এমপির ছেলেগুলো অবাক হলেও চুপচাপ চলে গেলো উঠোন ছেড়ে। তারাও ভড়কে গেছে কিছুটা।
“ভাই…বুঝতে পেরেছি, কিন্তু মাস্টারসাহেব এই অঞ্চলের সম্মানিত একজন মানুষ…সবাই উনাকে”।
ছফা বুঝতে পারলে, এমপির কথার মাঝখানে বাধা দিয়ে কথা বলছে আশেক মাহমুদ। অনেকক্ষণ ফোনের ওপাশের কথা শুনে গেলো জোনায়েদ রহমান।
“জি, ভাই…ঠিক আছে…” মাথা নেড়ে সায় দিলো। “হুম, বুঝতে পেরেছি…স্লামালেকুম, ভাই।” ফোনটা কান থেকে সরিয়ে ছফার দিকে কয়েক মুহূর্ত চেয়ে রইলো সুন্দরপুরের নতুন এমপি। “আশেকভাইয়ের সাথে এই কেসের সম্পর্ক কী?”
উঠে দাঁড়ালো ছফা। হাত বাড়ালো ফোনটা নেবার জন্য। সঙ্গে সঙ্গে তাকে ফোনটা দিয়ে দিলো এমপি।
“এসব আপনার জানার দরকার নেই।” ফোনটা পকেটে ভরে নিলো সে। “আপাতত মাস্টারের সাথে আমার কাজ শেষ। ভদ্রলোক আমার কাছে স্বীকার করেছেন, মুশকান জুবেরি কবে কিভাবে উনার সাথে যোগাযোগ করেছিলো। উনার কোনো দরকারই ছিলো না আপনাকে এসব জানানোর।”
হতভম্ব এমপি চেয়ে রইলো ছফার দিকে।
“আতর আলী আর তার ঐ ছেলেটা,” শান্তকণ্ঠে বললো নুরে ছফা। “তারা আমার হয়ে কাজ করেছে…তাদেরকে কিছু করবেন না, ঠিক আছে?”
জোনায়েদ রহমান হ্যাঁ না কিছুই বললো না। চোখমুখ শক্ত করে চেয়ে রইলো।
তাকে একা রেখে চলে গেলো ছফা। এখানে আর কোনো কাজ নেই। সুন্দরপুরের পাট চুকে গেছে আপাতত।
.
অধ্যায় ৩২
রমাকান্তকামার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে লাইব্রেরি থেকে বের হয়ে এলেন।
একটু আগে তার স্নেহধন্য ছাত্র জোনায়েদ লোকমারফত তার কাছে খবর পাঠিয়েছে, ঐ নুরে ছফার পেছনে নাকি রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর পিএসের মতো ক্ষমতাবান একজন মানুষ। তিনি যেনো ঘুণাক্ষরেও সন্দেহভাজন কারোর সাথে যোগাযোগ না করেন। এসব থেকে তার দূরত্ব বজায় রাখাই ভালো হবে।
অলোকনাথের নাতবৌ তিন বছর আগে তার কাছে একটা চিরকুট পাঠিয়েছিলো ট্রাস্টের উকিল ময়েজ উদ্দিন খোন্দকারের মাধ্যমে-সে কথা ডিবি অফিসারকে বলা উচিত হয়েছে কিনা বুঝতে পারছেন না এখন। এরকম সততা না দেখালে কী এমন ক্ষতি ছিলো? যুধিষ্ঠিরও প্রয়োজনে মিথ্যে বলেছিলেন তিনি কি বলতে পারতেন না? তার তো মিথ্যে বলারও দরকার ছিলো না। স্রেফ বলে দিলেই পারতেন, কে পাঠিয়েছিলো সেটা তার মনে নেই। তিন বছর আগে কে একটা চিরকুট পাঠিয়েছে সেটা তার মতো বয়স্ক মানুষের স্মরণে না থাকারই কথা। তার চেয়েও ভালো হতো, চিরকুটটা নষ্ট করে ফেললে।
উকিল ভদ্রলোককে পুরো বিষয়টা জানিয়ে সতর্ক করার দরকার কিন্তু জোনায়েদের সতর্কবাণীর কারণে সে কাজও করতে পারছেন না। ডিবি অফিসার কিছুক্ষণ আগেই সুন্দরপুর ছেড়ে চলে গেছে, তার পরবর্তী টার্গেট যে উকিল হবে তাতে কোনো সংশয় নেই।
ডাক্তার আসকারের সাথে যে তার যোগাযোগ হয় মাঝেমধ্যে সেটাও ছফা বের করে ফেলবে খুব দ্রুত। আজকাল মোবাইলফোন হয়ে উঠেছে খুবই দরকারি আর ক্ষতিকর একটি জিনিস। এটা না থাকলে চলে না, আবার এটাই হয়ে উঠেছে সব নষ্টের মূল।
অবশ্য ডাক্তারকে তিনি ট্রাস্টের সদস্য করেননি, করার প্রশ্নই ওঠে না। ভদ্রলোকের সাথে তার পরিচয়ও ছিলো না। তিনি জানতেন না, লোকটার সাথে রাশেদের স্ত্রীর সম্পর্ক ছিলো। ভদ্রমহিলা যখন সুন্দরপুরে ছিলো তখন নাকি মাঝেমধ্যে এখানে আসতেন-এ কথা তিনি জেনেছেন অনেক পরে।
ট্রাস্টের উকিল ময়েজ উদ্দিন অবশ্য দাবি করেছে, রাশেদ জুবেরি নিজেই নাকি তাকে সদস্য করার কথা বলে গেছিলেন। অন্যদিকে, ভদ্রলোককে ট্রাস্টের সদস্য করায় বেশ উপকারও হয়েছে। প্রখ্যাত চিকিৎসক তিনি, তার সামাজিক অবস্থান আর উঁচুমহলে ভালো যোগাযোগ ট্রাস্টের বেশ কাজে লেগেছে। যখনই দরকার পড়েছে ভদ্রলোক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। এমন কি বিদেশের মাটিতে থেকেও তিনি সাহায্য করেছেন। মাস্টারের সাথে খুব অল্প ক-দিনেই তার সাথে বেশ সুসম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। তার ফোনে যে কয়জনের নাম্বার আছে, তার মধ্যে ডাক্তার আসকার ইবনে সায়িদ অন্যতম। তাকে কি ফোন করে সব কিছু বলা দরকার?
রমাকান্তকামার এ নিয়ে দ্বিধায় ভুগছেন। তার ধারণা, ডাক্তারের সাথে রাশেদের স্ত্রীর যোগাযোগ আছে।
মন্থর গতিতে হাঁটতে হাঁটতে তিনি নিজের বাড়ির দিকে যাচ্ছেন।
আরেকটা বিষয় তার মাথায় ঢুকছে না-প্রধানমন্ত্রীর পিএস কেন মুশকান জুবেরির কেসে আগ্রহী? ভদ্রলোকের সাথে এসবের কী সম্পর্ক?
এর আগে সুন্দরপুরের অনেকের মতো তিনিও মনে করতেন, প্রয়াত এমপি আসাদুল্লাহই ছফাকে লেলিয়ে দিয়েছিলো মহিলার পেছনেতার উদ্দেশ্য ছিলো, অলোকনাথের সমস্ত সম্পত্তি করায়ত্ত করা। কিন্তু সুদূর ঢাকা থেকে এরকম ক্ষমতাবান একজন মানুষ কেন ঐ ভদ্রমহিলার পেছনে লাগবে? তার উদ্দেশ্যটাই বা কী?
কোনো কিছুই বোধগম্য হচ্ছে না রমাকান্তকামারের।
.
অধ্যায় ৩৩
ময়েজ উদ্দিন খোন্দকার দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছর ধরে আইন পেশায় নিয়োজিত আছে। এই পেশায় সুনাম-দুনাম দুটোই সমানভাবে হাত ধরাধরি করে চলে। উকিলদের দুর্নাম থাকবে না তা কি হয়-ময়েজ উদ্দিন ওসব নিয়ে কখনও মাথা ঘামায় না। পেশাদার আইনজীবি হিসেবে ঢাকা শহরে প্রতিষ্ঠিত একজন মানুষ সে। ঢাকা ক্লাবের মতো বনেদী জায়গায় সুযোগ না পেলেও সদ্য গজে ওঠা উত্তরা ক্লাবে ঠিকই ঠাই করে নিতে পেরেছে।
