“এসবের মানে কি?”
মুচকি হাসলেন ডাক্তার, তবে সেই হাসিতে কোনো তাচ্ছিল্যভাব নেই। যেনো তিনিও জানেন, এ কথা শুনে যে কেউ অবাক হবে।
“আপনার ঐ পিএসের বোন যা বলেছেন ঠিকই বলেছেন,” আস্তে করে বললেন বয়োজ্যেষ্ঠ চিকিৎসক। “কিন্তু মহিলা তো আর জানতেন না, পরবর্তীকালে মুশকান সোহেলি বিয়ে করে ফুটফুটে এক মেয়ের জন্ম দেয়, একটু থেমে ছফাকে দেখে নিলেন তিনি। সন্দেহগ্রস্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে। “আর সেই মেয়ে দেখতে হয়েছিলো অবিকল তার মায়ের মতোই।”
এতে অবাক হলো না ছফা। অনেক ছেলে-মেয়েই দেখতে বাবা-মায়ের মতো হয়। একেবারে হুবহুও হয়। তার নিজের মা-ই দেখতে ছিলো হুবহু তার নানীর মতো। তবে নানীকে তারা দেখেছে বয়সকালে, ফলে তাদের কাছে মিলটা তেমনভাবে ধরা না পড়লেও, পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছে। ঠিকই ধরা পড়েছিলো। নানীর যুবা বয়সের ছবি দেখেও ছফা বুঝতে পেরেছিলো মিলটা ছিলো বিস্ময়কর রকমেরই। একই বয়সের নানী আর তার মায়ের ছবি দেখলে মনে হতো একজনের ছবিই দেখছে-কিংবা যমজ বোনের!
“নিউটনের বাবার নাম কি ছিলো জানেন?”
ডাক্তারের এমন প্রশ্ন শুনে ভুরু কুঁচকে তাকালো ছফা।
“নিউটন! ওয়েস্টে এটা খুবই পপুলার ট্রেন্ড-বাবার নামে সন্তানের নাম রাখা। সন্তানের বেলায় কেবল যোগ করা হয় ‘জুনিয়র’ শব্দটি। যেমন জুনিয়র বুশ, ওর বাবার নামও ছিলো বুশ।”
“আপনি বলতে চাইছেন, মুশকানের মা নিজের মেয়ের নাম রেখেছিলো মুশকান?”
ছফার কথায় মাথা দোলালেন ডাক্তার আসকার। “না, না…ওর মা এ কাজ করেনি।”
“তাহলে?”
“মুশকানের মেয়ের নাম ছিলো রুখসান, দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ডাক্তার।
ছফা স্থিরচোখে চেয়ে রইলো, কিছুই বললো না। মুশকান আর রুখসানের গোলকধাঁধা থেকে এখনও বের হতে পারছে না।
“সুন্দর নাম, সন্দেহ নেই কিন্তু পরবর্তীকালে কিছু ঘটনার কারনে রুখসান তার নামটা পাল্টে ফেলে।”
“কি ঘটনা?” ভুরু কুঁচকে জানতে চাইলো নুরে ছফা।
“মুশকান সোহেলি, মানে মুশকানের মা আন্দিজ থেকে ফিরে আসার পর বাঙালি কমিউনিটিতে কোণঠসা হয়ে পড়ে, বাধ্য হয়ে সে চলে যায় বৃটেনে, মেডিকেল প্র্যাকটিস শুরু করে সে। ওখানেই এক বাঙালি ডাক্তারের সাথে তার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়, প্রেম হয়, তারা বিয়েও করে ফেলে। তাদের ছোট্ট সংসারে আসে রুখসান।” একটু থামলেন আসকার ইবনে সায়িদ। “রুখসানের জন্মের কয়েক বছর পরই দেশের টানে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই চলে আসে ঢাকায়। মেয়েটার বয়স যখন ছয় কি সাত, তখনই ওর বাবা আন্দিজের ঘটনাটা জেনে যায়। ডাক্তার গম্ভীর হয়ে চুপ মেরে গেলেন। “দোষটা মুশকানেরই!…আন্দিজ সারভাইভারদের উপরে অনেকগুলো পেপার ক্লিপিংসের একটি অ্যালবাম সযত্নে নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলো ও। ঘটনাচক্রে অ্যালবামটা ওর স্বামী দেখে ফেলে।”
ছফার মনে পড়ে গেলো তিন বছর আগের ঘটনাটি। মুশকান জুবেরি তাকে এরকম একটি অ্যালবাম দেখিয়েছিলো। কয়েকটি ছবি দেখার পর সে অচেতন হয়ে পড়ে। এখন কেবল ঝাপসা একটা স্মৃতি আছে। কখনও কখনও স্বপ্নে হানা দেয় সেই মুহূর্তটির কিছু অংশ। একেবারেই বিক্ষিপ্তভাবে।
“এই ঘটনার পর থেকে স্বামীর সাথে ওর দূরত্ব বেড়ে যায়,” ডাক্তার বললেন। “মুশকান কেন স্বামীকে বিয়ের আগে এটা বলেনি, কেন সে কথাটা লুকিয়ে রেখেছিলো-এই ছিলো ভদ্রলোকের অভিযোগ। তো, ঘটনাটা শেষ পর্যন্ত বিচ্ছেদের দিকেই মোড় নেয়। ও খুবই আত্মমর্যাদাসম্পন্ন আর স্বাধীনচেতা ছিলো, স্বামীর এমন আচরণের পর একসাথে আর থাকেনি, মেয়েকে নিয়ে আলাদা বসবাস করতে শুরু করে। ওর বাবাও কখনও মেয়ের দাবি নিয়ে সামনে আসেনি আর। ভদ্রলোক ডিভোর্সের এক বছরের মাথায় আবার বিয়ে করে ফেলে। তবে মুশকান আর সে পথে যায়নি। পুরুষবিদ্বেষী হয়ে উঠেছিলো সম্ভবত। একমাত্র সন্তান রুখসানকে নিয়ে একাকি জীবন বেছে নেয়, নিজের মতো করে গড়ে তোলে মেয়েকে। ও আবার রবীন্দ্র সঙ্গীতের ভক্ত ছিলো। রুখসানও মায়ের প্রভাবে রবীন্দ্রভক্ত হয়ে যায়। কিন্তু মা-মেয়ের সুখের এই ছোট্ট সংসারটি বেশি দিন টেকেনি। রুখসানের বয়স যখন চৌদ্দ, ওর মা কার অ্যাক্সিডেন্টে মারা যায়। প্রচণ্ড মানসিক আঘাত পায় রুখসান। বলতে পারেন, ভয়াবহ এক ট্রমার মধ্যে পড়ে যায়। নানান রকম অ্যাবনরমালিটি গ্রো করে ওর মধ্যে। সম্ভবত, সে কারণেই মায়ের মৃত্যুর পরের বছর যখন এসএসসি পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন করার সময় এলো, নিজের নাম পাল্টে সে মুশকান সোহেলি রাখলো।”
ছফার কপালে ভাঁজ পড়ে গেলো। আগে ক্লাস নাইনে থাকতে এসএসসি পরীক্ষার জন্য রেজিস্ট্রেশন করা হতো, তখন ইচ্ছে করলে নিজের নাম, জন্মসাল, তারিখ, সব কিছু ইচ্ছেমতো বদলে ফেলার সুযোগ ছিলো। এখনকার মতো স্মার্টকার্ড, ভোটার আইডিকার্ড কিংবা জন্মসনদের বালাই ছিলো না তখন।
ছফার মনে পড়ে গেলো, তার নিজের নামটাও পাল্টানোর খুব ইচ্ছে ছিলো-জ্ঞান হবার পর থেকে নুরে ছফা নামটার মধ্যে গেঁয়ো একটা গন্ধ পেতো সে। আর লোকজনও ঠিকভাবে ধরতে পারতো না প্রথমবার শোনার পর। অন্য অনেকের মতো সে-ও চেয়েছিলো নামটা একটু ‘স্মার্ট’ করতে, কিন্তু তার কঠিন শাসনের বাবার কড়া ধমক খেয়ে নিজেকে বিরত রাখে।
