গাড়ির ভেতর থেকেই বাড়িটার দিকে তাকালো সে। এটা বনানীর খুব কম সংখ্যক অভিজাত বাড়ির একটি, যা এখনও ডুপ্লেক্স হিসেবে টিকে আছে। আশেপাশে সবগুলো বাড়ি সময়ের আবর্তে মাল্টিস্টোরিড অ্যাপার্টমেন্টে রুপান্তরিত হয়েছে।
গাড়ি থেকে নেমে পড়লো নুরে ছফা, বন্ধ গেটটায় টোকা মারলো সে। আসলাম ড্রাইভিং সিট থেকে বের হয়ে এসে গেটের ডানদিকে থাকা কলিংবেলের সুইচ টিপে দিলো।
প্রায় তিন-চার মিনিট পর বিশাল গেটটার মাঝে যে ছোটো দরজা আছে সেটা খুলে মাথা বের করলো এক লোক। কিন্তু সে কিছু বলার আগেই ছফা মুখ খুললো।
“ডাক্তারসাহেব আছেন না?”
ভুরু কুঁচকে গেলো তার। “আপনারা কারা?!”
আসলাম খপ্ করে তার কলার ধরে ফেললো। “ডাক্তার কোথায়?”
আসলামের এমন আচরণে ভড়কে গেলো লোকটা।
“আমরা পুলিশ। বুঝতে পেরেছিস?”
লোকটার চেহারা দেখে মনে হলো এই জীবনে কখনও কোনো পুলিশ তার কলার ধরে কিছু জানতে চায়নি।
“ডাক্তার ছাড়া আর কে থাকে এখানে?” ছফা বেশ শান্ত কণ্ঠে জানতে চাইলো। তার ভাবভঙ্গিটাই এমন, ভালো করেই জানে এখানে ডাক্তার আসকার ইবনে সায়িদ থাকেন।
লোকটা ফ্যাল ফ্যাল চোখে চেয়ে আছে দেখে আসলাম একটা ঝাঁকুনি দিলো তাকে। “স্যারের কথার জবাব দে, বানচোত!”
“আ-আর তো কেউ থাকে না।”
ছফা আর আসলাম আস্তে করে গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লো।
“দরজা বন্ধ করে দে,” হুকুমের স্বরে বললো আসলাম।
দারোয়ান ভড়কে গেলেও কথামতোই কাজ করলো।
“স্যার, একে কী করবো?” ছফার কাছে জানতে চাইলো গানম্যান।
“ওকে আমাদের সাথে নিয়ে আসো,” কথাটা বলেই ছোট্ট লনটা পেরিয়ে বাড়ির দিকে পা বাড়ালো সে।
আসলাম যুবকের এক হাত শক্ত করে ধরে তাকে সঙ্গে করে নিয়ে চললো ছফার পেছন পেছন।
“ডাক্তার কি নীচতলায় থাকেন?” পেছনে না তাকিয়েই জানতে চাইলো ছফা।
“না, উপর তলায় থাকেন,” জবাব দিলো যুবক।
নীচ তলায় ঢুকে একটা আধপেঁচানো সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেলো তারা তিনজন। কেউ কোনো শব্দ করলো না।
সিঁড়ি দিয়ে উঠতেই ছফা দেখতে পেলো ডাক্তার আসকার হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন দোতলার ল্যান্ডিংয়ের কাছে। নিরিবিলি বাড়িতে শোরগোলের আওয়াজ শুনে হয়তো খোঁজ নেবার জন্য নীচে নামতে যাচ্ছিলেন তিনি।
.
অধ্যায় ৩৬
সিঙ্কের নাইট গাউন পরা ডাক্তার আসকার ইবনে সায়িদের সৌম্যকান্ত অবয়বটি সামান্য কুঁজো হয়ে আছে, মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছেন দোতলার ল্যান্ডিংয়ের কাছে। একটু আগে কলিংবেলের শব্দ শুনে তিনি যথেষ্ট অবাক হয়েছিলেন। এরকম কিছুর আশঙ্কা যে তার মনে উঁকি দেয়নি তা নয়, কিন্তু সত্যি বলতে, নুরে ছফাকে মোটেও আশা করেননি তিনি!
“কেমন আছেন, ডাক্তারসাহেব?” সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে মুচকি হেসে বললো ছফা। “খুব অবাক হয়েছেন মনে হয়।”
ঘটনার আকস্মিকতায় ডাক্তার কোনো কথা খুঁজে পেলেন না। তার কপালে চিন্তার ভাঁজ আরো প্রকট হলো।
“আপনার পেছনে আমার আরো সময় ব্যয় করা দরকার ছিলো,” অনেকটা অফসোসের সুরে বললো সে। “বলতে লজ্জা নেই, আপনাকে আমি খাটো করে দেখেছিলাম।”
ডাক্তার কিছুই বললেন না।
“তো, আমেরিকা থেকে কবে এলেন?”
“যাওয়া আসার মধ্যেই আছি। শেষবার এসেছি গত মাসে,” বেশ শান্ত কণ্ঠেই বললেন ভদ্রলোক।
কপালে চোখ তুলে ফেললো ছফা।
“এতে অবাক হবার কিছু নেই, আমি ফ্রিকোয়েন্টলি ট্রাভেল করি…এটা সবাই জানে।”
“কিন্তু সবাই যেটা জানে না তা হলো, আপনি আগে কখনও ঢাকায় এসে চোরের মতো ঘাপটি মেরে থাকতেন না।”
ডাক্তার নির্বিকার থাকার চেষ্টা করলেন, তবে চোর শব্দটার ব্যবহারে ভেতরে ভেতরে যে রুষ্ট হয়েছেন সেটা অবশ্য বোঝা গেলো। “দেশে ফিরে এলে ঘোষণা দিয়ে জানাতে হবে তা তো জানতাম না,” আস্তে করে বললেন তিনি। “নাকি আমি কোনো ফেরারি আসামি? থানায় গিয়ে রিপোর্ট করার কথা ছিলো?”
ছফা অবাক হলো ডাক্তারের এমন কথায়। কেএস খান আর জাওয়াদের কাছ থেকে যতোটুকু জেনেছে, এই লোক খুব সহজেই ভেঙে পড়েছিলেন-নরম, ভঙ্গুর আর ভদ্র একজন মানুষ। কিন্তু এখন তার কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে, লোকটা অতো নরম স্বভাবের নয়।
“আপনি তো আপনার নিজের হাসপাতালকেও কিছু জানাননি?”
“আমার নিজের হাসপাতাল, আমি কাকে জানাবো?” মাথা দোলালেন ডাক্তার। “আপনাকে মনে রাখতে হবে, ওখানকার কারো কাছে আমাকে জবাবদিহি করতে হয় না, বরং হাসপাতালের সবাই আমার কাছে জবাবদিহি করে।”
মাথা নেড়ে সায় দিলো ছফা। “হুম, তা ঠিক। এই সুবিধাটুকু আপনার আছে। হাজার হলেও, ওটার ত্রিশ পার্সেন্ট মালিক তো আপনিই।”
“তিন বছর আগের কথা,” ডাক্তার বললেন। “মনে হচ্ছে আপনি পুরোপুরি আপডেটেড নন। পার্সেন্টেজটা এখন পাঁচচল্লিশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।”
কপালে চোখ উঠে গেলো নুরে ছফার। “তাহলে কংগ্র্যাচুলেশন্স, ডাক্তার।”
গুভেচ্ছাটি গ্রহণ করার মতো কোনো লক্ষণ দেখা গেলো না আসকার ইবনে সায়িদের অভিব্যক্তিতে। “এখন বলুন, জোর করে আমার বাড়িতে কেন ঢুকেছেন?”
হাসলো নুরে ছফা, আসলামের দিকে তাকালো সে। চোখমুখ কঠিন করে ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে আছে। তার পেছনে ভয়ে জবুথবু হয়ে আছে। এই বাড়ির দারোয়ান।
“আমি যে মুশকান জুবেরির খোঁজ করছি আপনি সেটা ভালো করেই জানেন।”
বাঁকাহাসি দিলেন ডাক্তার। “আপনার ধারণা, সে এই বাড়িতে আছে?”
