ডাক্তার এই পাসপোর্ট দিয়ে তিন বছর আগে যে আমেরিকায় গেছিলেন সেটার সত্যতা পাওয়া গেলো ভিসার সিল দেখে। কিন্তু নুরে ছফা অবাক হলো, খুব বেশি ভ্রমণের উল্লেখ নেই তাতে। এই পাসপোর্ট দিয়ে তিন বছরে পাঁচ বার বিদেশ যাবার নজির আছে। দু-বার আমেরিকায় আর বৃটেনে, একবার কানাডায়। শেষ বার তিনি যে আমেরিকায় গেছিলেন সেই সময় ওখানে মাত্র এক মাস ছিলেন, তারপরই ফিরে আসেন দেশে।
অবাক হয়ে তাকালো সে। “আপনি আপনার ড্রাইভারকে বলেছেন, খুব যাওয়া-আসার মধ্যে থাকেন, তাই তাকে নিয়মিত রাখার দরকার নেই?”
এমন তথ্য শুনে আসকার ইবনে সায়িদ চমকে উঠলেন একটু। “আমার ড্রাইভার?!”
“হ্যাঁ। আপনার আগের ড্রাইভার,” ছফা আত্মতুষ্টির সাথে বললো। “ওর সাথে কথা হয়েছে। ও বলেছে, আপনি অনেকটা সময় বাইরে থাকেন, দেশে আসেন অল্প সময়ের জন্য তাই রাখার দরকার নেই। কিন্তু এখানে যা দেখছি তাতে তো কথাটা সত্যি বলে মনে হচ্ছে না?”
গভীর করে দম নিয়ে নিলেন ডাক্তার। “আমি আসলে ওকে ভুল বলেছিলাম।”
“কেন?”
“ওকে রাখবো না তাই।”
“কেন রাখবেন না? সমস্যা কি ছিলো?”
“আমি খুবই কম বাইরে যাই এখন,” গভীর করে দম নিয়ে নিলেন। “এতো অল্প মুভ করি যে, তার জন্যে ড্রাইভার রাখার কোনো দরকার দেখি না। তাছাড়া, চাইলে আমি হাসপাতালের গাড়ি ব্যবহার করতে পারি…নিজের জন্য আলাদা ড্রাইভার রাখার কোনো দরকার নেই।”
ছফা সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
“বুঝতেই পারছেন, সহজ অঙ্ক…সহজ হিসেব।”
এমন সময় গানম্যান আসলাম সবুজ রঙের একটি বাংলাদেশি পাসপোর্ট হাতে নিয়ে শোবার ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।
ডাক্তারের দিকে তাকালো ছফা। আসলামের দিকে পিটপিট করে তাকাচ্ছেন, উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন তিনি। তার কপালে রীতিমতো বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে।
সবুজ রঙের পাসপোর্টটা ছফার দিকে বাড়িয়ে দিলো গানম্যান। “আমার মনে হয় এই লোক তার মোবাইলফোনটা কোথাও লুকিয়ে রেখেছে, স্যার।”
ডাক্তারের দিকে তাকালো নুরে ছফা। পরাজিত সৈনিকের মতো লাগছে তাকে। হাল ছেড়ে দিয়ে চুপচাপ বসে আছেন। দৃষ্টিতে শূণ্যতা।
“ভেঙেটেঙে কমোডে ফ্ল্যাশও করে দিতে পারে,” আসলাম যোগ করলো।
দেশি পাসপোর্টটা হাতে নিয়ে ভালো করে দেখলো ছফা। “আপনার কথাই ঠিক,” পাসপোর্টের পাতাগুলো উল্টে উল্টে দেখতে লাগলো সে। “আপনি ঘন ঘন বিদেশে যান।”
কপালে সদ্য জমা বিন্দু বিন্দু ঘাম মুছে নিলেন ডাক্তার আসকার ইবনে সায়িদ। কোনো কথা বললেন না।
ভুরু কুঁচকে গেলো ছফার। পাসপোর্টের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে বললো, “ইন্ডিয়াতে গেছেন অনেক বার!”
আসকার ইবনে সায়িদ অনেক চেষ্টা করেও চোখেমুখে ভড়কে যাবার অভিব্যক্তিটা লুকাতে পারলেন না।
ডাক্তারের দিকে স্থিরচোখে তাকালো নুরে ছফা। “কলকাতায়!”
আস্তে করে শ্বাস নিয়ে নিলেন ভদ্রলোক। “ওখানে আমার অনেক আত্মীয়স্বজন থাকে।”
মাথা নেড়ে সায় দিলো নুরে ছফা। “তা থাকতেই পারে কিন্তু আপনি সেটা লুকানোর চেষ্টা করলেন কেন? আর এই পাসপোর্টটার কথাই বা চেপে গেলেন কেন?”
ডাক্তার ভড়কে গেলেন সামান্য।
“বৃটিশ পাসপোর্ট দেখিয়ে বিভ্রান্ত করলেন…এই পাসপোর্টটা, যেটা দিয়ে আপনি ঘন ঘন কলকাতায় যাতায়াত করেছেন, সেটা লুকিয়ে রাখার
চেষ্টা করলেন…কেন?”
আসকার ইবনে সায়িদ কিছুই বললেন না। সম্ভবত বলতে পারলেন না।
“আপনি কিছু না বললেও উত্তরটা আমি জানি, ডাক্তার, নুরে ছফা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে প্রবীন চিকিৎসককে বিদ্ধ করলো যেনো। “মুশকান থাকে ওখানে!”
চোখ বন্ধ করে ফেললেন ডাক্তার আসকার ইবনে সায়িদ।
“আমি নিশ্চিত!” ডাক্তারকে চুপ থাকতে দেখে আবার বললো ছফা, “ওখানে কোথায় থাকে সে? আপনাকে বলতেই হবে।” শেষ কথাটা বেশ ধমকের সাথে বললো।
ডাক্তারকে দেখে মনে হচ্ছে, ছফার ধমকে তাসের ঘরের মতোই ভেঙে পড়েছেন তিনি।
.
অধ্যায় ৪১
ডাক্তার আসকার ইবনে সায়িদ যে কোনো প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন না তাতে নুরে ছফার রাগ হবার কথা কিন্তু এ মুহূর্তে সে বরং উদ্বিগ্ন হয়ে চেয়ে আছে ভদ্রলোকের দিকে। বুঝতে পারছে না কী হচ্ছে, শুধু দেখতে পাচ্ছে প্রবীন লোকটির কপালে ঘাম ছুটছে, নিজের বুকের উপর একটা হাত রেখে মেসেজ করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন তিনি। তার চোখমুখ দেখে মনে হচ্ছে তীব্র ব্যথা হচ্ছে বুকে।
একটু আগে ছফার প্রশ্নের জবাবে ডাক্তার নিশ্চপ ছিলেন বলে আসলাম তাকে ভয় দেখানোর জন্য কোমর থেকে পিস্তল বের করেছিলো, এরপরই ভড়কে যায় ভদ্রলোক। এই কাজটা করার কোনো দরকারই ছিলো না। খুব সহজেই ছফা তার কাছ থেকে জরুরী তথ্যটা আদায় করে নিতে পারতো।
“কী হয়েছে?” বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলো সে। “বুকে ব্যথা হচ্ছে আপনার?”
আলতো করে মাথা নেড়ে সায় দিলেন আসকার ইবনে সায়িদ। তার চোখেমুখে যন্ত্রণা ছড়িয়ে পড়েছে।
মনে মনে প্রমাদ গুণলো ছফা। “ঘরে এসি আছে?” জানতে চাইলো।
মাথা নেড়ে সায় দিলেন ডাক্তার। সোফার সামনে টেবিলের উপর থাকা সাদা রঙের একটি রিমোট দেখিয়ে দিলেন ইশারায়।
“এসিটা ছাড়ো, আসলাম।”
নিজের পিস্তলটা কোমরে রেখে, রিমোটটা হাতে নিয়ে এসিটা অন করে দিলো গানম্যান।
“আপনার কি খুব বেশি খারাপ লাগছে?” ছফা ঝুঁকে এলো ডাক্তারের দিকে।
