ডাক্তার আসকারের নির্বিকার মুখ দেখে বোঝা গেলো না তিনি ভড়কে গেছেন কিনা। পিএসের গানম্যান আসলাম শক্তমুখে চেয়ে আছে তার দিকে।
নুরে ছফা সামনের দিকে ঝুঁকে এলো। “পৃথিবীটা অনেক বেশি ছোটো, ঝুঝলেন ডাক্তার? আর কেন জানি বাঙালিদের জন্য এই পৃথিবীটা আরো বেশি ছোটো।”
ডাক্তারের ভুরু কুঁচকে গেলো সামান্য।
“মুশকান জুবেরির যে শিকারের কেসটা নিয়ে আমি তদন্ত করছি, সেই হাসিবের মা সত্তর দশকে আমেরিকায় ছিলেন স্বামীর সাথে। ওখানে তিনি প্রতিবেশী হিসেবে কাকে পেয়েছিলেন, জানেন?” জবাবের অপেক্ষা না করেই আবার বললো, “মুশকান জুবেরিকে!”
এ কথা শোনার পরও ডাক্তার নির্বিকার থাকলেন।
ছফার কাছে মনে হচ্ছে, ডাক্তার জোর করে অভিব্যক্তি লুকানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন। “খুব বেশি কাকতালীয় মনে হচ্ছে?”
স্মিত হাসলেন আসকার ইবনে সায়িদ, তবে কিছু বললেন না।
“হাসিবের মায়ের সাথে প্রতিবেশী মুশকানের বেশ সখ্যতা গড়ে উঠেছিলো। তিনি এ-ও জানতেন, আন্দিজে প্লেন ক্র্যাশের শিকার হয়েছিলো মুশকান, মৃত মানুষের মাংস খেয়ে বেঁচে ছিলো আশি দিনেরও বেশি সময়।”
গভীর করে শ্বাস নিয়ে নিলেন ডাক্তার আসকার, যেনো কী বলবেন গুছিয়ে নিচ্ছেন।
“ঐ ভদ্রমহিলা এখন দেশে আছেন…মৃত্যুপথযাত্রি। তার মাধ্যমে মুশকানের একটি ছবিও জোগাড় করেছি আমি।”
আসকার ইবনে সায়িদের ভুরু কুঁচকে গেলো সামান্য।
“আপনার এই বানোয়াট গল্পটা যে এভাবে ধরা খাবে সেটা হয়তো ঘুণাক্ষরেও ভাবেননি।”
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ডাক্তার। আমার কথাটা পুরোপুরি না শুনেই-”
হাত তুলে ডাক্তারকে থামিয়ে দিলো ছফা। “অনেক হয়েছে, আর এসব গাঁজাখুরি গল্প বলবেন না আমাকে। আমার ধৈর্য কিন্তু অসীম নয়।”
কাঁধ তুললেন আসকার ইবনে সায়িদ। “পুরোটা শুনতে না চাইলে কী আর করা!”
ছফার ভুরু কুঁচকে গেলো। “পুরোটা বলতে আপনি কী বোঝাচ্ছেন?” একটু সামনের দিকে ঝুঁকে আবার বললো সে, “আমি যা বললাম তারপরও আপনার বলার কিছু আছে নাকি?”
“সত্যটাকে যদি গল্পই বলেন তাহলে বলবো, আমি তো কেবল শুরু করেছি। এখন আপনি শুনতে চাইলে বলতে পারি, নইলে নিজেই তদন্ত করে বাকিটা জেনে নেবেন। এক সময় না এক সময় এই সত্যটাই আবিষ্কার করবেন আপনি।”
ছফা স্থিরচোখে চেয়ে রইলেন ডাক্তারের দিকে। এই ভদ্রলোক কেএস খানের সামান্য চাপেই ভেঙে পড়েছিলেন, গরগর করে বলে দিয়েছিলেন সবকিছু। কিন্তু এখন তার মধ্যে যে আত্মবিশ্বাস আর দৃঢ়তা দেখতে পাচ্ছে, তাতে আগেরবারের সাথে কোনো মিলই পাচ্ছে না সে।
“আপনি এমন চালাকি করেছেন, যেটা আমাকে ভুলপথে পরিচালিত করবে, তদন্তটাকে কানাগলিতে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করাবে।”
এবার পরিহাসের হাসি হাসলেন ডাক্তার। অবশ্য, আগেরবার আমি সেটাই করেছিলাম।” একটু থেমে আবার বললেন, “সেজন্যে আপনাকে দোষও দিতে পারছি না।”
ছফা কিছু বললো না। তার কাছে মনে হচ্ছে, যে ডাক্তার এখন তার সামনে বসে আছে সে অন্য কেউ। ছফার সহকারী জাওয়াদ তাকে সবটাই বলেছিলো। কিভাবে মি, খান কথার মারপ্যাঁচে স্বনামধন্য ডাক্তার আসকার ইবনে সায়িদকে কাবু করেছিলো কোনো রকম হুমকি-ধামকি ছাড়াই।
“এবারও যে আপনি চালাকি করছেন সেটার প্রমাণ তো আমি দিলামই।”
“কীসের প্রমাণ?” ডাক্তার যেনো বুঝতে পারেননি কিছু।
“এততক্ষণ আমি আপনাকে যা বললাম সেটা শোনার পরও বুঝতে পারছেন না?”
কাঁধ তুললেন আসকার ইবনে সায়িদ। “আসলেই বুঝতে পারছি না।”
দাঁতে দাঁত পিষে ছফা বললো, “আর্জুমান্দ বেগম মুশকান জুবেরিকে চিনতেন…তারা দীর্ঘদিন প্রতিবেশী ছিলো।”
“হ্যাঁ, সেটা তো বুঝেছি কিন্তু আপনি এটাকে প্রমান বলছেন কেন?”
“এজন্যে বলছি, আর্জুমান্দ বেগম মুশকানের মায়ের বান্ধবী ছিলেন না, উনি মুশকানের বান্ধবী ছিলেন!”
হাসলেন ডাক্তার। “আপনার ঐ পিএসের বোন, তিনি কি কখনও মুশকানের মেয়েকে দেখেছেন?” একটু থেমে হিসেব করে নিলেন যেনো। “সম্ভবত দেখেননি। দেখার কথাও না। ওর তখন বিয়েই হয়নি…মেডিকেল স্টুডেন্ট ছিলো।”
“কার কথা বলছেন আপনি?” ছফা অবাক হয়ে জানতে চাইলো।
“মুশকান জুবেরির মায়ের কথা বলছি।”
“উফ!” অধৈর্য হয়ে উঠলো ছফা। বার বার এক প্যাচাল পাড়ছেন কেন! আর্জুমান্দ বেগম মুশকান জুবেরিকে চিনতেন…তার মাকে না!”
“আমি তো সেটাই বলছি,” চট করে বললেন ডাক্তার।
“তাহলে বার বার তার মায়ের কথা কেন বলছেন?”
“কারণ ওই মহিলাই মুশকান জুবেরির মা ছিলো, আপনি যে মুশকানকে খুঁজছেন সে ছিলো তার মেয়ে!”
“স্টপ ইট!” ধমকে উঠলো ছফা। “মুশকান…মুশকান জুবেরি মা! বার বার কী সব বলে যাচ্ছেন! আপনি ভেবেছেন কি, আমি আপনার গোলকধাঁধায় পড়ে খাবি খাবো?”
মাথা দোলালেন ডাক্তার। “দুঃখিত, আমি বুঝতে পারছি আপনার অবস্থা। আসলে আপনাকে দোষ দেয়া যায় না, আমি গুছিয়ে কথা বলতে পারি না…আর মাঝখানে অনেক প্রশ্ন করায় তালগোল পাকিয়ে ফেলেছি।”
ভুরু কুঁচকে চেয়ে রইলো নুরে ছফা। গভীর করে দম নিয়ে নিলো সে। “ঠিক আছে, বলুন আপনার আজগুবি গল্প!”
“যে মুশকানকে আপনি চেনেন তার আসল নাম রুখসান! আর তার মায়ের নাম ছিলো মুশকান সোহেলি!”
.
অধ্যায় ৩৯
মুশকানের নাম আসলে রুখসান! আর তার মায়ের নাম মুশকান সোহেলি?!
এরকম অসম্ভব কথা শোনার জন্য প্রস্তুত ছিলো না ছফা। তার কাছে কয়েক মুহূর্তের জন্য কেমনজানি অনুভূতি হলো। বুঝতেও একটু সময় নিলো সে। ডাক্তার আসকার ইবনে সায়িদের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।
