“কী বলতে চাইছেন, আপনি? সব কিছু অস্বীকার করতে চাইছেন এখন?”
কাঁধ তুললেন ডাক্তার। “ওটা অবশ্য কোনো জবানবন্দী ছিলো না। আর যিনি এসেছিলেন, তিনিও রিটায়ার্ড করা এক ডিবি অফিসার। তার কাছে কী বলেছি না বলেছি সেটা ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না।”
ছফার চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেলো। “তার মানে আপনি বলতে চাইছেন-”।
তার কথা শেষ করা আগেই আসকার ইবনে সায়িদ বলতে শুরু করলেন, “যা বলেছিলাম সেটা একজনের অনুরোধেই বলেছিলাম। ওসব কথা মোটেও সত্যি নয়।”
অবিশ্বাসে ভুরু কুঁচকে তাকালো ছফা।
“খুবই উদ্ভট আর অবিশ্বাস্য একটি গল্প বলেছিলাম তার অনুরোধে।”
.
অধ্যায় ৩৭
মুশকান জুবেরি আন্দিজের বিমান দুর্ঘটনার শিকার হয়নি?!
হবার প্রশ্নই ওঠে না, কারণ ঐ সময় তার জন্মই হয়নি!
তিন বছর আগে কেএস খানের কাছে যে কাহিনী বলেছিলেন ডাক্তার, সেখান থেকে পুরোপুরি ইউ-টার্ন নিয়ে, সব কিছু অস্বীকার করে নতুন আরেকটি গল্প বলছেন এখন। নুরে ছফার মনে হচ্ছে, সে একটা গোলকধাঁধায় পড়ে গেছে। সব কিছু ঘোলাটে আর প্রহেলিকাময় করে তুলছেন আসকার ইবনে সায়িদ।
গভীর করে নিশ্বাস নিলো সে।
“আমি অবশ্য এমন গল্প বলতে রাজি হইনি,” বললেন ডাক্তার আসকার ইবনে সায়িদ। “কিন্তু ও যখন সবটা খুলে বললো, তখন তাকে বাঁচাতে এমন কাজ করতে রাজি হই।”
“সবটা মানে?”
“সুন্দরপুরের এমপি তার নামে আজগুবি সব অপবাদ ছড়িয়ে দিয়েছিলো, মানুষের কাছে তাকে ডাইনি বলে প্রচার করেছে, যাতে করে সে এলাকা ছেড়ে চলে যায়। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি। “লোকটার আসল উদ্দেশ্য ছিলো জমিদারের সমস্ত সম্পত্তি দখল করা।”
ছফাও এরকম কথা শুনেছিলো আতরের কাছ থেকে।
“মুশকানের ধারণা, ঐ এমপিই আপনাকে তার পেছনে লেলিয়ে দিয়েছিলো। তাই আপনাকে উদ্ভট একটা গল্প বলে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছিলো সে।”
“আমি এমপির হয়ে কাজ করেছি?!” অবিশ্বাসে বলে উঠলো ছফা।
মাথা নেড়ে সায় দিলেন আসকার ইবনে সায়িদ। “ও সেরকমই ধারনা করেছিলো।”
ছফা হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারলো না। সুন্দরপুরের অনেকেই এমন ধারনা করে ইদানিং কিন্তু তাই বলে স্বয়ং মুশকান জুবেরি?! “আপনি আমাকে হাসালেন, ডাক্তার,” বললো সে। “তাহলে যেসব মানুষকে সুন্দরপুরে নিয়ে গিয়ে গুম করে ফেলেছে মুশকান, তাদের ব্যাপারে কী ব্যাখ্যা দেবেন আপনি?” ইচ্ছে করেই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ খাওয়ার কথাটা এড়িয়ে গেলো আসলামের উপস্থিতির কারনে।
“এ ব্যাপারে আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম,” ডাক্তার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন। “সুন্দরপুর থেকে ঢাকায় এসে আমার ফ্ল্যাটে ওঠার পর।”
“সে আপনাকে কী বলেছিলো?”
“ওর ধারনা, এমপি আসাদুল্লাহই ওদেরকে কিছু করেছে।”
“কি?!” নুরে ছফা আৎকে উঠলো। “এমপি!?” মাথা দোলালো সে। “আপনার মুশকান এমন একজনের উপর পিণ্ডি চাপিয়ে দিচ্ছে, যে এখন মৃত! দারুণ অ্যালিবাই!”
“দেখুন, বিশ্বাস করা বা না-করা আপনার ব্যাপার। আমি শুধু, ও কী বলেছে, সেটা বলছি।”
দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো ছফা, “আচ্ছা, বলুন…মুশকান আপনাকে কী বলেছে।” কথাটা একটু তীর্যক শোনালো যদিও।
“ওখানকার এমপি কড়া নজরদারিতে রাখতো ওকে। ওর সাথে কোনো ছেলের সম্পর্ক হোক, তা সে চাইতো না। ওর ধারনা, সম্ভবত ঐ দু-জন লোক সুন্দরপুরে যাবার পর থেকে এমপির লোকজন তাদেরকে নজরদারিতে রেখেছিলো। সুন্দরপুর থেকে চলে যাবার সময় ঐ লোকগুলোই তাদেরকে গুম করে ফেলে।” একটু থেমে ছফার দিকে তাকালেন তিনি। সে এখন অবিশ্বাসে হাসছে। “তবে ও নিজেও এ ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত ছিলো না। এটা নিছকই ওর ধারণা।”
“তাহলে এমপি আসাদুল্লাহই সব করেছে…মুশকান জুবেরি ধোঁয়া তুলসী পাতা?”
কাঁধ তুললেন ডাক্তার। “একজন ইনভেস্টিগেটর হিসেবে সব কিছু খতিয়ে দেখে, প্রমাণের উপর ভিত্তি করে বিশ্বাস করাটাই আপনার উচিত হবে। ও কোনো অপরাধ করেছে কিনা সেটা খতিয়ে দেখেন। আর সত্যি বলতে, ও যা বলেছে তা-ই আপনাকে বললাম। এখানে আমার নিজস্ব কোনো মতামত নেই।”
মাথা নেড়ে সায় দিলো ছফা। “সেটা তো আমি করবোই,” একটু থেমে আবার বললো, “তাহলে কি প্রতিশোধ নেবার জন্য এমপিকে খুন করেছে মুশকান?”
ঠোঁট ওল্টালেন ডাক্তার। “সেটা আমি জানি না। আমি শুধু জানি, সে এমপির সাথে দেখা করে কিছু কথা বলতে চেয়েছিলো।”
“মুশকান যে এমপির সাথে দেখা করেছিলো সেটা আপনাকে বলেছে?”
“অবশ্যই। ও আমাকে বলেছিলো এমপির সাথে কথা বলবে। সম্ভবত রাশেদের সম্পত্তিগুলো যে ট্রাস্টের নামে দান করেছে সেটা জানানোর জন্য…সেই সাথে, মাস্টারের যেনো কোনো ক্ষতি না করে সেটাও হয়তো বলতে চেয়েছিলো।” গভীর করে নিশ্বাস নিলেন আবার। “হয়তো ভদ্রলোকের কাছে জানতে চেয়েছিলো, কেন সে তার পেছনে এভাবে লাগলো, এসব করে তার কী লাভ হলো…এই আর কি।”
“মুশকান তাহলে এমপির সাথে কথা বলেছিলো?”
“বলেছিলো। ওর সাথে কথা বলার পর, সেদিন রাতেই ভদ্রলোক মারা যায়। প্রচণ্ড মানসিক চাপে পড়ে একটু বেসামাল হয়ে পড়েছিলো লোকটা। মাত্রাতিরিক্ত ড্রিঙ্ক করায় হার্ট অ্যাটাকের শিকার হয়।”
“দারুণ! সব পাজল মিলিয়ে দিচ্ছে আপনার বলা এই গালগল্প!” তিক্ত মুখে বললো ছফা, “এমপির মৃত্যুর জন্য তো কেউ মুশকানকে সন্দেহই করেনি…পোস্টমর্টেম রিপোর্টও বলেছে ওটা মাত্রাতিরিক্ত ড্রিঙ্কের ফলাফল, তাহলে সে চোরের মতো পালিয়ে গেলো কেন?”
