“ডাক্তার তাহলে ঢাকায়ই ছিলেন!” কথাটা প্রশ্নের মতো শোনালো না। ভদ্রলোক যে আমেরিকায় চলে গেছেন এটা খতিয়ে দেখা দরকার ছিলো। সম্ভবত দেশের ভেতরেই কিছু দিন আত্মগোপন করেছিলেন, তারপর হয়তো বিদেশে চলে যান। আবার এমনও হতে পারে, ডাক্তার বিদেশে গিয়ে কিছু দিন পর দেশে ফিরে এসেছিলেন। কিন্তু তততদিনে ছফা অনেকটা হাল ছেড়ে দিয়েছিলো তার ব্যাপারে। ধরেই নিয়েছিলো, ভদ্রলোক সহসা দেশে ফিরে আসবেন না।
“উনি কোথায় ছিলেন না ছিলেন সেটা তো আমি জানি না,” উকিল এখন পরাভূত মানুষ, নিজ থেকেই বলতে লাগলো। আমি যা জানি তা-ই বললাম আপনাকে। এটাই সত্যি। বিশ্বাস করুন।”
“এরপর কি আপনার সাথে উনার আর যোগাযোগ হয়নি?”
“হয়েছে, তবে ফোনে।”
“কোত্থেকে ফোন করেছিলেন উনি?” উদগ্রীব হয়ে জানতে চাইলো ছফা।
একটু ইতস্তত করলো উকিল। “দেশের বাইরে থেকে।”
“কোন দেশ থেকে?”
“নাম্বার দেখে মনে হয়েছে আমেরিকা থেকেই কলটা করেছিলেন।”
ছফার সমস্ত উত্তেজনা দপ করে নিভে গেলো। কয়েক মুহূর্ত উকিলের দিকে চেয়ে থেকে বললো, “শেষ কবে যোগাযোগ হয়েছিলো উনার সাথে?”
“গত বছর।”
“ডাক্তার যে নাম্বার থেকে আপনাকে ফোন…”
কথাটা শেষ করার আগেই ময়েজ উদ্দিন খোন্দকার মাথা দুলিয়ে অপারগতা প্রকাশ করলো। “এক বছর আগের ঘটনা, নাম্বারটা আর কললিস্টে নেই।”
একটু ভেবে নিলো ছফা। “উনি আপনাকে কী জন্যে ফোন দিতেন?”
“ট্রাস্টের কাজকর্ম ঠিকমতো হচ্ছে কিনা, খোঁজখবর নিতেন আর কি।”
“উনি ট্রাস্ট নিয়ে এতো মাথা ঘামান কেন?”
প্রশ্নটা শুনে ময়েজ উদ্দিন একটু অবাক হলো যেনো। “ট্রাস্ট্রের একজন মেম্বার হিসেবে খোঁজখবর নেবেন না?”
ছফা চমকে গেলো। ডাক্তার আসকার ট্রাস্ট্রেরও সদস্য! এটা সে জানতো না। আসলে, রমাকান্তকামার ছাড়াও যে ট্রাস্টে আরো কয়েকজন সদস্য আছে সেটা নিয়ে কখনও আগ্রহ দেখানোর প্রয়োজন বোধ করেনি। “উনাকে কি মাস্টার নিজে ট্রাস্টের মেম্বার করেছেন নাকি…?”
“এটা রাশেদ জুবেরির ইচ্ছেতে হয়েছে। ডাক্তারের সাথে মি. জুবেরির ঘনিষ্ঠতা ছিলো।”
“হুম…বুঝতে পেরেছি,” শুধু এটুকুই বললো ছফা। মাস্টার তাকে এটা বলেননি। সেজন্যে ভদ্রলোককে দোষও দেয়া যায় না। দরকারের বাইরে আগ বাড়িয়ে কোনো কিছু বলার মতো লোক নন তিনি।
“দেখুন, আমি যা জানতাম বলে দিয়েছি, এর বেশি কিছু জানি না,” উকিল ভদ্রলোক বললো। “এটা আপনাকে বিশ্বাস করতে হবে।”
মাথা নেড়ে সায় দিলো ছফা, তারপর পিস্তল হাতে দাঁড়িয়ে থাকা কঠিন চেহারার লোকটার দিকে তাকালো, সঙ্গে সঙ্গে সে এগিয়ে গেলো ময়েজ উদ্দিনের দিকে।
“কী হচ্ছে! কী হচ্ছে!” একদম ভড়কে গিয়ে বলে উঠলো উকিল, নিজের চেয়ারে সেঁটে থাকার চেষ্টা করলো। “আমি সত্যিই বলেছি…বিশ্বাস করুন!”
জাঁদরেল চেহারার লোকটি উকিলের কলার ধরলো আস্তে করে।
ময়েজ উদ্দিন সাহায্যের আশায় তাকালো ছফার দিকে। “আ-আপনি আমাকে বলেছিলেন সত্যিটা বললে আমার কোনো ক্ষতি করবেন না…আমি কিন্তু সব সত্যি বলেছি!”
“হুম, তা বলেছিলাম,” বললো ছফা। “কিন্তু সত্যি বলেছেন নাকি মিথ্যে, সেটা খতিয়ে দেখতে হবে আমাকে।”
উকিলের চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গেলো। “খতিয়ে দেখবেন মানে?” একটা ঢোঁক গিলে আবার বললো, “কিভাবে?”
এবার মুচকি হাসি দিলো ছফা। “ভয়ের কিছু নেই। আপনি আপনার ফোনটা ওকে দিয়ে দিন।” পিস্তল হাতে লোকটাকে দেখিয়ে বললো সে। “ডেস্ক ড্রয়ার আর ক্যাবিনেটের চাবিটাও।”
উকিল ভদ্রলোক স্থিরচোখে চেয়ে রইলো কয়েক মুহূর্ত। কিন্তু অস্ত্রধারী অপেক্ষা করলো না, ময়েজ উদ্দিনের কোটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে মোবাইলফোনটা বের করে আনলো, তারপর আইনজীবীর কাঁধে টোকা দিয়ে চাবিগুলো চাইলো সে।
মন্ত্ৰতাড়িতের মতো ময়েজ উদ্দিন ডেস্কের উপরের দিকে একটা ড্রয়ার থেকে চাবির গোছাটা বের করে দিয়ে দিলো লোকটাকে।
নুরে ছফা ষণ্ডাটার কাছ থেকে মোবাইলফোনটা নিয়ে নিলো। “তুমি সবগুলো ড্রয়ার চেক করে দেখো। আমাদের হাতে যথেষ্ট সময় আছে।”
“জি, স্যার,” লোকটা বললো, তারপর উকিলের দিকে তাকালো। “চুপচাপ এখানেই বসে থাকুন। একদম শব্দ করবেন না।”
উকিলের ফোনটা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে শুরু করে দিলো ছফা। ওদিকে পিস্তল হাতে লোকটা উকিলের ফাইল কেবিনেট নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো।
“আপনি আমার কাগজপত্র এভাবে ঘাঁটাঘাঁটি করতে পারেন না!” আহত কণ্ঠে বললো ময়েজ উদ্দিন। “অনেক জরুরী কাগজপত্র আছে…ক্লায়েন্টদের অনেক গোপনীয়-”।
ছফা শীতল চোখে তাকালে উকিল ভদ্রলোক কথার মাঝপথে থেমে গেলো, আবারও নিজের কাজে ফিরে গেলো সে।
কয়েক মুহূর্ত পর, আইনজীবী ভদ্রলোকের দিকে তাকালো নুরে ছফা। ফোন ঘাঁটতে গিয়ে সে দেখেছে, রুবিনা নামের একজনের সাথে ভদ্রলোকের প্রণয়ঘটিত অসংখ্য মেসেজ। এই সেলফোন জিনিসটা যে আজকাল মানুষের সবচাইতে বড় প্রাইভেসি স্টোররুম হয়ে উঠেছে সেটা তার মতো তদন্তকারী কর্মকর্তার চেয়ে ভালো আর কে জানে। কারোর ফোন মানেই অসংখ্য গোপনীয় কাজকারবারের ভাণ্ডার।
“আমার কথা আপনি বিশ্বাস করেননি!” আশাহত কণ্ঠে বললো উকিল।
“এটা বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ব্যাপার না,” চোখ না তুলেই বললো ছফা। “এটা একেবারেই বিশুদ্ধ একটি তদন্তের বিষয়।”
