একটু চিন্তায় পড়ে গেলো নুরে ছফা। ওখানকার নাগরিকত্ব নিয়ে নিলে মুশকানকে দেশে নিয়ে আসাটা সহজ হবে না।
“আপনি কোনো চিন্তা করবেন না,” ছফাকে আশ্বস্ত করে বললো আশেক মাহমুদ। “ওরকম কিছু হলে তাকে সবার আগে নিজের কজায় নিয়ে নিরাপদ কোথাও রেখে দেবেন, বাকি সব কিছুর ব্যবস্থা আমি করতে পারবো।”
.
অধ্যায় ৪৫
গভীর করে শ্বাস নিয়ে আশেপাশে তাকালো আসলাম। অরিয়েন্ট হাসপাতালের ইনটেনসিভ কার্ডিয়াক কেয়ার ইউনিটের সামনে যে ওয়েটিং এরিয়াটি আছে সেখানে বসে আছে সে। অন্য রোগীদের উদ্বিগ্ন আত্মীয়স্বজনও আছে বাকি চেয়ারগুলো দখল করে। কেউ কেউ পায়চারী করছে চিন্তিত মুখে। তাকে দেখলে, ঐসব আত্মীয়স্বজনদেরই একজন বলে মনে হবে। আদতে সে এসেছে চতুর আর ধূর্ত ডাক্তার আসকারকে নজরদারি করতে-আসলাম পুরোপুরি নিশ্চিত, বুড়োটা অসুস্থ হবার ভান করেছে।
এরকম কাজ পিএসের গানম্যান হিসেবে চাকরি নেবার পর আরো দুয়েক বার করেছে, সুতরাং সে জানে, কতটা বিরক্তিকর হতে পারে এটা। চূড়ান্ত ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হয়। প্রধানমন্ত্রীর পিএস আশেক মাহমুদ এমনিই তাকে নিয়োগ দেয়নি। যদিও মুরে ছফার মতো অনেকেই জানে না, সে আসলে পিএসের নিছক কোনো গানম্যান নয়। আশেক মাহমুদের এমন সব ব্যক্তিগত কাজ সে করে দেয় যেগুলো অন্য কাউকে দিয়ে করানো যায় না। গানম্যান কিংবা গানম্যান থেকে তার কাজ আরো বিস্তৃত-বহুমুখি!
নিয়ম অনুযায়ি, প্রধানমন্ত্রীর পিএস হিসেবে পুলিশ বাহিনী থেকে একজন গানম্যান পায় আশেক মাহমুদ, কিন্তু ওকে নিয়ে খুব একটা ঘুরে বেড়ায় না, কেবলমাত্র সরকারী অনুষ্ঠানেই ওই গানম্যান তার সঙ্গে থাকে, বাকি সময়ে তার সারাক্ষণ সঙ্গী হয় আসলাম।
এ মুহূর্তে তার হাতে একটি পত্রিকা, মাঝে মাঝে ওটা খুলে পড়ার ভান করছে, তবে তার নজর আসলে ইনটেনসিভ কার্ডিয়াক কেয়ার ইউনিটের দরজার দিকেই নিবদ্ধ। এর আগেও এক আত্মীয়ের হার্ট অ্যাটাক হলে এই হাসপাতালে এসেছিলো, তখন দেখেছে কিভাবে এই হাসপাতালটি চলে। এখন অপেক্ষা করছে, ডাক্তারের সত্যিকারের হালহকিকত জেনে নিতে।
আসলাম জানে, তাকে আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। এই ইউনিটে এখন পর্যন্ত পাঁচজন রোগীর নাম সে মুখস্ত করেছে। সিকিউরিটি অফিসার-কাম-রিসেপশনিস্ট বসে আছে সে মাঝেমধ্যেই রোগীর নাম ধরে তার আত্মীস্বজনদের খোঁজ করছে। একজন রোগীর নাম উচ্চারণ করে আর ওয়েটিং এরিয়ায় বসে থাকা উদ্বিগ্ন আত্মীয়ের দল ছুটে যায় তার কাছে। সে তখন জানায় তাদের মধ্যে একজন ভেতরে ঢুকতে পারে রোগীকে দেখার জন্য। রোগী নিজেই নাকি বলেছে অমুকের সাথে দেখা করতে চাইছে।
আবার অনেক সময় রোগীর আত্মীয়েরা হন্যে হয়ে খোঁজ নেয় রিসেপশনিস্টের কাছে তাদের রোগীর অবস্থা জানতে। তখন ঐ লোক ইন্টারকমের মাধ্যমে ভেতরের ডাক্তারের সাথে কথা বলে একজন-দুজনকে অনুমতি দেয় দেখা করার জন্য।
শিকারির মতো ধৈর্য নিয়ে আসলাম এখন বসে আছে ওয়েটিং এরিয়ায়। ক্ষিদেয় তার পেট চৌ চৌ করলেও সেটা দমিয়ে রেখেছে। সব কিছু দেখে তার মনে হচ্ছে, একটু পরই আইসিসিইউতে ঢোকার সুযোগ পেয়ে যাবে।
যেহেতু ডাক্তারের কোনো আত্মীয়স্বজন এখনও আসেনি, ইচ্ছে করলে সে আত্মীয় সেজে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু সে জানে, এটা করা যেমন ঝুঁকিপূর্ণ তেমনি বিরাট বড় বোকমি হবে। এই হাসপাতালটি ডাক্তারের নিজের, তার আত্মীয় পরিচয় দিয়ে এখানে ঢোকা সম্ভব নয়। এখানকার অনেকেই লোকটার নিকটাত্মীয়দের চেনে। তাছাড়া, অন্য রোগীর তুলনায় তার বেলায় বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা হবে। বুড়োটা যদি ভান করে থাকে, তাহলে সতর্কতার মাত্রা হবে আরো বেশি। আসলাম তাই অন্যভাবে কাজটা করবে।
একটা হাই তুলে পত্রিকাটা চোখের সামনে মেলে ধরলো আবার। কিছুক্ষণ পরই শুনতে পেলো রিসেপশন থেকে বলা হচ্ছে :
“আবিদুর রহমানের লোক আছে এখানে?”
ওয়েটিং এরিয়ার দিকে তাকালো আসলাম, কেউ সাড়া দিচ্ছে না। সম্ভবত এই রোগীর আত্মীয়স্বজন নীচে গেছে চা-সিগারেট খেতে। চট করে উঠে দাঁড়ালো সে, এগিয়ে গেলো রিসেপশনের দিকে।
“কি হয়েছে, বলুন?” উদ্বিগ্ন আত্মীয় হিসেবে জানতে চাইলো সে।
“আপনার সাথে ডাক্তারসাহেব কথা বলবেন…ভেতরে যান,” বললো রিসেপশনের লোকটা।
আসলাম আর কোনো কথা না বলে এগিয়ে গেলো দরজার দিকে। ভেতরে ঢোকার পর একজন পুরুষ নার্স তাকে গাউন আর হেডক্যাপ পরতে বললো। দরজার পাশে থাকা র্যাক থেকে গাউন আর হেড-ক্যাপটা নিয়ে পরে ফেললো সে। এরপর নার্স ইশারা করলো বিশাল বড় রুমটায় ঢোকার জন্য।
আইসিসিইউ’র বিশাল রুমের দরজাটা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলো আসলাম। দু-পাশে সারি সারি বেড, প্রত্যেকটাই কার্টেন দিয়ে আড়াল করা। প্রত্যেক বেডের পাশেই অনেকগুলো যন্ত্রপাতি আর মনিটর আছে। রোগীদের বেশির ভাগ অক্সিজেন মাস্ক পরা। এক দু-জন বাদে সবাই নিথর হয়ে পড়ে আছে। ঘরের শেষ মাথায় কম্পিউটার আর কিছু মেশিনসংবলিত বিশাল একটি ডেস্কের ওপাশে অ্যাপ্রোন পরা এক ডাক্তার বসে আছে। বেশ কয়েকজন নারী-পুরুষ নার্স থাকলেও তারা বলতে গেলে নিঃশব্দেই চলাফেরা করছে এক বেড় থেকে আরেক বেডের দিকে।
