হেসে ফেললো উকিল, একটু সামনের দিকে ঝুঁকে জোর দিয়ে বললো, “তার সাথে আমার কোনো যোগাযোগ নেই। আর ওই মহিলা আমার ক্লায়েন্টও না। এটা বিশ্বাস না করলে আপনার এই তদন্ত কানাগলিতে ঢুকে পড়বে।” এরপর আয়েশ করে নিজের চেয়ারে হেলান দিলো সে। “আমার ধারণা, আপনি এরইমধ্যে কানাগলিতে ঢুকে পড়েছেন।”
গভীর করে দম নিয়ে নিলো ছফা। “আচ্ছা। তাহলে বলুন, কিভাবে রমাকান্তকামারের লিগ্যাল অ্যাডভাইজার হলেন আপনি? ভদ্রলোক বলেছেন, আপনি কাগজপত্র পাঠানোর আগে উনি আপনাকে চিনতেনই না।”
মাথা দোলালো আইনজীবী। “কথা সত্যি।”
“রমাকান্তকামারের সাথে কিভাবে কন্ট্যাক্ট হয়েছিলো আপনার? কে করিয়ে দিলো সেটা?”
মাথা দোলালো ময়েজ উদ্দিন। “এটা তো বলা যাবে না। কেউ যদি নিজের পরিচয় গোপন রেখে তৃতীয় পক্ষ হয়ে অন্য কারোর ক্লায়েন্ট হবার জন্য আমাকে অনুরোধ করে সেটা কিন্তু বেআইনী নয়। এরকমটা প্রায়ই হয়ে থাকে আমাদের পেশায়। তবে আপনাকে আশ্বস্ত করতে পারি, মুশকান জুবেরি এ কাজ করেনি।”
ছফার ধৈর্যসীমা শেষ প্রান্তে গিয়ে ঠেকলো। “মনে হচ্ছে ঐ মহিলাকে রক্ষা করতে আপনি নিজের ক্ষতি স্বীকার করতেও রাজি আছেন।”
এবার আইনজীবী ভদ্রলোকের কৃত্রিম হাসিহাসি ভাবটা উবে গিয়ে চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো। আমি কিন্তু এটাকে হুমকি হিসেবে দেখবো। আপনি সরাসরি হুমকি দিচ্ছেন আমাকে!”
“আমি হুমকি দিচ্ছি না…বলছি, ঐ মহিলাকে রক্ষা করতে আপনি নিজের ক্ষতি স্বীকার করতেও রাজি আছেন বলে মনে হচ্ছে,” শুধরে দিলো ছফা। “এটা আমার পারসেপশান।”
“আচ্ছা,” মাথা দোলালো উকিল। “তাহলে সম্ভবত আপনি এটাও আন্দাজ করতে পারছেন, কিভাবে কারা আমার ক্ষতি করতে পারে?”
“তা তো পারছিই।”
“কারা?”
“সেটা কিছুক্ষণ পরই টের পাবেন।”
সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকালো আইনজীবী। “কার কথা বলছেন? কাদের কথা বলছেন আপনি?”
“এমন একজন যার কথা আপনি কোনোভাবেই ফেলতে পারবেন না।”
“হা-হা-হা,” ময়েজ উদ্দিনের অট্টহাসিতে ছোট্ট চেম্বারটা ভরে গেলো। “অনেক ক্ষমতাবান মনে হচ্ছে সেই লোক?”
মাথা নেড়ে সায় দিয়ে চেয়ারে আয়েশ করে হেলান দিলো নুরে ছফা।
“আইনের দিক থেকে আমাকে ধরা, আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করার মতো কিছু আপনার এবং আপনার ঐ ক্ষমতাধর মানুষটার কাছে নেই-এটা আপনাকে মাথায় রাখতে হবে।”
“তা মাথায় রাখছি, কিন্তু আপনাকেও একটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে। এই দেশে সব কিছু আইন মোতাবেক চলে না, একটু থেমে আবার বললো, “এটা আমার মতো আপনিও ভালো করেই জানেন ক্ষমতাবানেরা আইনের পরোয়া করে না।”
আইনজীবী ভদ্রলোকের কপালের ভাঁজ আরো ঘন হলো। “আপনি কী বলতে চাচ্ছেন? যা বলার স্পষ্ট করে বলুন।”
“এই মুশকান জুবেরির একজন শিকার হলো প্রাইমিনিস্টারের পিএস আশেক মাহমুদের ভাগ্নে।”
কথাটা শুনে উকিল একটু অবাক হলো।
“তিনি এখন নিজের সর্বোচ্চ ক্ষমতা ব্যবহার করে একটা তথ্যই জানতে চাইছেন-মুশকান জুবেরি কোথায় আছে।”
ময়েজ উদ্দিন অপেক্ষা করলো আরো কিছু শোনার জন্য।
“আমি তাকে এই চিরকুটটা দেখিয়েছি…বলেছি, এটা আপনার মাধ্যমে রমাকান্তবাবুকে দিয়েছে ঐ মহিলা। উনি আমাকে বলেছেন, আপনি যদি ভালোয় ভালোয় বলে দেন ঐ মহিলা এখন কোথায় আছে তাহলেই আপনার মঙ্গল। নইলে আপনার কাছ থেকে যেভাবেই হোক এটা বের করে নেবেন।”
“তাহলে উনি আপনাকে কেন পাঠিয়েছেন…নিজে ফোন করলেন না কেন? নাকি সরাসরি ফোন করে হুমকি দিতে ভয় পাচ্ছেন?”
মাথা দোলালো ছফা। উকিল সম্ভবত ভাবছে ক্ষমতাধর একজনের নাম ভাঙিয়ে সে ভয় দেখাচ্ছে তাকে। “উনি কিছু করার আগে আমি নিজে একবার চেষ্টা করে দেখতে এসেছি।”
“উনার হয়ে হুমকিটা দিতে?” বাঁকা হাসি দিয়ে বললো উকিল।
“না। আপনার পাছা বাঁচাতে!”
ভদ্রলোকের চোখমুখ শক্ত হয়ে গেলো আপত্তিকৰ শব্দটা শুনে। কোনো রকমে রাগ দমন করে বললো, “আমার পাছা নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না। নিজের পাছা বাঁচিয়ে রাখার ক্ষমতা আমার আছে।” কথাটা বলে গভীর করে দম নিয়ে নিলো। “আপনি যে আপনার কেসটা নিয়ে কিছুই করতে পারছেন না সেটা বেশ বুঝতে পারছি। আপনার ঐ পিএস হয়তো অধৈর্য হয়ে আপনাকে খুব চাপের মধ্যে রেখেছে, এখন নিজের পাছা বাঁচাতে এসেছেন আমার কাছে অদ্ভুত এক আব্দার নিয়ে-রাশেদ জুবেরির স্ত্রীর হদিস জানতে চাইছেন!”
ছফার চোখমুখও শক্ত হয়ে গেলো, তারপরও উকিলকে অবাক করে দিয়ে মাথা নেড়ে সায় দিলো সে। “ঠিক বলেছেন, উনি অধৈর্য হয়ে উঠেছেন। বলতে পারেন, উনার ধৈর্যের বাধ ভেঙে গেছে।”
দাঁত বের করে হাসলো উকিল। “এটাই স্বাভাবিক। তিন বছর ধরে একটা কেস সমাধান করতে পারছেন না, অধৈর্য হয়ে ওঠাটাই স্বাভাবিক।”
“শুনুন, আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে জানি, ক্ষমতাবান মানুষেরা তার চেয়ে কম ক্ষমতাবান মানুষজনের সাথে ডিল করার সময় খুব বেশি ধৈর্য দেখান না।”
“এটাই স্বাভাবিক। আপনি এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন মনে হচ্ছে।”
মুচকি হেসে মাথা দোলালো নুরে ছফা। “শুধু আমার কথা না ভেবে নিজেকেও হিসেবের মধ্যে রাখবেন।”
“আপনি আবারো হুমকি দিচ্ছেন কিন্তু!” তেঁতে উঠলো ভদ্রলোক।
গভীর করে দম নিয়ে নিলো ছফা। “একটু ঠাণ্ডা মাথায় আমার কথাটা শুনুন, এই তদন্তের জন্য দরকার শুধু সামান্য একটি তথ্য। শেষ পর্যন্ত সেটা হয়তো আপনি দেবেন কিন্তু অনেক জল ঘোলা করে।”
