছিলো অ্যাডভোকেট ময়েজ উদ্দিনকে ধরার জন্য। “আমি কালকে এসেছি, স্যার।”
“ঐখানকার খবর কি? কিছু পাইলেন?” আগ্রহী হয়ে উঠলো সাবেক ইনভেস্টিগেটর।
“জি, স্যার…দারুণ খবর আছে, সেজন্যেই আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে চেয়েছিলাম। আপনি কি ফ্রি আছেন?”
“বলেন, আমি বাসায়ই আছি…কোনো ক্লাস নাই আজ।”
এরপর টেলিফোনেই ছফা সংক্ষেপে জানালো মাস্টার রমাকান্তকামারের ঘর থেকে মুশকান জুবেরির চিরকুট পাবার কথা, সেখান থেকে ট্রাস্টের উকিল ময়েজ উদ্দিনকে ধরা, তার স্বীকারোক্তি মোতাবেক ডাক্তার আসকার ইবনে সায়িদের বনানীর বাসায় গিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা, আর ডাক্তারের পাসপোর্টের কথাটা। কিন্তু বৃদ্ধ ডাক্তার অসুস্থ হয়ে পড়ার আগে যে নতুন কাহিনীটা তাকে বলেছে সেটা একেবারে চেপে গেলো। তার ধারণা, ঐ কাহিনী শোনার পর কেএস খান মাথা ঘামাতে শুরু করে দেবে। ছফার আশঙ্কা, সম্ভবত কাহিনীটায় বিশ্বাসও করে বসবে তার সিনিয়র। সব সময় যৌক্তিক বিষয়েই তার পক্ষপাতিত্ব থাকে বেশি। আর ডাক্তারের নতুন গল্পটি যে অনেক বেশি যুক্তিযুক্ত সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু ভদ্রলোকের কথা বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। লোকটা ধূর্ত। তাকে বিভ্রান্ত করার জন্য, ঐ মহিলাকে রক্ষা করার জন্য সম্ভবত নতুন একটি গল্পের অবতারণা করেছেন।
“আপনের মতো আমার মনে হইতাছে, ঐ ডাক্তারই মুশকান জুবেরিরে কলকাতায় নিয়া গেছে, সব শোনার পর বললো মি. খান।
“জি, স্যার। ভদ্রলোক এটা লুকানোর অনেক চেষ্টা করেছেন। আমি নিশ্চিত, তিন বছর আগে ডাক্তার যখন আমেরিকায় চলে যাওয়ার কথা বলে দেশ ছাড়লেন তখনই মুশকান জুবেরিকে নিয়ে কলকাতায় চলে গেছিলেন।”
“হুম,” গম্ভীর কণ্ঠে বললো কেএস খান। “এতো জায়গা থাকতে কলকতায় কেন, সেইটা বুঝবার পারতাছি। বাড়ির একেবারে পাশে…পাসপোর্ট ছাড়াও বর্ডার দিয়া যাওন যায়।”
“জি, স্যার। ইন্ডিয়ান বর্ডার কিন্তু সুন্দরপুর থেকে বেশি দূরেও নয়…ঘণ্টাখানেকের পথ সম্ভবত।”
মাথা নেড়ে সায় দিলো সাবেক ডিবি অফিসার।
“তাছাড়া কলকাতায় ডাক্তারের পরিচিত মানুষজনও থাকতে পারে।”
“হুম…তা হইতে পারে। নামকরা ডাক্তার, দেশ-বিদেশে ঘুইরা বেড়ায়, বিরাট বড় হাসপাতালের ওনার…রিসোর্সফুল তো হইবোই।”
“ডাক্তারের পাসপোর্ট বলছে, তিনি অনেক বছর আগে থেকেই ফ্রিকোয়েন্টলি কলকাতায় যাতায়াত করছেন।”
“এইটা একটা ভালা পয়েন্ট,” কৌতূহলি হয়ে বললো কেএস খান। “তার মাইনে, ঐখানে ডাক্তারের রিসোর্স আছে, জানাশোনা লোকজন আছে।”
“জি, স্যার। কিন্তু উনার পেট থেকে সব কথা বের করার আগেই অসুস্থ হয়ে পড়লেন, এখন আছেন আইসিসিউতে…মনে হয় না সপ্তাহখানেকের মধ্যে তার নাগাল পাবো।”
“আমার তো মনে হয় ভদ্রলোক দেশ ছাড়বো। উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে চইলা গেলে তারে কেমনে আটকাইবেন?”
“উনার পক্ষে সেটা করা সম্ভব হবে না, স্যার। পিএস আশেক মাহমুদ এই বিষয়টা দেখবেন, ইমিগ্রেশনে বলে দিয়েছেন তিনি।”
“ও,” মি. খান আর কিছু বললো না। সব ধরণের ক্ষমতার অপব্যবহার তার ভীষণ অপছন্দ, সেটা যদি তদন্তের কাজে সাহায্য করে তারপরও।
“আমার তো ইচ্ছে, আজকের দুপুরের ফ্লাইটেই কলকাতায় চলে যাওয়া, কিন্তু অতো বড় শহরে কী করে মুশকান জুবেরিকে খুঁজে বের করবো বুঝতে পারছি না, স্যার।”
“হুম।” গম্ভীর হয়ে বললো ছফার সিনিয়র। চিন্তিত মুখে ঘরের সবচাইতে দূরের দেয়ালের দিকে তাকালো। আইনস্টাইনের জিভ বের করে রাখা সাদাকালো ছবিটার দিকে তাকালেই একটা কথা মনে পড়ে যায় তার : জটিল চিন্তা বোকারহদ্দরা করে! বুদ্ধিমানেরা করে সহজ চিন্তা!
