রাশেদের মা অঞ্জলি জানতো এটা। মাস্টারের সাথে তার ছিলো বেশ ভালো সম্পর্ক। অঞ্জলিই ছেলেকে গল্পটা বলেছিলো-এক সময় সুন্দরপুরে ছিলো রবীন্দ্রনাথের নামে সমৃদ্ধ একটি লাইব্রেরি, আর সেটা দিয়েছিলেন ত্রিলোকনাথ বসু। পয়ষট্টির দাঙ্গায় লাইব্রেরিটা কিভাবে পুড়ে যায়, আর বইগুলো কিভাবে মাস্টার রমাকান্তকামার রক্ষা করেছিলেন, এই গল্পটাও করেছিলো সে। রাশেদ সব শুনে আগ্রহী হয়ে ওঠে, মাস্টারের বাড়িতে হানা দেয়। বইয়ের সংগ্রহ দেখে ছেলেটার ভুরু কপালে উঠে গেছিলো। বহু দুষ্প্রাপ্য বই তাকে আকর্ষিত করেছিলো পতঙ্গের মতোই। বইয়ের টানে মাস্টারের বাড়িতে পড়ে থাকার সময়ই ঘটে সেই মর্মান্তিক ঘটনাটি। সুন্দরপুরে হানা দেয় পাক-হানাদাররা, আর তাদেরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছিলো সেই জঘন্য লোকটি-আসাদুল্লাহর বাপ, মুসলিম লীগার হামিদুল্লাহ্। নয়টা মাস সে কখনও যমের দোসর ছিলো তো কখনও নিজেই যম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কতো মানুষ হত্যা করেছে, কতো লুণ্ঠন আর ধর্ষণের সাথে জড়িত ছিলো কে জানে। তার নয় মাসের পশুরাজত্ব শেষ হয় পনেরোই ডিসেম্বর-স্বাধীনতা পাবার ঠিক এক দিন আগে।
একাত্তরের মোলোই ডিসেম্বরের আগের দিন সুন্দরপুর যখন মুক্তিবাহিনীর ছেলেরা মুক্ত করে ফেললো তখন হামিদুল্লাহ্ পালিয়ে যাবার চেষ্টা করে তার লুণ্ঠিত ধনসম্পদের কিছু অংশ নিয়ে, কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা তাকে ধরে ফেলে। নিয়তির নির্মম পরিহাস, যে বাড়িতে মিলিটারি ক্যাম্প করে মানুষজন হত্যা করতো, নির্যাতন করতো সেই জমিদার বাড়িতে নিয়ে গিয়েই তাকে গুলি করে হত্যা করে মুক্তিযোদ্ধারা। অনেক বছর পর সেই আল-বদর নেতার ছেলে যখন এলাকার এমপি হয়ে গেলো তখন মাস্টারকে একদিন ডেকে নিয়ে গেছিলো একটা কথা জানার জন্য-মুক্তিযোদ্ধাদের সেই দলে রাশেদ জুবেরি ছিলো কিনা!
রমাকান্তকামার জানতেন, এতোদিন পর এই লোক এটা কেন জানতে চায়-জমিদারের সম্পত্তিগুলো জবর দখল করার জন্য যুৎসই একটি বাহানা খুঁজছে বাপের যোগ্য ছেলে!
মাস্টার তাকে বলেছিলেন, ঐদিন রাশেদকে দেখেননি তিনি। তখন সে সুন্দরপুরে এসেছিলো কিনা তা-ও তার জানা নেই। তার সাথে জুবেরির দেখা হয়েছিলো সতেরোই ডিসেম্বর সকালে। সমগ্র জীবনে সজ্ঞানে মাত্র তিনটি মিথ্যা বলেছিলেন তিনি দ্বিতীয় মিথ্যাটি বলার সময় তার মধ্যে কোনো অনুশোচনা বা অপরাধবোধ তৈরি হয়নি। যুধিষ্ঠিরকেও তো মিথ্যে বলতে হয়েছিলো সত্য প্রতিষ্ঠা করার জন্য! নিজেকে এভাবেই বুঝ দিয়েছিলেন মাস্টার।
তবে এটাও ঠিক, তিনি নিশ্চিত করে বলতে পারবেন না আসলেই ঐদিন মুক্তিযোদ্ধাদের যে দলটি হামিদুল্লাহকে হত্যা করেছিলো সেই দলে রাশেদ ছিলো কিনা। যুদ্ধফেরত ছেলেটার সঙ্গে তার দেখা হয় হামিদুল্লাহর মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা পর। নরম স্বভাবের রাশেদ জুবেরির চোখমুখ দেখে মাস্টার শুধু কিছু একটা আঁচ করতে পেরেছিলেন।
স্বাধীনতার পর, মাঝেমধ্যে কিছু দিনের জন্য সুন্দরপুরে এসে মাস্টারের বাসায় উঠতো রাশেদ, নানার বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যেও যেতো না। সম্ভবত ওখানে বাবা-মাসহ পরিবারের সবাইকে হত্যা করা হয়েছিলো বলে পারিবারিক বধ্যভূমিটা এড়িয়ে চলতো সে। তো, এরকমই একদিন রাশেদ জুবেরি মাস্টারের বাড়িতে বেড়াতে এসে এ কথা ওকথা বলার এক পর্যায়ে বলেছিলো, যুদ্ধের আগে একটা মুরগি কাটতে দেখলেও তার বুক কেঁপে উঠতো, মায়া হতো, এমনকি যুদ্ধের সময় হানাদার পাকবাহিনী মারতেও তার মধ্যে কিছুটা অস্বস্তি কাজ করতো, কিন্তু খুন হবার আগে হামিদুল্লাহর করুণ চেহারাটা দেখলে নাকি তার একটুও মায়াদয়া হতো না!
নাকি হয়নি?!
মাথা থেকে আবারো পুরনো স্মৃতিগুলো বিদায় করে হাই তুললেন মাস্টার। বর্তমান সমস্যাটা নিয়ে আবার ভাবতে লাগলেন। ট্রাস্টের সদস্য ডাক্তার আসকার কোথায় আছে সেটা নাকি ময়েজ উদ্দিন বলে দিতে বাধ্য হয়েছে। ভদ্রলোকের সাথে ছফা কী করে কে জানে! তাকে আগেভাগে বলে দিলেই পারতেন! কিন্তু জীবনে প্রথম তিনি স্বার্থপরের মতো হাতপা গুটিয়ে রেখেছেন। আর এটা মোটেও নিজের ভাবমূর্তি রক্ষা করার জন্য নয়-তার স্বপ্নের গায়ে যাতে আঁচড় না লাগে সেজন্যে।
.
অধ্যায় ৪৩
ডাক্তার আসকার ইবনে সায়িদের বাড়ি থেকে দশ-পনেরো গজ দূরে, ছায়াঘন এক জায়গায়, ইনসাইড লাইট বন্ধ করে গাড়ির ভেতরে বসে আছে নুরে ছফা আর আসলাম। গাঢ় হয়ে উঠেছে সন্ধ্যা, জ্বলে উঠেছে রাস্তার বাতিগুলো।
একটু আগে ডাক্তারের বাড়ি থেকে বের হয়ে আসার পর তাদের মধ্যে আর কোনো কথা হয়নি। এখনও কোনো কথা হচ্ছে না। দু-জনেরই দৃষ্টি ডাক্তারের সুনশান বাড়িটার দিকে। ওখান থেকে বের হবার আগে দারোয়ানকে অবশ্য ডাক্তারের অসুস্থতার কথা বলে এসেছে। আরো বলেছে, কিছুক্ষণ পরই অ্যাম্বুলেন্স চলে আসবে, চিন্তার কিছু নেই, সে যেনো ডাক্তারের সাথে থাকে।
এ কথা শুনে দারোয়ান যা বলেছে সেটা নিয়ে নুরে ছফা এখন চিন্তিত। লোকটা তাদের দিকে এমনভাবে তাকিয়েছিলো যেনো, দু-দুজন দস্যু জোর করে বাড়িতে ঢুকে ডাক্তারকে হত্যা করার জন্য পয়জন ইনজেকশান দিয়ে চলে যাচ্ছে!
“হায় আল্লাহ! স্যারে আপনেরা কী করছেন?”
