দুই দুইটা খাসি জবাই দিয়া আকিকা কইর্যা আমার বাপে এই নাম রাখসে!…আর পোলায় কিনা সেয়ানা হইয়া এখন সেই নাম বাদ দিবার চায়! এত্ত বড় সাহস হইসে…এমুন পোলারে কাইট্টা…! নিমের ডাল দিয়ে দাঁত মাজতে মাজতে তার জাঁদরেল বাবার এইসব গালমন্দ আর রাগি চেহারাটা এখনও চোখে ভাসে।
আজাদ রহমান-নিজের পছন্দ করা নামটা এখনও তার মনে আছে।
“সম্ভবত মায়ের মৃত্যুটাকে মেনে নিতে পারেনি বলে এমনটা করেছিলো,” ছফাকে চুপ থাকতে দেখে ডাক্তার আবার বললেন। “মায়ের স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্যেও করে থাকতে পারে…কে জানে।” একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো আসকার ইবনে সায়িদের ভেতর থেকে। এভাবেই সে রুখসান থেকে হয়ে গেলো মুশকান সোহেলি। তারও অনেক বছর পরে, বিয়ের পর হলো মুশকান জুবেরি।”
“আপনি এতো সব জানলেন কিভাবে?” সন্দেহের সুরে জানতে চাইলো ছফা। “এসব কথা তো সত্য না-ও হতে পারে?”
হেসে ফেললেন ডাক্তার। “তখন তো কেউ মুশকানের পিছে লাগেনি যে, নিজেকে বাঁচানোর জন্য বানোয়াট একটা গল্প বলবে সে। তাছাড়া মুশকানের সাথে…মানে, রুখসানের মায়ের সাথে বেশ ভালো বন্ধুত্ব ছিলো আমার। বয়সেও আমরা প্রায় সমবয়সী ছিলাম। একসাথে দীর্ঘদিন কাজ করেছি আমরা। ও মারা গেলে আমিই ওর মেয়ের অভিভাবক হয়ে উঠি। যা বললাম, তার অনেক কিছুই নিজের চোখে দেখেছি আমি।”
চুপ মেরে রইলো নুরে ছফা। ডাক্তারের বয়স আর পেশা হিসেবে নিলে, রুখসানের মায়ের সাথে তার বন্ধুত্বের ব্যাপারটা খাপ খেয়ে যায়।
“আমার কী মনে হয় জানেন?” আসকার ইবনে সায়িদ বললেন। “ও ওর মায়ের ব্যাপারে ভীষণ ফ্যাসিনেটেড হয়ে পড়েছিলো…কাইন্ড অব অবসেসড।”
মাথা নেড়ে সায় দিতে গিয়েও দিলো না ছফা।
“মায়ের সাথে তার সম্পর্কটা ছিলো একেবারে অন্য রকম। বন্ধু…একমাত্র সঙ্গি…একমাত্র অভিভাবক!” আবারো দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো ডাক্তারের ভেতর থেকে। ঘরে নেমে এলো কয়েক মুহূর্তের নীরবতা।
“কিন্তু আপনি কেন আমার সিনিয়র মি. খানের কাছে এরকম উদ্ভট গল্প বললেন?” জানতে চাইলো ছফা।
গভীর করে নিশ্বাস নিলেন ডাক্তার। “এটা আগেই বলেছি…ও মনে করেছিলো আপনি সুন্দরপুরের এমপির হয়ে ওর পেছনে লেগেছেন, ঐ এমপি যেহেতু ওর রেস্টুরেন্টে মানুষের মাংস রান্না করার উদ্ভট একটি অপবাদ রটিয়েছিলো, তাই ও মনে করেছিলো আপনাকেও এরকম কথা বিশ্বাস করাতে, যাতে সবাই বোঝে আপনি এমপির লোক। আপনার উপরে ভীষণ ক্ষিপ্ত ছিলো সে। আপনাকে নাজেহাল করার জন্যই এটা করতে বলেছিলো আমাকে।”
স্থিরচোখে চেয়ে রইলো ছফা।
“ও জানতো, এরকম উদ্ভট গল্প কেউই বিশ্বাস করবে না। বড় কর্তাদের কাছে আপনি হাস্যকর পাত্র হয়ে উঠবেন।”
ছফার ভুরু কুঁচকে গেলো।
“ওর ধারণাটা যে ঠিক ছিলো তার প্রমাণ তো আপনি নিজেই। ঐ অভিযোগ তুলে মামলা করার সাহসও দেখাননি।”
ছফার চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো। মহিলা এদিক থেকে সফলই বলা যায়। সে নিজেও এমন উদ্ভট আর অবিশ্বাস্য গল্পটা চেপে গেছে সবার কাছ থেকে। এসব বললে যে তাকে পাগল, নয়তো উর্বর মস্তিষ্কের মানুষ ভাববে শুধু সে কারণে নয়, বরং তার আরেকটা ভয় ছিলো-মানুষ চিরযৌবন লাভের জন্য মরিয়া হয়ে উঠবে।
“মানুষের শরীরের বিশেষ একটি অগ্যান খেলে চিরযৌবন লাভ করা যায়-এ কথা তো বিশ্বাস করবে অতি আশাবাদী মানুষ, নয়তো বোকারহদ্দরা।”
ছফার কাছে মনে হলো ডাক্তার প্রকারান্তরে তাকে বোকা বলছেন! এমন সময় কিছু একটা মনে পড়ে গেলো তার, সঙ্গে সঙ্গে নড়েচড়ে উঠলো সে।
“কিন্তু যতোটুকু জেনেছি, আপনার অরিয়েন্ট হাসপাতালে আমেরিকা থেকে এক ডাক্তার এসে মুশকান জুবেরিকে নিয়ে এসব কথা রটিয়েছিলো…ঐ লোকের ব্যাপারটা কি তাহলে?”
আক্ষেপে মাথা দোলালেন ডাক্তার। “মায়ের নামটা নিয়ে নেওয়ার ফলে যে ভবিষ্যতে ঝামেলা হতে পারে সেটা সে ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি। ঐ ডাক্তারের আবির্ভাবের পরই সেটা প্রথম টের পায়।”
ছফা তাকালো আসলামের দিকে। দীর্ঘ সময় ধরে সে ঘরের আসবাবপত্রের মতোই নিশ্চুপ হয়ে শুনে যাচ্ছে।
“হাসপাতালের একজন ওনার হিসেবে ওই সিচুয়েশনটা সামাল দিতে গিয়ে আমাকে অনেক হিমশিম খেতে হয়েছিলো। ভদ্রলোককে বোঝাতেই পারছিলাম না, মুশকান তার মায়ের নামটা নিয়ে নেওয়াতে এই ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে। লোকটা যেনো একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেছিলো-চিরযৌবন লাভের সিক্রেট জানতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলো সে। একেবারে ছেলেমানুষি ভাবনা! যাই হোক, শেষ পর্যন্ত ঐ লোককে আমি বোঝাতে পেরেছিলাম, তবে ঐ ঘটনার কিছু দিন পর মুশকান ত্যাক্ত-বিরক্ত হয়ে চাকরিটাই ছেড়ে দেয়।” একটু থেমে আবার বললেন তিনি, “অবশ্য তার চাকরি ছাড়ার কারণ অন্য কিছু ছিলো। এখানকার রোগীদের আত্মীয়স্বজন রোগী মারা গেলে ডাক্তারদের উপরে যেভাবে চড়াও হয়, সেটা ওকে ভীষণ আপসেট করতো। চোখের সামনে এরকম কয়েকটি ঘটনা দেখে ভড়কে গেছিলো। আত্মসম্মানে আঘাত লেগেছিলো বলতে পারেন। আমাকে ও জানিয়েছিলো, হাসপাতালে চাকরি আর করবে না।”
“যে ডাক্তার মুশকানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিলো সে এখন কোথায়?”
গভীর করে দম নিয়ে নিলেন আসকার ইবনে সায়িদ। ছফার সন্দেহটা বুঝতে পেরেছেন তিনি। “চার-পাঁচ বছর আগে ভদ্রলোক দুবাইর এক হসপিটালে কাজ করতো, এখন কোথায় আছে জানি না।”
