“কেন রাখবেন সেটা মাস্টারসাহেবই ভালো জানেন। আমি শুধু সেই কারণটাই খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি।”
এমপি স্থিরচোখে চেয়ে রইলো কয়েক মুহূর্ত। “মহিলা এখান থেকে চলে যাবার পর দেখা গেলো, জমিদার বাড়ির সমস্ত সম্পত্তি ট্রাস্ট করে দিয়ে গেছে তার প্রয়াত স্বামী রাশেদ জুবেরি। তিনিই মাস্টারসাহেবকে সেই ট্রাস্টের ট্রাস্টি করেছেন। এখানে ঐ মহিলার কোনো অবদান নেই।”
মুচকি হাসলো ছফা। পলিটিশিয়ানদের কথার মারপ্যাঁচ তার ভালো করেই জানা আছে। মুশকান জুবেরি সুন্দরপুর থেকে পালিয়েছে না বলে এমপি বলছে, সে চলে গেছে-এটাই প্রমাণ করে মহিলা এবং মাস্টারের ব্যাপারে তার পক্ষপাত।
“আপনি কি জানেন, আমিও সেই ট্রাস্টের একজন মেম্বার?” এমপি বললো।
“কিন্তু আপনার সাথে সম্ভবত ঐ মহিলা যোগাযোগ রাখেন না।”
ছফার দিকে স্থিরচোখে চেয়ে রইলো তরুণ এমপি।
“শুনুন,” শীতল কণ্ঠে বললো নুরে ছফা। “আমি একটা কেস তদন্ত করছি, দরকার পড়লে যে কাউকে জিজ্ঞেস করতে পারি। আপনি একজন সংসদ সদস্য হিসেবে আমার কাজে বাধা দিতে পারেন না, এটা আপনাকে বুঝতে হবে।”
“আমি বাধা দিলাম কোথায়?” অবাক হবার ভান করলো জোনায়েদ রহমান।
“এই যে, মাস্টারের ওখান থেকে এইসব ছেলেপেলেদের দিয়ে এখানে নিয়ে এসেছেন…এটাকে আপনি কী বলবেন?”
এমপি হেসে ফেললো। “এটাকে তদন্ত কাজের বাধা হিসেবে দেখছেন আপনি? আশ্চর্য!” কাঁধ তুললো জোনায়েদ রহমান। “যাই হোক, আপনি যা খুশি ভাবতে পারেন, আমার কিছু করার নেই। আমি শুধু আপনাকে একটা কথা পরিস্কার বলে দেবার জন্য ডেকে নিয়ে এসেছি-মাস্টারসাহেবকে কোনো রকম ডিস্টার্ব করবেন না।” শেষ কথাটা তর্জনি উঁচিয়ে, একেবারে রাজনৈতিক নেতাদের মতো করে বললো।
“ডিস্টার্ব বলতে কী বোঝাচ্ছেন?” শান্তকণ্ঠে জানতে চাইলো ছফা। এমপির হুমকিকে পাত্তাই দিলো না সে। “উনাকে কোনো রকম জিজ্ঞাসাবাদ করা যাবে না আর?”
নিজের রাগ দমন করলেও বেশ ধমকের সাথে বললো সুন্দরপুরের এমপি, “ডিস্টার্ব বলতে, উনার বাসায় চোর-বাটপার পাঠিয়ে চুরি করাকে বুঝিয়েছি! এ কাজ করার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে?”
“আমি চুরি করিয়েছি কে বললো?” ছফা একটুও বিচলিত হলো না।
জোনায়েদ রহমানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো। “যাকে দিয়ে চুরি করিয়েছেন সে তো নিজেই মাস্টারসাহেবের কাছে গিয়ে পা ধরে মাফ চেয়ে গেছে। এ-ও বলে গেছে, ঐ আতর হারামজাদা তাকে এ কাজ করতে বলেছিলো।”
ছফার কপালে হালকা ভাঁজ পড়লো।
“ভাই, এই লোক তো ঐ ইতরের মোটরসাইকেলে কইরা ঘুইর্যা বেড়ায়, যুবকদের একজন বলে উঠলো।
“ইতরটা এখন জাতে উঠে গেছে, নিজে আর এ কাজ করে না,” বললো এমপি। “আপনি আতরকে বলেছেন মাস্টারসাহেবের বাড়িতে চুরি করার জন্য, সে নিজে না করে ঐ ছেলেকে দিয়ে কাজটা করিয়েছে।”
ছফা বুঝতে পারলো, বল্টু নামের ছেলেটা চুরির কথা স্বীকার করে ফেলেছে। এখন এটা অস্বীকার করলে খামোখাই আতরের উপরে নির্যাতন নেমে আসবে। ইনফর্মারকে আগেই বলেছিলো যাকে তাকে দিয়ে এ কাজ না করাতে।
“আপনি চাইলে আমি সেই চোরকেও হাজির করতে পারি।” ছফাকে চুপ থাকতে দেখে বললো এমপি।
“শুনুন,” গভীর করে দম নিয়ে বললো ছফা। “তদন্তের প্রয়োজনে পুলিশকে অনেক কিছুই করতে হয়, আমিও তাই করেছি। এরজন্যে কারোর কাছে জবাবদিহি করার দরকার দেখছি না। তবে আপনাকে শুধু এটুকু বলবো, আপনি যে দলের এমপি, সেই দলের অনেক উপরের দিকের একজন এই কেসের ব্যাপারে আগ্রহী। এখানে উনার স্বার্থ জড়িত। আপনি যদি এই তদন্তে কোনো রকম নাক গলান তাহলে আমি বাধ্য হবো তাকে সব কিছু জানাতে।”
কথাটা যেনো এমপিসহ তার সাঙ্গপাঙ্গদের গায়ে জ্বলুনি ধরিয়ে দিলো। ছেলেদের মধ্যে একজন তেড়ে এসে কিছু বলতে যাবে অমনি হাত তুলে থামিয়ে দিলো জোনায়েদ রহমান। “আপনি কার কথা বলছেন?” নিজের রাগ দমন করে জিজ্ঞেস করলো, কিন্তু তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে।
“আপনার সাথে ফোনে আলাপ করিয়ে দেবো?” ছফা বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললো।
এমপির ভুরু কুঁচকে গেলো। “ঠিক আছে, ফোন দিন।”
ছফা পকেট থেকে ফোনটা বের করে পিএসের নাম্বারে ডায়াল করলো। তিনবার রিং হবার পর কলটা ধরলো আশেক মাহমুদ। নীচুকণ্ঠে পিএসকে জানালো সুন্দরপুরের এমপি তার কেসে ইন্টারফেয়ার করছে, রীতিমতো নিজের লোকজন দিয়ে তার বাড়িতে তুলে নিয়ে এসেছে।
এমপির দিকে তাকালো ছফা। তরুণ এমপি রেগেমেগে চেয়ে আছে তার দিকে। ফোনের ওপাশ থেকে কিছুক্ষণ শুনে গেলো। “উনাকে বলে দিন, আমার কেসের ব্যাপারে যেনো নাক না গলায়,” কথাটা বলে জোনায়েদ রহমানের দিকে তাকালো, তারপর ফোনটা বাড়িয়ে দিলো তার দিকে। “নিন…উনার সাথে কথা বলুন।”
জোনায়েদ রহমান দাঁতে দাঁত চেপে ফোনটা হাতে নিয়ে কানে চেপে ধরলো। “সুন্দরপুরের এমপি জোনায়েদ রহমান বলছি। আপনি কে বলছেন?” ওপাশ থেকে আশেক মাহমুদের পরিচয় পেয়ে বেশ অবাক হলো এমপি। এরকম কাউকে যে আশা করেনি বোঝাই যাচ্ছে।
তার মুখে প্রচ্ছন্ন হাসি।
“স্লামালেকুম, ভাই…ভালো আছেন?” ছফার দিকে তাকালো চকিতে। “জি, ভাই…আমিও ভালো আছি।” তারপর ঘিরে থাকা ছেলেগুলোকে এক হাত নেড়ে চলে যাওয়ার ইশারা করলো, মনোযোগ দিয়ে শুনে গেলো ফোনের ওপাশের কথা।
