লোকটা ভয়ার্ত চোখেমুখে এ প্রশ্ন করলে আসলাম রেগেমেগে তার কলার ধরে বসেছিলো, অবশ্য ছফা তাকে বিরত রাখে। তার নিজেরও মেজাজ খারাপ হয়ে গেছিলো দারোয়ানের এমন কথা শুনে। তারপরও রাগ সামলে ঠাণ্ডা মাথায় বলেছিলো, এসব উল্টাপাল্টা কথা যেনো সে না বলে। তার স্যারের তেমন কিছু হয়নি। বৃদ্ধ মানুষ, একটু জিজ্ঞাসাবাদের কারণে ঘাবড়ে গেছেন। সম্ভবত তার প্রেসার বেড়ে গেছে, তাই বুকে একটু ব্যথা হচ্ছে। তার নিজের হাসপাতালে ফোন করা হয়েছে, কিছুক্ষনের মধ্যেই অ্যাম্বুলেন্স চলে আসবে।
কিন্তু সেই অ্যাম্বুলেন্স এখনও আসেনি। ছফার চিন্তা এখন একটাই-ডাক্তারের না আবার খারাপ কিছু হয়ে যায়!
মাথা থেকে চিন্তাটা ঝেড়ে ফেলার জন্য গাড়ির জানালার কাঁচ নামিয়ে দিলো সে। ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা আসলাম তাকালো তার দিকে। “স্মোক করবো,” আস্তে করে বললো ছফা। পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটার বের করে একটাতে আগুন ধরালো। সিগারেটে যখন দ্বিতীয় টানটা দেবে তখনই দেখতে পেলো অরিয়েন্ট হাসপাতালের লোগো আর নাম লেখা একটি অ্যাম্বুলেন্স এসে হাজির ডাক্তারের বাড়ির সামনে। তড়িঘড়ি দারোয়ান ভেতর থেকে গেটটা খুলে দিলো, অ্যাম্বুলেন্সটা বাড়িতে ঢুকতেই বন্ধ করে দিলো আবার।
“সব ভুগিচুগি,” আসলাম বিরক্ত হয়ে কথাটা বললো।
তার দিকে তাকালো ছফা। বিরক্তভরা দৃষ্টি নিয়ে ডাক্তারের বাড়ির দিকে তাকিয়ে আছে পিএসের গানম্যান।
“অ্যাক্টিং করেছে,” দৃঢ়ভাবে বললো সে। “আমি একদম শিওর।”
দীর্ঘশ্বাস ফেললো ছফা, তবে কিছুই বললো না। ডাক্তার যদি অভিনয় করে থাকেন তাহলে বলতেই হবে, তিনি বেশ পাকা অভিনেতা। কিন্তু ভদ্রলোকের ঘর্মাক্ত কপাল, যন্ত্রণাকাতর চোখমুখ-এসব দেখে অভিনয় বলে মনে হয়নি তার কাছে। এমন সময় তার ফোনটা বেজে উঠলো। পকেট থেকে সেটা বের করে দেখলো পিএস আশেক মাহমুদ কল দিয়েছে। সন্দেহ নেই, তার মতোই ক্ষমতাধর এই মানুষটিও চিন্তিত।
“স্যার?”
“এনি আপডেট?” ওপাশ থেকে জানতে চাইলো আশেক মাহমুদ, তার কণ্ঠেও উদ্বিগ্নতা।
“অ্যাম্বুলেন্স এসেছে,” ছফা বললো। “এখন বাড়ির ভেতরে ঢুকেছে…ডাক্তারকে হাসপাতালে নিয়ে যাবে।”
“আপনারা কোথায়?”
“ডাক্তারের বাড়ি থেকে সামান্য দূরে আছি, স্যার।”
কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে পিএস বললো, “মরেটরে যাবে না তো?”
“বুঝতে পারছি না।”
“আচ্ছা, ঐ দারোয়ান ছাড়া আর কে দেখেছে আপনারা বাড়িতে ঢুকেছেন?”
জবাবটা দেবার আগে একটু সময় নিলো ছফা। পিএস কি উইটনেস এলিমিনেট করার কথা ভাবছে?! চিন্তাটা আবারো ভড়কে দিলো তাকে।
“আর কেউ না, স্যার,” বললো সে। “কিন্তু ঐ দারোয়ান সম্ভবত অ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গে হাসপাতালে যাবে।” ছফার আশঙ্কা, পিএস হয়তো তার গানম্যানকে নির্দেশ দেবে, একমাত্র সক্ষি দারোয়ানকে সরিয়ে দিতে, কিন্তু সেটার জন্যেও যে একটু দেরি হয়ে গেছে, তাই যেনো বলতে চাইলো।
কয়েক মুহূর্ত চুপ মেরে রইলো পিএস। “আরেকটু পর আমি আবার কল দেবো আপডেট জানতে। দেখা যাক কী হয়।”
“ঠিক আছে, স্যার।”
ফোনটা পকেটে রেখে আনমনা হয়ে গেলো ছফা। ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা আসলামের দিকে চকিতে তাকালো। গানম্যানের দৃষ্টি এখনও গেটের দিকেই নিবদ্ধ। সামনের দিকে তাকালো সে। দারোয়ান নির্ঘাত এরইমধ্যে তাদের কথা অ্যাম্বুলেন্সে করে আসা লোকজনকে বলে দিয়েছে। তাছাড়া, ডাক্তার যদি মারা যাবার আগে হাসপাতাল পর্যন্ত যেতে পারেন, তাহলেও তাদের কথা জানিয়ে দিতে পারবেন নিজেই। সব দিক থেকে ভালো হয়, ডাক্তার যদি এ যাত্রায় টিকে যান। নুরে ছফা মনে মনে সেই কামনাই করলো।
“মরবে না,” আস্তে করে বললো আসলাম, যেনো ছফার আশঙ্কাটা টের পেয়ে গেছে সে। “চিন্তার কিছু নেই।”
গানম্যানের দিকে তাকালো। তার দৃষ্টি এখনও সামনের দিকেই নিবদ্ধ। এই লোকটা কি তার মনের কথা পড়তে পেরেছে? নাকি তার উদ্বিগ্নতা আঁচ করতে পেরেছে?
“হুম।” সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে মাথা নেড়ে সায় দিলো সে। ডাক্তার যেনো এ যাত্রায় বেঁচে যান!
কিছুক্ষণ পরই ডাক্তারের বাড়ির মেইন গেটটা খুলে গেলো আবার। অ্যাম্বুলেন্সটা বাড়ির ভেতর থেকে বের হয়ে একটু সময়ের জন্য থামলো। এই ফাঁকে মেইনগেট বন্ধ করে তালা মেরে অ্যাম্বুলেন্সের সামনের সিটে উঠে বসলো দারোয়ান। কোনো রকম সাইরেন না বাজিয়ে, অনেকটা চুপিসারে চলে গেলো গাড়িটা।
ওটা ফলো করো-এরকম কোনো আদেশ দিতে হলো না ছফাকে, গাড়ি স্টার্ট দিয়ে অ্যাম্বুলেন্সটাকে অনুসরণ করতে শুরু করে দিলো আসলাম।
কিন্তু ছফাকে হতাশ করে দিয়ে সংক্ষিপ্ত এই অনুসরণ পর্বটি শেষ হলো অরিয়েন্ট হাসপাতালে গিয়েই। দূর থেকে তারা দেখতে পেলো অ্যাম্বুলেন্সটি ঢুকে পড়ছে হাসপাতালের ভেতরে।
“ওখান দিয়ে তো লাশ বের করে,” আসলাম বললো সন্দেহের সুরে। “আমি এই হাসপাতালে এর আগেও এসেছি…ওটা এমার্জেন্সি এন্ট্রান্স না।”
তার দিকে তাকালো নুরে ছফা। “লাশ বের করে ওখান দিয়ে?” কথাটা বলার সময় তার কাছে মনে হলো ডাক্তার বুঝি মারাই গেছেন।
“গত বছর আমার এক খালাতো ভাই হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছিলো এই হাসপাতালে, ওর লাশটা ওখান দিয়েই বের করেছিলো।”
ছফা কিছুই বললো না।
