মাথা দোলালো ছফা। “নাহ্। আমার মনে হয় না, ঐ মহিলা এরকম কাঁচা কাজ করবে।” ডাক্তারের দিকে চোখ স্থির করে বেশ জোর দিয়ে বললো, “তবে সে কোথায় আছে, আপনি জানেন।”
আসকার ইবনে সায়িদের চোখমুখ শক্ত হয়ে গেলো। “তিন বছর ধরে তাকে খুঁজে না পেয়ে শেষে আমার কাছেই এলেন?”
ছফা এ কথার কোনো জবাব না দিয়ে আশেপাশে তাকালো। “চলুন, কোথাও বসি…আপনার সাথে অনেক কথা বলতে হবে আমাকে।”
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ডাক্তার, ড্রইংরুমের দিকে যেতে যেতে পেছন দিকে না তাকিয়েই বললেন, “ওয়াহাবকে ছেড়ে দিন, ও গেটের কাছে থাকুক, ও এ বাড়ির দারোয়ান, ওকে নিয়ে চিন্তার কিছু নেই।”
আসলামকে ইশারা করলো ছফা। দারোয়ান ছেলেটাকে হাত নেড়ে নীচে চলে যেতে বললো সে।
ডাক্তার তার বিশাল ড্রইংরুমের একটা সিঙ্গেল সোফায় বসে পড়লেন। “আপনার ধারণা, মুশকান কোথায় আছে সেটা আমি জানি?”
আসলামকে নিয়ে বড় সোফাটাতে বসে পড়লো ছফা। “হ্যাঁ, আমার সেরকমই ধারণা।”
“তাহলে তো, আমার মতো মানুষকে এরকম একটি তথ্য জানিয়ে দিয়ে মুশকান বেশ কাঁচা কাজই করে ফেলেছে,” ব্যঙ্গ করে বললেন আসকার ইবনে সায়িদ।
“মানুষ তো, ভুল করতেই পারে,” ছফা হেসে বললো। “কেউই ভুলত্রুটির উর্ধ্বে নয়। যতোই বুদ্ধিমান মানুষ হোক, ভুল তো করেই।”
“তা ঠিক, আর সেটা আপনার বেলায়ও খাটে।”
“তবে মুশকান জুবেরি কোথায় আছে সেটা কেবল আপনিই জানেন-এ ব্যাপারে আমি একদম নিশ্চিত। এখানে আমার কোনো ভুল নেই।”
“আপনার এমন ধারণার কারণ?”
পকেট থেকে রমাকান্তকামারকে দেয়া সেই চিরকুটটা বের করে ডাক্তারের দিকে বাড়িয়ে দিলো নুরে ছফা। “এটা দেখুন, আশা করি চিনতে পারবেন।”
চিরকুটটা হাতে নিয়ে একটু দূর থেকে দেখার চেষ্টা করলেন ডাক্তার, তারপর নাইটগাউনের বুক পকেট থেকে রিডিং গ্লাসটা বের করে নাকের উপর চাপিয়ে দিলেন। একটু সময় নিয়ে পড়লেন চিরকুটটা। “এটা কার?” পড়া শেষে জানতে চাইলেন।
“আপনি বলতে চাইছেন, আপনি জানেন না?”
“আমি কিভাবে জানবো? মুখবন্ধ একটা খাম দিয়েছিলাম উকিলকে…সেটা তো খুলে দেখিনি। অন্যের চিঠি পড়ার মতো বদঅভ্যেস আমার নেই।”
“কিন্তু অন্যের হয়ে চিঠি পাঠানোর অভ্যেসটা ঠিকই আছে।”
“কী বলতে চাইছেন?” চোখমুখ শক্ত করে জানতে চাইলেন ডাক্তার।
“রমাকান্তকামার স্বীকার করেছেন আমার কাছে, এটা তাকে ট্রাস্টের উকিল ময়েজ উদ্দির খোন্দকার দিয়েছিলো তিন বছর আগে…সুন্দরপুর থেকে মুশকান জুবেরি পালিয়ে যাবার ক-দিন পর।”
ডাক্তার অপেক্ষা করলেন আরো কিছু শোনার জন্য।
“আর ময়েজ উদ্দিন খোন্দকারও একটু আগে স্বীকার করেছে, চিরকুটটা আপনি তাকে দিয়েছিলেন।”
আস্তে করে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ডাক্তার। “হ্যাঁ। মুশকান আমার ফ্ল্যাট থেকে চলে যাবার আগে একটা মুখবন্ধ খাম রেখে গেছিলো, একটু থেমে আবার বললেন তিনি, “সেই সাথে ছোট্ট একটা নোট। তাতে সে অনুরোধ করেছিলো, আমি যেনো খামটা রমাকান্তকামারকে দেবার ব্যবস্থা করি।”
ছফার মুখে হাসি দেখা গেলো কিন্তু সেই হাসি সন্তুষ্টির নয়।
“আমার পক্ষে সুন্দরপুরে গিয়ে এটা দেয়া সম্ভব ছিলো না বলে মি. খোন্দকারের মাধ্যমে খামটা মাস্টারের কাছে পাঠিয়েছিলাম।”
“ঐ উকিলকেও আপনিই নিয়োগ দিয়েছিলেন।”
“হ্যাঁ। রাশেদ আমাকে বলেছিলো, আমি যেনো ভালো কোনো ল ইয়ারকে অ্যাপয়েন্ট দেই ট্রাস্টের জন্য।”
“মি. জুবেরিকে আপনি তাহলে ভালো করেই চিনতেন?”
“অবশ্যই। ও আমার দূরসম্পর্কের কাজিন হয়। আমার মাধ্যমেই ওর সাথে মুশকানের পরিচয় হয়। আমার হাসপাতালেই দীর্ঘদিন ট্রিটমেন্ট নিয়েছে।”
একটু ভেবে নিলো ছফা। “মুশকান জুবেরির সাথে আপনার শেষ যোগাযোগ কবে হয়েছিলো?”
“প্রায় তিন বছর আগে।”
মুচকি হাসি দেখা দিলো তার ঠোঁটে। “এটা আমাকে বিশ্বাস করতে বলছেন?”
“নাহ্,” শান্তকণ্ঠেই বললেন ডাক্তার। “আপনি একজন পুলিশ অফিসার…তদন্ত করে দেখেন, তারপর কী বিশ্বাস করবেন না করবেন সেটা আপনার ব্যাপার।”
মাথা নেড়ে সায় দিলো নুরে ছফা। “ভালো কথা, মুশকানের বিরুদ্ধে আপনার অভিযোগটা আসলে কি?”
ডাক্তারের কাছ থেকে এমন প্রশ্ন শুনে দারুণ অবাক হলো। “আমার তো ধারণা, এটা আমার চেয়ে আপনিই ভালো জানেন।” আসলামের সামনে এসব কথা বলতে একটু দ্বিধা কাজ করলেও এখন সেটা না বলে উপায় নেই। এ মুহূর্তে তাকে এই আলাপ থেকে সরিয়ে দেয়াটা খুবই বেমানান দেখায়। “মুশকান জুবেরি অনেকগুলো মানুষ হত্যা করে গুম করে ফেলেছে।”
মাথা দোলালেন ডাক্তার। “ও কেন এটা করবে?”
“এ কথা জানতে চাইছেন আপনি??”
“আপনার কথা বুঝলাম না?”
দাঁতে দাঁত পিষে ফেললো নুরে ছফা। “আপনি সব কিছু অস্বীকার করতে চাইছেন?”
“সব কিছু মানে?”
“মি. খান…আমার সিনিয়র…আপনি তার কাছে যা যা বলেছিলেন তিন বছর আগে, সেসবের কথা বলছি।”
বাঁকা হাসি দিলেন ডাক্তার। “এরকম আজগুবি কথা তাহলে আপনিও বিশ্বাস করে বসে আছেন!”
ভুরু কুঁচকে গেলো ছফার।
“আপনি কী করে বিশ্বাস করলেন, আমি যা বলেছি তার সবই সত্যি?”
ডাক্তারের দিকে চেয়ে রইলো নুরে ছফা। ভদ্রলোক কী বলতে চাইছেন বুঝতে পারছে না। “আপনি বলতে চাইছেন, আপনি আমার সিনিয়রকে ওরকম কথা বলেননি?”
আসকার ইবনে সায়িদ আলতো করে মাথা দোলালেন। “না, সেটা আমি বলছি না। ঐ ক্রনিক ডিজিজে ভোগা ভদ্রলোককে আসলেই এরকম উদ্ভট কথা বলেছিলাম। যাই হোক, সেটা যে কেউ বিশ্বাস করবে জানতাম না।”
