কলিংবেলটা বেজে উঠলে বর্তমানে ফিরে এলো আশেক মাহমুদ। আসলামের কাছে এই ফ্ল্যাটের বাড়তি একটা চাবি আছে, তাকে উঠে গিয়ে দরজা খুলতে হবে না।
একটু পরই এক মেয়েকে নিয়ে ঢুকলো গানম্যান। প্রধানমন্ত্রীর পিএসকে দেখে নিঃশব্দে সালাম ঠুকলো মেয়েটি।
“ওই ঘরে যাও…আমি আসছি,” বেডরুমের দিকে ইশারা করে মেয়েটাকে বললো।
চুপচাপ শোবার ঘরে চলে গেলো মিডিয়াতে একটু-আধটু নামকরা অভিনেত্রী মেয়েটি।
আসলাম দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ। এরকম মুহূর্তে সে বলতে গেলে কথাই বলে না।
“ঐ ডাক্তারের কী খবর?”
“আমি আইসিসিইউতে গিয়ে দেখেছি, ডাক্তার ওখানে নেই। লোকটা হাসপাতালে অ্যাডমিট কিনা ওখানকার কেউ জানে না, স্যার।”
মুচকি হাসলো পিএস, মদের গ্লাসে আরেকটা চুমুক দিলো। “মনে হচ্ছে, তোমার কথাই ঠিক-ডাক্তার অভিনয় করেছে।”
আসলামের মুখে সামান্য হাসি দেখা দিলো। লোকটা যে ধোঁকা দিয়েছে সেটা আগেই বুঝতে পেরেছিলো। কিন্তু ঐ ডিবি অফিসার ছফা ধরতে পারেনি। সে যতোই তুখোড় ইনভেস্টিগেটর হোক না কেন, এক বুড়ো ভামের অভিনয়ে পটে গেছে। ছফা যদি ডাক্তারকে তার হাতে ছেড়ে দিতো তাহলে পাঁচ মিনিটেই সব কথা তার পেট থেকে বের করে ছাড়তো সে। কিভাবে করতো সেটা নিয়ে তাকে খুব একটা মাথাও ঘামাতে হতো না। সরাসরি নাইন এমএমের পিস্তলটার নল ঠেকাতো বুড়োর কপালে, তারপর চোখমুখ শক্ত করে যা জানতে চাইতো সবই বলে দিতো ঐ শয়তানটা।
“ওটা ওর নিজের হাসপাতাল, সত্যি সত্যি অসুস্থ হলে হৈচৈ পড়ে যেতো। অথচ কেউ কিছু জানে না!”
মাথা নেড়ে সায় দিলো গানম্যান। “কিন্তু সে এখন কোথায় আছে সেটা তো বের করতে হবে।”
“আমি কি আবারো ডাক্তারের বাড়িতে যাবো? ঐ দারোয়ান ব্যাটা-”
“না।” আসলাম কথা শেষ করার আগেই বললো পিএস। “কোনো দরকার নেই। আমি এটা জেনে নিতে পারবো…অন্যভাবে।”
হাফ ছেড়ে বাঁচলো গানম্যান, তবে সেটা তার অভিব্যক্তিতে প্রকাশ করলো না। ডাক্তার এখন কোথায় আছে সেটা বের করা সহজ কাজ হতো না। তবে আশেক মাহমুদের বসবাস ক্ষমতার একেবারে কেন্দ্রে, সবখানে তার লোক আছে। এসব খবর বের করা তার পক্ষে খুব একটা কঠিন কিছু হবে না নিশ্চয়।
“তুমি বাসায় যাও…বিশ্রাম নাও।” কথাটা বলেই হুইস্কির গ্লাসটা ঠোঁটের কাছে রেখে ফাঁকা দৃষ্টি নিয়ে চেয়ে রইলো পিএস।
“জি, স্যার।” ঘর থেকে চলে গেলো আসলাম। কাল সকালে তাকে আবারো আসতে হবে এখানে। যেটাকে নিয়ে এসেছে সেটাকে আবার পৌঁছে দিয়ে আসবে।
বাইরের দরজাটা বন্ধ হবার শব্দ কানে গেলে পকেট থেকে ফোন বের করে একটা নাম্বারে ডায়াল করলো আশেক মাহমুদ। একবার রিং হবার পরই তার কলটা রিসিভ করা হলো। এরকম লোকজন তার কল পেলে ধন্য হয়ে যায়। সরকারদলীয় ডাক্তারদের যে অঙ্গসংগঠনটি আছে সেটার মধ্যমগোছের নেতা সে।
“ওয়ালাইকুম আসোলাম। কেমন আছো, ডাক্তার?” প্রধানমন্ত্রীর পিএস হাসিমুখে বললো।
ওপাশ থেকে গদগদ ভঙ্গিতে কথা বলে গেলো সেই ডাক্তার। পিএসের ফোন পেয়ে যে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছে, সেটা প্রকাশ করতে মোটেও কুণ্ঠিত হলো না। কিছুক্ষণ এ কথা ও কথা বলার পর আসল কথায় চলে এলো আশেক মাহমুদ।
“আসকার ইবনে সায়িদ তোমাদের হাসপাতালের একজন ওনার না?”
“জি, ভাই। বলতে গেলে উনিই মালিক। লায়ন শেয়ার তো উনারই।”
“হুম। ভদ্রলোক কি এখন তোমাদের হাসপাতালে অ্যাডমিট?”
“নাহ তো!” বিস্ময় ঝরে পড়লো ওপাশ থেকে। “এরকম কোনো কথা শুনিনি, ভাই। কে বললো আপনাকে?”
“শুনলাম আর কি।” একটু থেমে আবার বললো, “তুমি একটু খোঁজ নিয়ে কাল সকালে আমাকে জানাও। ব্যাপারটা জরুরী, বুঝতে পেরেছো?”
“জি, ভাই। কাল সকালে আমি খোঁজ নিয়েই আপনাকে জানাচ্ছি।”
“ওকে।”
কলটা কেটে দিয়ে উঠে দাঁড়ালো পিএস। ধীরপায়ে এগিয়ে গেলো শোবার ঘরের দিকে। খোলা দরজার কাছে আসতেই টের পেলো কড়া পারফিউমের গন্ধ ভেসে আসছে।
এসব মেয়েরা কেন যে সব সময় কড়া মেকআপ আর এরকম সেন্ট ব্যবহার করে সে জানে না।
.
অধ্যায় ৪৭
সকালে নাস্তা করেই কেএস খান একটি বই নিয়ে বসেছে-খুবই মনোযোগ দিয়ে পড়ছে সেটা। নাকের উপরে থাকা রিডিংগ্লাসের ভেতর দিয়ে দেখছে অক্ষরগুলো। গতকাল থেকে পড়তে শুরু করার পর আর বিরতি দেয়নি। এ মুহূর্তে, দূর থেকে তাকে দেখলে মনে হবে গবেষণার কাজে মগ্ন একজন অধ্যাপক।
খোদাদাদ শাহবাজ খান সব সময় নিজের বিছানায় শুয়ে-বসে বই পড়ে। ঘরে একটা টেবিল আছে কিন্তু ওটাতে বসে পড়ার অভ্যেস তার নেই। বিছানায় শুয়ে দু-পা ক্রশ করে পড়তেই বেশি ভালো লাগে। অবশ্য পাশে গরম চা থাকলে তার এই পাঠ আরো বেশি সুখকর হয়ে ওঠে। অল্পবয়সী আইনস্টাইন সেটা জেনে গেছে এততদিনে, সাবেক ইনভেস্টিগেটরকে বই পড়তে দেখলেই এক কাপ চা বানিয়ে বেডসাইড টেবিলে রেখে যায় সে।
বইয়ের দিকে চোখ রেখেই বেডসাইড টেবিলে হাত বাড়ালো কেএস খান, কিন্তু সেখানে কোনো কাপ-পিরিচের নাগাল পেলো না।
পড়া থেকে বিরতি দিয়ে তাকালো পাশের ঘরের দরজার দিকে। আধখোলা দরজা দিয়ে দেখা যাচ্ছে আইনস্টাইন মেঝেতে বসে টিভি পর্দার দিকে তাকিয়ে আছে-মটু-পাতলু নামের স্কুল এক কার্টুন দেখছে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে।
প্রসন্ন হাসি ফুটে উঠলো তার ঠোঁটে। ছেলেটা যতোই পাকনামি করুক, তার শৈশব এখনও অটুট আছে।
