খুব কষ্টে মাথা নেড়ে সায় দিলেন ভদ্রলোক। “আ-আমাকে…” কথা জড়িয়ে যাচ্ছে তার, “…হাসপাতালে নিয়ে যান…”-প্লিজ!”
কয়েক মুহূর্তের জন্য ছফা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারলো না, এমন পরিস্থিতির জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলো না সে।
যন্ত্রণাকাতর অবস্থায়ই আঙুল তুলে সোফার এক পাশে ল্যান্ডফোনটার দিকে ইশারা করলেন তিনি। “৯-১১…”
ছফা উঠে গিয়ে ফোনের রিসিভার তুলে নিলো।
“…৪-৬-৭-৮-৪-২…আমার হাসপাতালে…ওদেরকে বলুন আমার কথা…এ-একটা অ্যাম্বুলেন্স…” ডাক্তারের শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হয়ে পড়লো। “এ-এক্ষুণি…” কথা জড়িয়ে এলো তার।
উদ্বিগ্ন হয়ে অরিয়েন্ট হাসপাতালে ফোন করে ডাক্তার আসকারের বাসায় দ্রুত একটা অ্যাম্বুলেন্স পাঠানোর অনুরোধ করলো সে। রিসিভারটা ক্র্যাডলের উপর রেখে চেয়ে রইলো যন্ত্রণাকাতর ডাক্তারের দিকে। আসলাম মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে, কোনো রকম করুণা কিংবা সহানুভূতি দেখা যাচ্ছে না তার অভিব্যক্তিতে। বরং ডাক্তারের আচমকা শরীর খারাপ হওয়ায় যারপরনাই বিরক্ত সে।
নুরে ছফার আশঙ্কা, বৃদ্ধ এই চিকিৎসক হয়তো হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকিতে আছেন। ডাক্তারের কাছ থেকে মুশকান জুবেরির অবস্থানের ব্যাপারে মূল্যবান তথ্য জানা দরকার, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সেটা সম্ভব নয়। এরকম অবস্থায় ভদ্রলোককে চাপ দিয়ে কিছু আদায় করাটা বিপজ্জনক। তার নাজুক হৃদপিণ্ড হয়তো সহ্য করতে পারবে না। মরেটরেও যেতে পারেন!
তার চেয়েও বড় দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, ডাক্তার যদি এ যাত্রায় বেঁচেও যান, তাহলে বলে দেবেন, ছফা আর আসলাম তার বাড়িতে বেআইনীভাবে ঢুকে পিস্তল দিয়ে ভয় দেখিয়েছিলো তাকে, বিনা ওয়ারেন্টে সার্চ করেছে তার ঘর।
ডাক্তার মরে গেলে ছফা আরো বেশি বিপদে পড়ে যাবে। এ বাড়ির দারোয়ান ছেলেটা তাদেরকে দেখেছে। পুলিশকে সে জানাবে তাদের কথা।
প্রধানমন্ত্রীর পিএস হয়তো সব কিছু সামলাতে পারবে, কিন্তু সেই পদ্ধতিটা যে কী হতে পারে, ভেবে গা শিউরে উঠলা-নিরপরাধ মানুষ হত্যা?
কক্ষনোই না!
মাথা থেকে এসব চিন্তা ঝেড়ে ফেলে ডাক্তারের কাছে জানতে চাইলো ছফা, “আপনার এখন কেমন লাগছে?”
মাথা দোলালেন আসকার ইবনে সায়িদ, যন্ত্রণাকাতর কণ্ঠে বললেন, “বুকে ব্যথা হচ্ছে…খু-উ-উ-ব!”
সর্বনাশ! যা ভেবেছিলো তা-ই। লোকটা হার্ট অ্যাটাকের শিকার! কিংবা কে জানে, এরইমধ্যে হয়ে গেছে কিনা!
সোফা থেকে উঠে একটু দূরে গিয়ে পকেট থেকে দ্রুত ফোনটা বের করে পিএসের নাম্বারে কল দিলো সে।
“হ্যালো, স্যার?” নীচুস্বরে বললো।
“কী হয়েছে?” ওপাশ থেকে জানতে চাইলো পিএস।
ছফা তাকে জানালো, ডাক্তার আসকারকে জেরা করতে গেলে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। সম্ভাব্য হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছেন বলেই মনে হচ্ছে।
এ কথা শুনে প্রধানমন্ত্রীর পিএস শান্তকণ্ঠে বললো, “অ্যাম্বুলেন্স আসার আগেই আপনি আসলামকে নিয়ে ওখান থেকে চলে যান। এ মুহূর্তে ওখানে থাকার কোনো দরকার নেই আপনাদের।”
“কিন্তু এরকম অবস্থায় ডাক্তারকে একা রেখে যাওয়াটা কি ঠিক হবে, স্যার?” নুরে ছফা দ্বিধাভরা কণ্ঠে জানতে চাইলো।
এ প্রশ্নের জবাবেও একই কথা বললো প্রধানমন্ত্রীর পিএস আর সেটা আগের চেয়েও জোর দিয়ে, “আপনারা এক্ষুণি ঐ বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। অ্যাম্বুলেন্স চলে আসার আগেই।
“কিন্তু অ্যাম্বুলেন্স চলে আসার আগেই যদি ডাক্তারের কিছু হয়ে যায়?” ছফা আতঙ্কের সাথে বললো।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো আশেক মাহমুদ। “সেটা নিয়ে পরে ভাবা যাবে। এখন সময় নষ্ট না করে ওখান থেকে চলে আসুন।”
“ঠিক আছে, স্যার।” নুরে ছফা মোবাইলফোনটা পকেটে রেখে কয়েক মুহূর্ত ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো। দ্রুত কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হবে তাকে। আসকার ইবনে সায়িদের কাছে এসে জানতে চাইলে সে, “এখন কী অবস্থা, আপনার?”
“বুকে ব্যথা হচ্ছে!” ডাক্তার তীব্র যন্ত্রণার মধ্যে শুধু এটুকুই বলতে পারলেন, তার চোখমুখ কুঁচকে আছে।
“অ্যাম্বুলেন্স এসে পড়বে এক্ষুণি,” কথাটা বলে আসলামকে নিয়ে ঘরের এক কোণে চলে গেলো সে, নীচুকণ্ঠে বললো, “এই পাসপোটার সবগুলো পেইজের ছবি তুলে নাও…আমাদেরকে এক্ষুণি এখান থেকে চলে যেতে হবে।”
পাসপোর্টটা হাতে নিয়ে পকেট থেকে মোবাইলফোন বের করে ঝটপট ছবি তুলতে শুরু করে দিলো আসলাম। “বুড়া অ্যাক্টিং করছে…” ছবি তুলতে তুলতেই নীচু কণ্ঠে বললো সে।
ছফা কিছু বললো না। তার কাছে মনে হচ্ছে না ডাক্তার অভিনয় করছেন। লক্ষণ বলছে, হার্ট অ্যাটাকের শিকার হয়েছেন ভদ্রলোক।
*
প্রায় পাঁচ মিনিট পর অসুস্থ ডাক্তার চোখ খুলে তাকালেন। তার ঘরে এখন কেউ নেই। একটু আগে দু-জন মানুষ কোনো কিছু না বলে তাকে একা রেখে চলে গেছে। সামনের টেবিলের উপর তার বৃটিশ আর বাংলাদেশি পাসপোর্ট দুটো পড়ে আছে। নিজের শারীরিক অবস্থার কথা বাদ দিয়ে তিনি ভাবতে লাগলেন, এই পাসপোর্ট থেকে নুরে ছফা নামের ঐ ডিবি অফিসার কী-ই বা বের করতে পারবে?
আর যাই হোক, ওর ব্যাপারে কিছু জানার কথা নয়! অবশেষে নিজেকে সান্ত্বনা দিলেন তিনি।
.
অধ্যায় ৪২
সন্ধ্যা নেমে এসেছে। নিজ বাড়ির বারান্দায় চেয়ার পেতে বসে আছেন রমাকান্তকামার। চারপাশ ঘিরে থাকা গাছগাছালি থেকে ঝিঁঝিপোকার দল একচ্ছত্র সুনসান পরিবেশকে বিরামহীন হুমকি দিয়ে যাচ্ছে যেনো। কালচে আকাশটার দিকে তাকিয়ে আছেন তিনি। সেখানে অন্ধকারের সাথে পেরে উঠছে না ক্ষয়িষ্ণু চাঁদের আলো। দৃশ্যটা একটু উদাস করে দিলো তাকে। তাহলে কি আবারো তার জীবনে কালোছায়া নেমে এলো?
