আসলাম ভালো করে দু-পাশে তাকালো, ধীরপায়ে এগিয়ে যেতে যেতে দেখে গেলো কোন্ বেডে ডাক্তার আসকার আছেন। তার এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু ধীরগতির ভ্রমণটি শেষ হলো ঘরের শেষ মাথায় থাকা ডেস্কের সামনে এসে।
এখানে ডাক্তার নেই! বিস্ময়ের সাথেই আবিষ্কার করলো সে।
“আমি আবিদুর রহমানের ছোটোভাই,” ডেস্কে বসে থাকা ডাক্তারকে বললো আসলাম। “আমার রোগীর কী অবস্থা, বলেন?” কণ্ঠে উদ্বিগ্নতা ফুটিয়ে তোলার চেষ্টাও করলো না।
ডেস্কের ডাক্তার তার দিকে তাকিয়ে করুণ মুখে বললো, “আপনার রোগীর অবস্থা তো ভালো না। তার হার্ট মাত্র টোয়েন্টি পার্সেন্ট কাজ করছে, অবস্থা খুবই ক্রিটিক্যাল।”
আসলামের মধ্যে কোনো ভাবান্তর হলো না। এখন কী করবো তাহলে?”
“অবস্থা বেশি খারাপ হলে কি লাইফ সাপোর্ট দেবো?”
শালার বানচোতের দল! গালিটা মনে মনেই দিলো সে। লাইফ সাপোর্ট দিয়ে কখনও কোনো রোগী বাঁচাতে পেরেছিস! অভিজ্ঞতা থেকে সে এটা জানে, তারপরও বিলের অঙ্ক ভারি করার জন্য হাসপাতালগুলো এ কাজ করতে দারুণ তৎপর থাকে সব সময়।
“না। তার কোনো দরকার নাই,” কাটাকাটাভাবে বললো সে। অচেনা রোগীর আত্মীয়-স্বজনদের টাকা বাঁচিয়ে দেবার মতো পূণ্য কাজটা করলো।
ডাক্তার কয়েক মুহূর্ত চেয়ে রইলো আসলামের দিকে, যেনো পাষণ্ড কোনো ছোটোভাইকে দেখছে।
“আমার ভাই বলে দিয়েছেন তাকে যেনো লাইফ সাপোর্টে দেয়া না হয়।”
“ওহ্,” আশাহত ডাক্তার শুধু এটুকুই বললো, তারপর ফিরে তাকালো কম্পিউটার মনিটরের দিকে।
আসলাম তিক্তমুখে ঘুরে দাঁড়ালো, যা বোঝার বুঝে গেছে সে। মাত্র পা বাড়াবে দরজার দিকে অমনি একটা বুদ্ধি খেলে গেলো তার মাথায়। আবারো ফিরলো ডেস্কের দিকে।
“আচ্ছা, আমি শুনেছি এখানে ডাক্তার আসকার অ্যাডমিট…উনার কী অবস্থা?”
তরুণ ডাক্তার বেশ অবাক হলো কথাটা শুনে। “ডাক্তার আসকার অ্যাডমিট?!”
“হুম, সেরকমই তো শুনলান। আমার বাবার বন্ধু উনি,” মিথ্যেটা সুন্দরভাবে বললো পিএসের গানম্যান। এখানে আসার পর শুনলাম উনার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে…অ্যাডমিট হয়েছেন আজই।”
ডাক্তার কী বলবে ভেবে পেলো না, ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো কয়েক মুহূর্ত। “উনি তো এখানে অ্যাডমিট হননি,” অবশেষে বললো সে। “আমি এরকম কিছু শুনিওনি।”
“তাহলে কি উনাকে এমার্জেন্সি থেকেই রিলিজ দিয়ে দেয়া হয়েছে?”
ঠোঁট ওল্টালো তরুণ ডাক্তার। “নিজের হাসপাতালে এলে ইমার্জেন্সি থেকে চলে যাবেন?” মাথা দোলালো। “মিনিমাম কয়েক দিন অবজার্ভেশনে থাকবেন না?”
আসলাম কিছুই বললো না।
মাথা দোলাতে দোলাতে তরুণ ডাক্তার কম্পিউটার মনিটরের দিকে মনোযোগ দিলো আবার। নীচের ঠোঁট কামড়ে আছে এখনও। ডাক্তার আসকারের এমন খবর শুনে সে-ও ভিরমি খেয়েছে।
উল্টো দিকে ঘুরে চুপচাপ আইসিসিইউ থেকে বের হবার জন্য পা বাড়ালো আসলাম।
ডাক্তার এই হাসপাতালে নেই।
.
অধ্যায় ৪৬
সুবিশাল একটি ড্রইংরুমে বসে আছে আশেক মাহমুদ। ঢাকা শহরে তিনটি ফ্ল্যাটের মধ্যে এই ফ্ল্যাটটায় মাঝেমধ্যেই রাত্রি যাপন করে। তার বোন যে ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাটে আছে সেটার উপর তলায় থাকে সে। এছাড়া অন্য ফ্ল্যাটটা ভাড়া দিয়ে দিয়েছে।
গুলশান নিকেতনের এই ফ্ল্যাটটা বলতে গেলে খালিই পড়ে থাকে, তবে বিশেষ দরকারে এখানে আসে-একাকীত্ব ঘোচায়! আজ রাতেও সেটা করবে। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা উপঢৌকন চলে আসবে তার কাছে!
হাতে দামি হুইস্কির গ্লাসটায় চুমুক দিচ্ছে আর ভাবছে, কিন্তু তার ভাবনা বার বার চলে যাচ্ছে নিজের ব্যক্তিগত বিষয়ের দিকে। প্রথম প্রথম বৌ-বাচ্চাদের যখন কানাডায় পাঠিয়ে দিলো, তখন প্রতিদিন বাসায় ফিরে তাদের সাথে ভিডিও কলে কথা হতো, তারাও খোঁজখবর নিতে তার। ইদানিং সেটা ক্রমশ হ্রাস পেতে পেতে সপ্তাহে একবারে গিয়ে ঠেকেছে। এর কারণ এই নয় যে, তার ব্যস্ততা। বরং অবাক হয়েই লক্ষ্য করেছে, তার স্ত্রী আর সন্তানেরা ফাস্ট ওয়ার্ল্ডে গিয়ে নিজেদের নিয়ে এমন ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। যে, তার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেও হিমশিম খায়। তবে মাস শেষ হবার আগে এই যোগাযোগ সামান্য একটু বেড়ে যায় ওদের পক্ষ থেকে, বিশেষ করে তার স্ত্রী তখন প্রতিদিনই খোঁজ নেয়। এই নশ্বর পৃথিবীর আসল ঈশ্বর যে কী, সেটা আশেক মাহমুদ বুঝে গেছে এতো দিনে।
এখন তার সবচাইতে ঘনিষ্ঠজন হলো আসলাম। তার সব গোপন কাজের তদারকি করে সে। হোক সেটা ব্যক্তিগত কিংবা রাজনৈতিক।
সরকার থেকে গানম্যান পেলেও তাদেরকে নিয়ে সবখানে যাতায়াত করে না। করা সম্ভবও নয়, আর সেজন্যেই পিএসের চাকরিটা পাবার পর থেকেই একজন বিশ্বস্ত আর সাহসী লোকের দরকার পড়েছিলো। আসলাম ছিলো পুলিশের একজন এসআই, নিজের অবিশ্বস্ত বৌকে পুলিশ সোর্স দিয়ে হত্যা করিয়ে ফেঁসে যায় সিসিক্যামেরার ফুটেজের কারণে। তদন্তে বেরিয়ে আসে সব কিছু। কিন্তু পুলিশে তার অতীত কর্মকাণ্ডের অবদানের পাশাপাশি, পুলিশ বাহিনীর সুনাম অক্ষুণ্ণ রাখতে ব্যাপারটা ধামাচাপা দেয়া হয় উচ্চপর্যায় থেকে। তারা চায়নি, জনগণ জেনে যাক এই বাহিনীতে এমন লোকও রয়েছে যে নিজের স্ত্রীকে খুন করাতে পারে!
আসলাম স্ত্রী হত্যা মামলা থেকে রেহাই পেলেও চাকরিটা বাঁচাতে পারেনি। স্বয়ং ডিআইজি ডেকে নিয়ে গিয়ে বলেছিলো, তাকে বাঁচিয়ে দেয়া হবে যদি সে নিজ থেকে চাকরিতে ইস্তফা দেয়-আসলাম সেই প্রস্তাবে রাজি না হয়ে পারেনি। এরপরই এক ঘনিষ্ঠ লোকের পরামর্শে তাকে গানম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয় আশেক মাহমুদ। আজ প্রায় চার বছর ধরে আছে সে। দিন দিন বিশ্বস্ততার প্রমাণ দিয়ে যাচ্ছে।
