ছফার কথাটা শুনে চিন্তিত দেখালো আইনজীবীকে কিন্তু মেজাজের ঝাঁঝ একটুও কমালো না। “জল ঘোলা করতে কী বোঝাচ্ছেন? উনি কী করবেন, অ্যাঁ?”
“কী আর করবেন, সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রয়োগ করে জেনে নেবেন মুশকান জুবেরি এখন কোথায় আছে।”
“আরে, বার বার এক কথা বলছেন কেন!” চটে গেলো উকিল। “বললাম না, ঐ মহিলার সাথে আমার কোনো যোগাযোগ নেই! জীবনে তার সাথে আমার কথাও হয়নি, দেখা হবার তো প্রশ্নই ওঠে না! আমি কিভাবে তার খোঁজ দেবো?!”
“তাহলে উনার চিরকুটটা রমাকান্তকামারকে দিলেন কিভাবে?”
উকিলের চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো। আমি সেটা কাউকে বলতে বাধ্য নই। আপনার ঐ ক্ষমতাধর পিএস কী বাল ফেলবে ফেলুক!” ময়েজ উদ্দিন ক্ষেপে গেলো এবার। “উনাকে বলে দেবেন, এইসব মাস্তানি আর গুন্ডামি আমার সাথে যেনো করতে না আসে!”।
আক্ষেপের ভঙ্গিতে মাথা দোলালো ছফা। তাহলে উনাকে বলে দেই, আমি ব্যর্থ…যা করার উনিই করুক।”
ছফার কণ্ঠের শীতলতা টের পেয়ে উকিল বিস্ফারিত দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো কয়েক মুহূর্ত। “কী করবে আপনার ঐ পিএস, অ্যাঁ? আমাকে তুলে নিয়ে যাবে?” চেঁচিয়ে উঠলো এবার। “গুম করবে?”
“সেই আশঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যায় না।”
ভদ্রলোকের চেহারায় রাজ্যের বিস্ময় নেমে এলো, কপাল গেলো কুঁচকে। চট করে উঠে দাঁড়ালো চেয়ার ছেড়ে। “গেট লস, ইউ স্কাউড্রেল!” রীতিমতো কাঁপতে লাগলো সে। “গুম-খুন করতে করতে সাহস অনেক বেড়ে গেছে, অ্যাঁ? দেশটাকে মগের মুল্লুক পেয়েছে শালারা! যা খুশি তাই করবে?!”
ছফা নির্বিকার মুখে বসে রইলো চেয়ারে হেলান দিয়ে। সঙ্গে সঙ্গে ঘরে প্রবেশ করলো লম্বা, পেটানো শরীরের একজন মানুষ। ছোটো করে ছাটা চুল, শ্যাম বর্ণের কঠিন মুখ। লোকটাকে ঢুকতে দেখে উকিল ভদ্রলোক ভড়কে গেলো।
.
অধ্যায় ৩৪
“কে আপনি?”
“চুপ!” উকিলের কথা শেষ হবার আগেই বলে উঠলো এইমাত্র ঘরে প্রবেশ করা বলিষ্ঠ দেহের লোকটি। “কথা বললেই গুলি করে দেবো!” কোমরে গোঁজা পিস্তলটা বের করে আনলো সে, উকিলের মুখের কাছে অস্ত্রটা নেড়ে ইশারা করলো তাকে বসে পড়ার জন্য।
“আস্তে,” ছফা বললো সেই লোকের উদ্দেশ্যে। “সেফটি লক অফ আছে তো? গুলিটুলি না আবার বের হয়ে যায়!”
বলিষ্ঠ দেহের লোকটা পিস্তল নামিয়ে রাখলেও জায়গা থেকে এক চুলও সরে দাঁড়ালো না।
“আপনি বসুন,” ছফা আদেশের সুরে বললো ময়েজ উদ্দিনকে।
চোখেমুখে বিস্ময় নিয়ে বসে পড়লো উকিল, কিছুই বুঝতে পারছে না সে।
“ও একা না, বাইরে আরো লোকজন আছে, একটা মাইক্রোবাসও আছে।”
ঢোঁক গিললো ভদ্রলোক।
“তবে আমি ঝামেলা করতে চাইছি না। আপনাকে তুলে নিয়ে যাবার কোনো ইচ্ছেও আমার নেই। পিএসকে আমি কথা দিয়েছি, আপনি যদি আমার সাথে কো-অপারেট করেন তাহলে এসবের কোনো দরকারই হবে না।”
ছফার দিকে নিষ্পলক চেয়ে থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেললো ময়েজ উদ্দিন খোন্দকার। “ওটা যে মুশকান জুবেরির চিরকুট আমি জানতাম না…সত্যি বলছি,” ম্রিয়মান কণ্ঠে বললো সে। “আমি শুধু কিছু কাগজপত্রের সাথে ওটা রমাকান্তবাবুকে দিয়েছিলাম।”
“চিরকুটটা আপনাকে কে দিতে বলেছিলো?”
কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে উকিল বললো, “ডাক্তার আসকার ইবনে সায়িদ।”
তথ্যটা বিস্মিত করলো ছফাকে। মুশকানের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠজন হিসেবে ডাক্তারকে আগে থেকেই সন্দেহের তালিকায় রাখা উচিত ছিলো, কিন্তু প্রবীন এই ভদ্রলোককে মুশকান জুবেরি ব্যবহার করেছে, আদতে ডাক্তার আসকার এসব কর্মকাণ্ডের সাথে মোটেও জড়িত নন, মুশকানের কারণেই ভদ্রলোক আমেরিকায় পালিয়ে যান ঝামেলা থেকে বাঁচতে-কিছু দিন তার পেছনে সময় ব্যয় করার পর এমন ধারণাই পোষণ করতো ছফা। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, লোকটার পেছনে আরো সময় এবং শ্রম ব্যয় করা উচিত ছিলো।
“উনি কেন আপনাকে দিয়ে এটা পাঠালেন?”
একটু ইতস্তত করলো উকিল। “উনিই আমাকে ট্রাস্টের ল-ইয়ার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন।”
নুরে ছফা ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি এটা। পরক্ষণেই তার মনে একটা প্রশ্নের উদয় হলো-ডাক্তার আসকার আমেরিকায় যাবার আগে না পরে এ কাজ করেছেন?
“চিরকুটটা উনি কবে দিয়েছিলেন আপনাকে?”
“অনেক দিন আগে, তিন বছর তো হবেই।”
“আমি সঠিক সময়টা জানতে চাইছি।”
“আমাকে কাগজপত্র দেখে বলতে হবে। ট্রাস্টের কাগজপত্র তৈরি করে চিঠি দিয়ে জানিয়েছিলাম রমাকান্তবাবুকে…ওটার রেকর্ড আছে।”
“তাহলে কাগজপত্র দেখে বলুন,” ছফা আদেশের সুরে বললো।
উকিল ভদ্রলোক প্রায় পাঁচ-ছয় মিনিট ধরে ডেস্কের ড্রয়ার ঘেটে অবশেষে একটা নথি বের করে আনলো। “এটা…”
উকিলের হাত থেকে নথিটা নিয়ে তারিখটা দেখে নিলো ছফা।
“চিরকুটটা পাঠিয়েছি এই তারিখে, তবে ওটা পেয়েছি আরো দু-দিন আগে।”
ছফা নড়েচড়ে বসলো। মুশকানের কেসের অনেক কিছুই তার মুখস্ত। সে ভালো করেই জানে, কবে কখন ডাক্তার দেশ ছেড়েছিলেন।
“এটা কিভাবে সম্ভব! ডাক্তার তো তার আগেই আমেরিকায় চলে গেছিলেন!” অনেকটা আপন মনেই বলে উঠলো সে।
“তা তো জানি না। উনি আমার চেম্বারে না এসে বাসায় গিয়ে চিরকুটটা দিয়েছিলেন। একটা মুখবন্ধ খামে ছিলো।”
মাথা নেড়ে সায় দিলো ছফা। মুশকান জুবেরি নিজে এসে চিরকুট দেবার মতো কাঁচা কাজ করবে না। তাছাড়া আইনজীবীর সাথেও তার সম্ভবত কোনো রকম যোগাযোগ নেই–এসব কাজ ডাক্তার আসকারই করেছেন।
