সারা দিন স্কুলে সময় দিয়ে বিকেলের দিকে চলে যান রবীন্দ্রনাথে, সেখান থেকে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যায়-আজও তার ব্যতিক্রম করেননি, কিন্তু অন্যসব দিনের মতো ঘরে বসে বই পড়ে কিংবা স্কুলের কাগজপত্র নিয়ে না বসে একমনে ভেবে যাচ্ছেন। একটু আগে ট্রাস্টের উকিল ময়েজ উদ্দিন খোন্দকার তাকে ফোন করেছিলো। ভদ্রলোক অনেকটা ক্ষোভের সাথেই জানতে চেয়েছেন, চিরকুটের বিষয়টা নুরে ছফা নামের ডিবি অফিসারকে তিনি কেন বলতে গেলেন! ভদ্রলোককে নাকি পিস্তল দেখিয়ে বাধ্য করেছে স্বীকার করতে, চিরকুটটা ডাক্তার আসকার তাকে দিয়েছিলেন। উকিলের কাছ থেকে সব শুনে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন রমাকান্তকামার।
এ জীবনে কখনও সজ্ঞানে আইন ভঙ্গ করেননি তিনি, অপরাধীর সাথে যোগাযোগ রাখার তো প্রশ্নই ওঠে না। সমাজের হীন আর কুটিল লোকজনকে ঘেন্না না করে বরং সব সময়ই এড়িয়ে চলেন-এটাই তার নীতি। ঐ ছফাকেও এড়িয়ে যেতেন, কিন্তু সে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার লোক, তাকে সাহায্য করা নৈতিক কর্তব্যই নয়, আইনত বাধ্যও তিনি। তাই চিরকুটের ব্যাপারে সত্যিটা বলেছিলেন। বেনামি একটি চিরকুট পাঠিয়ে শুধু নির্দোষ একটি অনুরোধ করেছিলো মহিলা-অদ্ভুত নামের রেস্টুরেন্টটির জায়গায় একটি গ্রন্থাগার করা। রাশেদের স্ত্রী এমন অনুরোধ না করলেও সুন্দরপুরে রবীন্দ্রনাথের নামে একটি লাইব্রেরি করতেন মাস্টার-আর সেটা হতো বহুকাল আগের বিস্মৃত আর ধ্বংস হওয়া একটি প্রতিষ্ঠানকে পুণরুজ্জীবিত করার শামিল।
তিন বছরেরও বেশি আগে, রাশেদ জুবেরির স্ত্রী সুন্দরপুর ছাড়ার আগে তাকে ডেকে পাঠিয়েছিলো। সত্যি বলতে, এখানে আসার পর থেকে বার কয়েকই চেষ্টা করেছিলো ভদ্রমহিলা তার সঙ্গে কথা বলার জন্য, কিন্তু মাস্টার এড়িয়ে গেছেন। মহিলা যে রাশেদের স্ত্রী সেটা নিয়ে তার মনে ছিলো সন্দেহ। তবে সমস্ত সন্দেহ, সংশয় আর দূরত্ব ঘুচিয়ে অবশেষে দেখা করেছিলেন। তাদের মধ্যে যে কথা হয়েছে সেটা তিনি ছাড়া অন্য কেউ জানে না। মহিলা তাকে বলেছিলো, সুন্দরপুরের আগের এমপি আসাদুল্লাহর কারণেই এই ট্রাস্টের কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেনি। যদি সে ট্রাস্টের ঘোষণা দিতো, এমপি নির্ঘাত মাস্টারের ক্ষতি করতো। আর সেটা যে কী, বললেও চলে। তাই আসাদুল্লাহর লোলুপ দৃষ্টি থেকে জমিগুলো আগলে রাখার চেষ্টাই করে গেছে এতো দিন। মাস্টারের কাছেও মনে হয়েছে, কথাটার মধ্যে সত্যতা রয়েছে। আসাদুল্লাহর রূপ তো তিনি কম দেখেননি।
ক্ষয়িষ্ণু চাঁদটার দিকে তাকালেন রমাকান্তকামার। তিনি এখনও বিশ্বাস করেন গাছের সাথে মানুষের পার্থক্য আছে। আম গাছে জাম হবে না, আমই হবে। কিন্তু মানুষের বেলায় এটা খাটে না। চোরের ছেলে চোর হবে এমন কোনো কথা নেই। আবার সাধুর ছেলে যে চোর হবে না তা-ও জোর দিয়ে বলা যায় না। তারপরও বাস্তবতা হলো, অনেক সময়ই দেখা যায় চোরের ছেলে চোরই হয়! এ হলো সঙ্গদোষের ব্যাপার। পরিবেশ আর সময় তাকে প্রভাবিত করে। জন্মের পর মানবশিশু সাদা কাগজের মতোই নিষ্কলঙ্ক থাকে, কিন্তু তাতে দাগ ফেলে তার অভিভাবক, পরিবার, পরিবেশ আর সময়। এসব যদি শিশুর অনুকূলে না থাকে, সে শিশু মানুষ হবে কিভাবে? কয়জন পারে নিজের চারিত্রিক দৃঢ়তা আর বুদ্ধিমত্তা দিয়ে প্রতিকূল পরিবেশ আর সময়কে জয় করতে?
সুন্দরপুরের মুসলিম লীগের পাণ্ডা হামিদুল্লাহর ছেলে আসাদুল্লাহ কি তার বাপের মতো হয়নি?
হামিদুল্লাহ ছিলো আগাগোড়া সাম্প্রদায়িক একজন মানুষ। সুন্দরপুরসহ আশেপাশের এলাকার সংখ্যালঘু হিন্দু জনগোষ্ঠী ছিলো তার দুচক্ষের বিষ জমিদার থেকে মুচি; ব্রাহ্মণ থেকে নমশূদ্র, এমনকি ব্রাহ্মরা পর্যন্ত। তার কাছে তাদের সবার পরিচয় ছিলো একটাই-মালাউনের বাচ্চা! ইন্ডিয়ার দালাল! ব্রাহ্মরা যে হিন্দু না এটা বোঝার মতো কাণ্ডজ্ঞান থাকলেও রাজনৈতিক আর জাগতিক ফায়দার কথা ভেবে চেপে যেতো। এই ঘেন্নার রাজনীতি তাকে শেষ পর্যন্ত অমানুষে পরিণত করে। একাত্তরের দীর্ঘ নয় মাস সুন্দরপুরের সবাই সেই অমানুষটাকে দাপিয়ে বেড়াতে দেখেছে।
কী একটা সময়ই না ছিলো!
নিজের অজান্তেই, কখন যে স্মৃতিভারাক্রান্ত হয়ে পড়েছেন টেরই পেলেন না রমাকান্তকামার। বয়স বাড়ার সাথে সাথে তিনি বড় বেশি স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েছেন। এই নিঃসঙ্গ জীবনে শত ব্যস্ততার মধ্যেও আগের চেয়ে অনেক বেশি পুরনো স্মৃতি তাকে কাতর করে তোলে। এই যেমন এখন, একাত্তরের নানান ঘটনা তার মানসপটে ভেসে উঠতে শুরু করেছে।
রাশেদ জুবেরির মায়াভরা মুখটা ভেসে উঠলো মনের পর্দায়। কী সহজ সরল আর ভালো মানুষই না ছিলো! এতো সম্পত্তির মালিক হওয়া সত্ত্বেও জাগতিক বিষয়ে এক ধরণের বৈরাগ্য ছিলো তার মধ্যে। সম্ভবত এক লহমায় বাবা-মা, নানাসহ পরিবারের সবাইকে হারানোর কারণে তার এই বৈরাগ্যভাবের জন্ম। সেদিন যমের তালিকায় সে-ও ছিলো, কিন্তু রমাকান্তকামারের বাসায় থাকার দরুন বেঁচে যায়। বইয়ের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণই তাকে টেনে এনেছিলো এই বাড়িতে। সুন্দরপুরে সপরিবারে বেড়াতে এসে হাপিয়ে উঠেছিলো সে। একটাও লাইব্রেরি নেই, এ কেমন মফশ্বল! কিন্তু সে তখনও জানতো না, এক সময় এই সুন্দরপুরে ছিলো রবীন্দ্রনাথের নামে সমৃদ্ধ একটি গ্রন্থাগার, ঘেন্নার রাজনীতিতে সেই রবীন্দ্রনাথ পুড়ে খাক হয়ে গেছিলো। তবে রবীন্দ্রনাথের অমূল্য সম্পদের বিরাট একটি অংশ রক্ষা করতে পেরেছিলেন মাস্টার। পয়ষট্টি থেকে গত বছর রবীন্দ্রনাথের নামে লাইব্রেরিটি পুণরায় দেবার আগ পর্যন্ত সযত্নে নিজের বাড়িতে আগলে রেখেছেন বইগুলো। একটা বইও পোকায় খেতে পারেনি, অনাদরে নষ্ট হয়নি। সন্তানের স্নেহে সেগুলো আগলে রেখেছেন দীর্ঘ পঞ্চাশটি বছর।
