“ও আগেই ঠিক করে রেখেছিলো এমপির সাথে কথা বলে দেশ ছাড়বে। এমপির মৃত্যুর সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই।”
কপট প্রশংসার অভিব্যক্তি ছফার মুখে। “তা এখন বলুন, আপনার মুশকান জুবেরি কোন্ দেশে গেছে?”
মাথা দোলালেন ডাক্তার। “সেটা আমাকে বলেনি। আর আমিও জানতে চাইনি।”
“এতো কিছু বললো আর এটা বললো না আপনাকে? আপনি বলতে চাইছেন, মুশকান আপনাকে বিশ্বাস করতো না?”
মাথা দোলালেন ডাক্তার। “সত্যি বলতে, আমি নিজেই জানতে চাইনি। ওটা জানা থাকলে আমি হয়তো পুলিশি জেরার মুখে সব বলে দিতাম।”
বাঁকাহাসি দিলো ছফা। “সবই না হয় বুঝলাম, কিন্তু আপনি দেশ ছাড়লেন কেন?”
গভীর করে দম নিলেন আসকার ইবনে সায়িদ। “দুটো কারণে দেশের বাইরে গেছিলাম কিছু দিনের জন্য আপনার জ্বালাতন থেকে বাঁচতে আর আমার হার্টের চেকআপ করাতে।”
“আপনার নিজের হাসপাতাল থাকতে আমেরিকায় কেন? আপনার তো দেখি নিজের হাসপাতালের উপরেই ভরসা নেই।”
মাথা দোলালেন ডাক্তার। “বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আমি আমার হাসপাতালেই চেক আপ করি, আমেরিকার মতো উন্নত দেশে গেলে সেখানেও করাই। এর মানে, নিজের হাসপাতালের উপর ভরসা নেই যদি ভাবেন তো কিছু করার নেই।”
ছফা কিছু বললো না। ডাক্তারের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে রেখেছে সে। “যাই হোক, কয়েক মাস পরই আবার দেশে ফিরে এসেছিলাম আমি।”
“কাউকে না জানিয়ে!”
“দেশে এসে আমি যদি সেটা গোপন রাখি তার কারনও কিন্তু আপনি। উটকো ঝামেলা থেকে বাঁচতেই এটা করেছি।”
তাচ্ছিল্যের হাসি দিলো নুরে ছফা। “আপনি মনে করছেন আমি আপনার এই নতুন গল্পটা বিশ্বাস করবো? আমার কাছে প্রমাণ নেই বলতে চাইছেন?”
মুচকি হাসলেন ডাক্তার। “থাকলে তো আপনি মুশকানের বিরুদ্ধে হিউম্যান অর্গ্যান পাচারের সন্দেহ করে মামলা করতেন না! সম্ভবত আপনি তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগই করেছেন, তাই না?”
ছফা টের পেলো রাগে রীতিমতো তার শরীর কাঁপতে শুরু করেছে। সত্যিটা হলো, মুশকান জুবেরির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ হিসেবে সে মানব-অঙ্গ পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগও করতে পারেনি-সেই সব অঙ্গ ভক্ষণের অভিযোগ তোলা তো দূরের কথা। সে কেবল ঐ মহিলার বিরুদ্ধে কিছু লোকজনকে গুম করার প্রাথমিক অভিযোগ করে একটি মামলা করেছে। সেই মামলায় এমনকি এটারও উল্লেখ নেই, মহিলা লোকজনকে কি উদ্দেশ্যে গুম করেছে-কেন করেছে। তবে সরকারী তদন্তে বাধা দেয়া, ছফাকে হত্যাচেষ্টাসহ তার অস্ত্র কেড়ে নেবার মতো গুরুতর অভিযোগ তুলে আরো দুটো মামলা করেছে সুন্দরপুর থানায়।
“এ থেকেই বোঝা যায়, ওর ধারণাই সত্যি,” ডাক্তার বললেন।
সম্বিত ফিরে পেয়ে তাকালো ছফা।
“এই উদ্ভট গল্পটা যে কেউ বিশ্বাস করবে না সেটা আপনি নিজেও জানতেন।”
ভুরু কুঁচকে তাকালো ডিবির জাঁদেরল ইনভেস্টিগেটর। “আপনি কী বলতে চাইছেন, আন্দিজের ঘটনা মিথ্যে?”
মাথা দোলালেন ডাক্তার। “এটাই তো এই ঘটনার সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং পার্ট।”
“আপনি পরিস্কার করে বলেন, হেয়ালি করবেন না। আমি আপনার কাছে ইন্টারেস্টিং কোনো গল্প শুনতে আসিনি।”
“আপনার কাছে গল্প বলে সময় নষ্ট করার কোনো ইচ্ছে আমারও নেই।” একটু থেমে আবার বললেন, “তাহলে শুনুন, সংক্ষেপেই বলি। আন্দিজের ঘটনাটা যে মিথ্য নয় সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। ওটা সত্যি সত্যি ঘটেছিলো। দুর্ভাগ্যবশত, সেখানে আঠারোজন বেঁচে যাওয়াদের মধ্যে এক বাংলাদেশি তরুণী ডাক্তারও ছিলো। এর এক বর্ণও মিথ্যে নয়। সেই তরুণীও অন্যদের মতো নরমাংস খেয়েই জীবন বাঁচায়।”
কথাটা শুনে এই প্রথম আসলামের অভিব্যক্তিতে বিস্ময় দেখা গেলো। অনেকটা আৎকে উঠলো সে।
“কিন্তু ওই তরুণী মুশকান ছিলো না!”
“তাহলে সে কে ছিলো?” অবিশ্বাসে প্রশ্নটা করলেও ছফার ইচ্ছে করছে ডাক্তারের গালে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিতে। তাকে ছেলে ভোলানো গল্প বলে বিশ্বাস করাতে চাইছে! লোকটার দুঃসাহসের তারিফ না করে পারলো না।
“সমস্যা হলো, আমি যা বলবো সেটা আপনাকে সন্তুষ্ট করতে পারবে। ঐ আজগুবি গল্পটাই বিশ্বাস করতে চাইবেন আপনি। তবে সবটা শোনার পর, আশা করি সন্তুষ্ট না হলেও কাণ্ডজ্ঞান দিয়ে বুঝে নিতে পারবেন।”
ভুরু কুঁচকে চেয়ে রইলো নুরে ছফা। ডাক্তার যেনো সাসপেন্স গল্প। বলছেন। ক্রমশ বাড়িয়ে তুলছেন উত্তেজনা।
“আমি যে তরুণীর কথা বলছি সে কে ছিলো, জানেন?”
নুরে ছফা চোখমুখ শক্ত করে তাকিয়ে রইলো ডাক্তারের দিকে।
“রুখসান!”
“এই রুখসানটা কে?” অধৈর্য হয়ে বলে উঠলো ছফা।
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ডাক্তার। “সত্যি বলতে, মুশকানের মেয়ে!”
.
অধ্যায় ৩৮
নুরে ছফার মনে হচ্ছে তাকে ঠেলেঠুলে প্রহেলিকাময় গোলকধাঁধায় ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। ডাক্তারের কথার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছে না সে। শুধু বুঝতে পারছে, তার সাথে বিরাট কোনো চালাকি করা হচ্ছে।
কথাটা শোনার পর থেকে সে স্থিরচোখে তাকিয়ে আছে ডাক্তার আসকারের দিকে। নতুন একটি চরিত্র রুখসান আমদানি করে মুশকানের সাথে গুলিয়ে দেবার চেষ্টা করছেন তিনি। কিন্তু ছফার কাছে এমন কিছু আছে যা ডাক্তারের এসব গল্পকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেবে এক লহমায়।
“আপনি যদি জানতেন আমার কাছে কতো শক্তিশালী প্রমাণ আছে, তাহলে এসব বলার আগে অন্তত এক শ’ বার ভেবে নিতেন,” তিক্তমুখে বললো। তার মধ্যে আত্মবিশ্বাস ফিরে এসেছে অবার।
