“অন্যের প্রাইভেসি নষ্ট করাকে আপনি তদন্ত বলছেন?”
মুচকি হাসলো ছফা, তার চোখ এখনও ফোনের দিকে নিবদ্ধ। “তদন্ত করার সময় প্রাইভেসি লঙ্ঘন হলে কী হলো না এসব নিয়ে মাথা ঘামালে এগোনোই যায় না। তারপর মুখ তুলে আশ্বস্ত করে বললো, “আপনি নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন, আমার কেসের সাথে সম্পর্ক নেই এরকম কোনো কিছু নিয়ে আগ্রহ দেখাবো না। সেটা কোনো পরনারীর সাথে সম্পর্কের ব্যাপারই হোক কিংবা গোপন কোনো ক্লায়েন্টের কথাই হোক না কেন।”
উকিলের চেহারা আরক্তিম হয়ে গেলো কথাটা শুনে।
আবারও মনোযোগ দিয়ে কললিস্ট আর মেসেজ বক্স ঘাঁটতে লাগলো ছফা।
একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো ময়েজ উদ্দিনের ভেতর থেকে। “আপনি আমার ফোনটা রাখনু, মি. ছফা, কয়েক মুহূর্ত পর আস্তে করে বললো সে। “আর ওকেও থামতে বলুন,” ষণ্ডাটাকে ইঙ্গিত করলো এবার।
মুখ তুলে তাকালো ছফা। তার চোখেমুখে প্রশ্ন।
গভীর করে দম নিলো ভদ্রলোক। “এসব ঘাঁটাঘাঁটি করে ডাক্তারের খোঁজ পাবেন না,” ছফা কিছু বলতে যাবে তার আগেই বললো উকিল। “ডাক্তার আসকার আমাকে না বললেও আমার ড্রাইভার জানে উনি কোথায় থাকেন।”
.
অধ্যায় ৩৫
ময়েজ উদ্দিন খোন্দকারের চেম্বার থেকে বের হয়েই প্রধানমন্ত্রীর পিএস আশেক মাহমুদকে ফোন করেছিলো ছফা। উকিল ভদ্রলোক যে অবশেষে মুখ খুলেছে সেটা জানিয়ে দেয়া হয় তাকে।
তিন বছর আগে সুন্দরপুর থেকে পালিয়ে ঢাকায় আসার পর মুশকান জুবেরি উঠেছিলো ডাক্তার আসকার ইবনে সায়িদের ফ্ল্যাটে। তারপর একই ভবনে অন্য একটি ফ্ল্যাটে থাকা নিঃসঙ্গ এমপি আসাদুল্লাহকে হত্যা করার পর পর আত্মগোপনে চলে যায় সে। মহিলার সঙ্গে ডাক্তার আসকার ইবনে সায়িদও লাপাত্তা হয়ে যান। সুতরাং মুশকানকে ধরতে হলে ডাক্তারকে কজায় নিতে হবে সবার আগে। ডাক্তারই জানেন মুশকান কোথায় আছে। তাই ছফা এখন পিএসের ব্যক্তিগত গানম্যান আসলামকে নিয়ে ছুটে যাচ্ছে বনানীতে।
ময়েজ উদ্দিনকে যতোটা ভয় দেখানোর দরকার ছিলো ততোটাই করেছে। একটুও বাড়াবাড়ি করেনি। তা করার অবশ্য দরকারও ছিলো না। তার মেদহীন পেটানো শরীর আর জাঁদরেল চেহারাটাই যথেষ্ট ছিলো। পিস্তল হাতে অমন কঠিন মুখের কাউকে দেখলে ভয় পাবারই কথা। তার আরেকটি গুণ হলো, দরকার না পড়লে সে খুব একটা কথা বলে না। বাড়তি কোনো প্রশ্নও করে না।
এতো দিন ছফা জানতো, ডাক্তার আমেরিকায় চলে গেছেন, কিন্তু ট্রাস্টের উকিল তাকে জানিয়েছে, ভদ্রলোক আমেরিকায় গেলেও মাঝেমধ্যে ঢাকায় আসেন। আর ঢাকায় কোথায় থাকেন সেটাও উকিলের জানা আছে!
এখন দরকার আসকার ইবনে সায়িদকে নিজের কজায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার। স্বনামখ্যাত ডাক্তার হিসেবে তার সাথে রয়েছে সমাজের উঁচু মহলে ভালো যোগাযোগ। পিএস যেনো ছফাকে এ ব্যাপারে সাহায্য করেন-এমন অনুরোধের কথা শুনে আশেক মাহমুদ সঙ্গে সঙ্গে বলে দিয়েছে, এ নিয়ে চিন্তার কোনো কারণ নেই। প্রশাসন কিংবা বড় কোনো রাজনৈতিক নেতা তার কাজে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। এগুলো সামাল দেবার ক্ষমতা তার রয়েছে।
যে গাড়িটা আসলাম চালাচ্ছে সেটা পিএসের দুটো সরকারী গাড়ির একটি-পথে কোনো রকম ট্রাফিক পুলিশের চেকিংয়ে যেনো পড়তে না হয় তার জন্য এই ব্যবস্থা-আশেক মাহমুদ যেচে এই গাড়িটা আর নিজের গানম্যান আসলামকে দিয়েছে তাকে। আরো বলে দিয়েছে, লোকবলের দরকার পড়লে ছফা যেনো কোনো রকম সঙ্কোচ না করে। অবশ্য এ মুহূর্তে সেটার কোনো দরকারও দেখছে না সে। সত্তুরোর্ধ এক ডাক্তার, কেএস খানের মতো ভঙ্গুর স্বাস্থ্যের একজন সাবেক ডিবি অফিসারের সামনেই ঘাবড়ে গিয়ে সব গরগর করে বলে দিয়েছিলেন, ছফার মুখোমুখি হলে কী করবেন তিনি?
মুচকি হাসলো নুরে ছফা। উকিল ভদ্রলোক যখন বুঝতে পারলো নিজের উপরে ভয়াবহ বিপদ নেমে এসেছে তখন ঠিকই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। ডাক্তার আসকার কখনও উকিলকে বলেননি তিনি কোথায় আছেন, কিন্তু ময়েজ উদ্দিন অদ্ভুতভাবেই জেনে গেছিলো তার বাড়ির হদিস।
প্রায় বছরখানেক আগে তার দীর্ঘ দিনের ড্রাইভার চাকরি নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশে চলে গেলে একজন নতুন ড্রাইভারের দরকার পড়ে, তখন পরিচিত একজনের রেফারেন্স নিয়ে এক ড্রাইভার আসে তার কাছে ইন্টারভিউ দিতে। ময়েজ উদ্দিন যখন জানতে চায় এর আগে সে কোথায় কাজ করেছে, তখন ঐ লোক জানায়, দীর্ঘদিন সে কাজ করেছে। ডাক্তার আসকার ইবনে সায়িদ নামের এক ডাক্তারের ড্রাইভার হিসেবে।
নড়েচড়ে ওঠে উকিল। ডাক্তারের চাকরিটা তাহলে ছেড়ে দিলে কেন?-এমন প্রশ্নের জবাবে ড্রাইভার জানায়, ডাক্তার এখন ঘন ঘন দেশের বাইরে যান, মাসের পর মাস বাইরে থাকেন, সেজন্যে তাকে ছেড়ে দিয়েছেন।
ডাক্তারের সাবেক ড্রাইভারকেই ময়েজ উদ্দিন তার ড্রাইভার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে ঐ ইন্টারভিউয়ের পরে। ফলে নিজের ড্রাইভারকে ফোন করে ডেকে, খুব সহজেই তার পুরনো মনিবের বাড়ির ঠিকানাটা জেনে নেয় উকিল।
ময়েজ উদ্দিন খোন্দকারের পুরানা পল্টনের অফিস থেকে বিকেলে বের হলেও বনানীতে পৌঁছাতে পাক্কা দেড় ঘণ্টা লেগে গেলো ভয়াবহ ট্রাফিক জ্যামের কারণে। বনানীর তিন নাম্বার রোডের ১২ নাম্বার বাড়িটার সামনে ছফাদের গাড়ি থামলো সন্ধ্যার একটু আগে।
