তার গ্রামের ক-জন আসতে পেরেছে এমন অবস্থানে? ঝালকাঠি নামের এক জেলার প্রত্যন্ত এক গ্রামের কৃষকের ছেলে হিসেবে তার পক্ষে বড়জোর সারের ডিলার হওয়া ছাড়া আর কিছু হবার সুযোগ ছিলো না। তার বাল্যবন্ধুদের মধ্যে তাকে বাদ দিলে, ঐ সারের ডিলারই সবচেয়ে ভালো পেশা হিসেবে গণ্য করা হয়।
আদালতে গিয়ে কালো কোট পরে বিচারকের সামনে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দেবার যে পরিচিত দৃশ্যটি দেখা যায় নাটক-সিনেমায়, সেরকম কোনো আইনজীবি ময়েজ উদ্দিন খোন্দকার নয়। তার কাজকারবার সব কাগজে কলমে। অসংখ্য ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের লিগ্যাল অ্যাডভাইজার সে, পাশাপাশি আরো অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের লিগ্যাল পেপারওয়ার্কের কাজ করে থাকে। যে কোনো ব্যবসায়িক দলিল-চুক্তি আর বেচাকেনার কাজগুলো ক্লায়েন্টের স্বার্থে সুন্দরভাবে সম্পন্ন করেই সে জীবিকা নির্বাহ করে। এতে তার দক্ষতা ঈর্ষণীয়। আর বলাই বাহুল্য, ক্লায়েন্টের হয়ে এরকম কাজ করতে গেলে প্রায়শই অনৈতিক পন্থার আশ্রয় নিতে হয়। এসব নিয়েও ময়েজ উদ্দিনের কোনো মাথাব্যথা নেই। নীতি-নৈতিকতা হলো অতি আদর্শবাদীদের মানসিক সমস্যা। ওই দলে সে পড়ে না। তবে এসব করতে গিয়ে মাঝেমধ্যে যে পুলিশি ঝামেলায়ও পড়তে হয় সেটাই একমাত্র বিড়ম্বনা। আইনের সমঝদার হিসেবে এসব ঝামেলা থেকে কিভাবে নিস্তার পাওয়া যায় তাও সে ভালো করেই জানে।
এ মুহূর্তে দুপুরে লাঞ্চ করে পুরানা পল্টনের চেম্বারে বসে আছে সে, তার সামনে বসে আছে ডিবির এক কর্মকতা। আইনজীবী হিসেবে এসব আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার লোকজনকে ময়েজ উদ্দিন ভয় পায় না কখনও। তাদের হম্বিতম্বিকে ঠাণ্ডা মাথায় দন্তবিকশিত হাসি দিয়ে উড়িয়ে দেয় খুব সহজেই। এখনও সেটাই করছে।
“আমি তো বললামই, মুশকান জুবেরি নামের কাউকে চিনি না,” কথাটা বেশ জোর দিয়ে কিন্তু ধীরস্থিরভাবে বললো উকিল ভদ্রলোক। “আপনি আমার কাছে কেন এই মহিলা সম্পর্কে জানতে চাচ্ছেন বুঝতে পারছি না।”
বাঁকাহাসি দিলো নুরে ছফা।
“আপনি তো এটাও বলছেন না, মহিলা করেছেটা কি?” যেনো নিদোষভাবেই জানতে চাইলো উকিল।
“মুশকান জুবেরি বেশ কয়েকজন মানুষ হত্যা এবং গুমের সন্দেহভাজন আসামি।”
আইনজীবী ভুরু কপালে তুলে ছফার কথাটা পুণরুক্তি করলো, “সন্দেহভাজন আসামি। আচ্ছা। মহিলা কেন ঐসব লোকজনকে গুম করলো? মানে, তার উদ্দেশ্যটা কি ছিলো?”
বাঁকাহাসি দিলো ছফা। “এটা আপনার না জানলেও চলবে।”
কাঁধ তুললো ভদ্রলোক। “তা ঠিক। এসব আমার জানার দরকার নেই।” একটু থেমে আবার বললো, “যাই হোক, আমার ক্লায়েন্টের সাথে এই মুশকান জুবেরি নামের সন্দেহভাজনের বৈবাহিক সম্পর্ক ছিলো, তবে যে-সব লিগ্যাল পেপারওয়ার্ক করেছি ট্রাস্টের ট্রাস্টি রমাকান্তকামারের হয়ে, তার সাথে এই মহিলার কোনো সম্পর্ক নেই।”
স্থিরচোখে চেয়ে রইলো ছফা, তারপর পকেট থেকে ছোট্ট একটা কাগজ বের করে বাড়িয়ে দিলো উকিলের দিকে। “এটা একটু দেখুন।”
ময়েজ উদ্দিন খোন্দকার কাগজটা হাতে নিয়ে চোখ বুলিয়ে ঠোঁট ওল্টালো। “এটা কি? কে লিখেছে…কাকে লিখেছে?”
হেসে ফেললো ছফা। “আপনার স্মৃতিশক্তি দেখি বেশ দুর্বল।”
“তা বলতে পারেন, বয়স তো কম হলো না। সামনের বছর ষাটে পা দেবো।” নির্বিকার থাকার চেষ্টা করছে সে।
মুচকি হাসলো ছফা। “রমাকান্তকামার আমার কাছে গতকালই স্বীকার করেছেন, মুশকান জুবেরি পালিয়ে যাবার পর আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় এটা পাঠিয়েছিলো আপনার মাধ্যমে…তিন বছর আগে।”
“তিন বছর আগে?” অবাক হবার ভান করলো আইনজীবী। “বলেন কি! যে মহিলার সাথে জীবনে যোগাযোগ হয়নি, তার চিঠি আমি রমাকান্তবাবুকে দিয়েছি?”
চোয়াল শক্ত করে ফেললো ছফা। “এটা চিঠি না, চিরকুট। চিঠিতে প্রেরক আর প্রাপকের নাম লেখা থাকে, চিরকুটে থাকে না।”
ঠোঁট ওল্টালো উকিল। “চিঠি হোক আর চিরকুট, আমার আসলেই মনে পড়ছে না এটা আমি রমাকান্তকামারকে দিয়েছিলাম কিনা। তিন বছর আগের কথা…কতো কাগজপত্রই তো লেনদেন করতে হয় আমাকে, সব কি মনে রাখা সম্ভব?” একটু থেমে আবার বললো, “আমার ক্লায়েন্ট রমাকান্তবাবুরও যথেষ্ট বয়স হয়েছে, উনি হয়তো গুলিয়ে ফেলেছেন। ভদ্রমহিলা তো খুব সহজেই বেনামে ডাকযোগে উনার কাছে এটা পাঠাতে পারতেন।”
ছফার ইচ্ছে করলো উকিলের গালে কষে একটা চড় বসিয়ে দিতে। কিন্তু লোকটা তার চেয়ে বয়সে অনেক বড়, তাছাড়া একজন আইনজীবীকে চড় মেরে খামোখা মামলা খাওয়ারও কোনো ইচ্ছে তার নেই। এরা পান থেকে চুন খসলেই মামলা ঠুকে দেয়।
“তা পারতেন, কিন্তু মহিলা সেটা করেনি, সে আপনাকেই বেশি বিশ্বস্ত মনে করেছে।”
দাঁত বের করে হাসলো আইনজীবী। “আমার পেশায় কিন্তু বিশ্বস্ততা বিশাল বড় একটি রেপুটেশন। অনেক সময় লেগে যায় এটা অর্জন করতে। কিন্তু যার সাথে আমার পরিচয় নেই তিনি কেন আমাকে বিশ্বাস করতে যাবেন?”
“তাহলে অস্বীকার করছেন, এটা মাস্টারকে দেননি আপনি?”
আবারো নিঃশব্দে হাসলো আইনজীবী। “বললাম না, মনে নেই। আন্দাজে কেন বলবো এটা আমি পাঠিয়েছি? আর অস্বীকারই বা করবো কেন! কতো চিঠিপত্র লেনদেন করতে হয় আমাকে…সব কি মনে থাকে?”
“শুনুন, আমি শুধু একটা তথ্য জানতে চাই,” ধীরকণ্ঠে বললো নুরে ছফা, “মুশকান জুবেরির সাথে আপনার কখন কোথায় যোগাযোগ হয়েছিলো-এখনও যোগাযোগ আছে কিনা। সে এখন কোথায় আছে।”
