“উনি পাঠিয়েছিলেন কিনা বলতে পারবো না।”
নুরে ছফার ভুরু কুঁচকে গেলো। “আপনি বলতে চাইছেন, ওটা কে পাঠিয়েছিলো সে-ব্যাপারে আপনি নিশ্চিত নন?”
“চিরকুটে উনার নাম লেখা ছিলো না, আর ভদ্রমহিলার হাতের লেখার সাথেও আমি পরিচিত নই, নিশ্চিত হবে কী করে?”
“ফেরারি আসামি হিসেবে নিজের নাম না লেখাটাই তো স্বাভাবিক।”
মাস্টার নির্বিকার রইলেন, কিছুই বললেন না।
“তবে আমি নিশ্চিত, ওটা কোনো মহিলার হাতের লেখাই। নারী পুরুষের হাতেরলেখা দেখলেই আমি চিনতে পারি। আপনি এটাকে আমার আরেকটি গুণ হিসেবে ধরে নিতে পারেন। শুধু সন্দেহবাতিকতা দিয়ে তো ইনভেস্টিগেশনের কাজ চালানো যায় না,” বাঁকা হাসি দিয়ে আবার বললো সে, “চিরকুটের কথাগুলো পড়লে দুধের বাচ্চাও বলে দেবে ওটা মুশকান জুবেরিই পাঠিয়েছে।”
মাস্টার এ কথারও কোনো জবাব দিলেন না।
“এখন বলুন, চিরকুটটা আপনাকে কে দিলো?”
আস্তে করে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন মাস্টার। “এ প্রশ্নের উত্তর দিতে কি আমি বাধ্য?”
মাথা নেড়ে সায় দিলো নুরে ছফা। “অবশ্যই আপনি বাধ্য। কারণ যে জানতে চাচ্ছে সে যদুমধুকদুজাতীয় কেউ নয়, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার একজন তদন্তকারী কর্মকতা…বেশ কয়েকজন মানুষের নিখোঁজ এবং সম্ভাব্য হত্যাকাণ্ডের কেস তদন্ত করছে। আপনার উচিত তাকে সর্বাত্মক সহযোগীতা করা। অবশ্য, আপনি যদি কোনো ক্রিমিনালকে রক্ষা করার পণ না করে থাকেন তো।”
রমাকান্তকামার খোঁচাটা হজম করে নিলেন নির্বিকার থেকেই। আরেকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন তিনি, “ট্রাস্টের ল-ইয়ার ময়েজ উদ্দিন খোন্দকার। উনিই চিরকুটটা দিয়েছিলেন আমাকে ট্রাস্টের কাগজপত্রের সাথে।”
অবাক হলো নুরে ছফা। তার উচিত ছিলো ট্রাস্টের ল-ইয়ার কে সেটা খতিয়ে দেখা, তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা কিন্তু সে তার সমস্ত মনোযোগ নিবদ্ধ করেছিলো ডাক্তার আসকারের উপরে।
“উনাকে আপনি আগে থেকে চিনতেন?”
“চেনার প্রশ্নই ওঠে না। ঐ মহিলা এখান থেকে চলে যাবার কিছু দিন পর এই ভদ্রলোক ডাকযোগে আমাকে সব কিছু জানান। ট্রাস্টের কিছু কাগজপত্রের সাথে তখন চিরকুটটাও দিয়েছিলেন।”
মাথা দোলালো নুরে ছফা। অবশেষে একটা সূত্র তাহলে পেলো। এই সুন্দরপুর থেকে! যে মাটিতে আছাড় খাইছেন সেই মাটি থেইক্যাই উঠতে হইবো-কেএস খানের আপ্তবাক্যটি তার মাথার ভেতরে অনুরণিত হলো আবার। এই ময়েজ উদ্দিন খোন্দকারের সাথে মুশকান নিশ্চয় যোগাযোগ রাখে! হয়তো সে-ই তাকে নিয়োগ দিয়েছে।
হঠাৎ কিছু একটা টের পেয়ে পেছনে ফিরে তাকালো সে। দেখতে পেলো তিন-চারজন যুবক ঘরে প্রবেশ করেছে। তাদের সবার চোখমুখ বেশ
.
অধ্যায় ৩১
সুন্দরপুরের নতুন এমপি জোনায়েদ রহমানের পৈতৃক বাড়িটি বেশ ছিমছাম আর বিশাল। মূল বাড়িটি কাঠের তৈরি, এখনও ভিটেয় পাকা দালান ওঠেনি।
ছফা অবাকই হলো। এই দেশে এমপি হবার সাথে সাথে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফুলে ফেঁপে ওঠে আর মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে বাড়িঘর!
এমপির বাড়ির বিশাল উঠোনে একটা চেয়ারে বসে আছে ছফা। তার সামনে আরেকটা খালি চেয়ার আছে। স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, এমপি এখানে এসে বসবেন। ছফাকে যে চারজন যুবক নিয়ে এসেছে, তাদের মধ্যে একজন বাদে বাকি তিনজন তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে, অন্যজন গেছে বাড়ির ভেতরে। ইচ্ছে করেই এইসব চ্যাংড়াদের কাছে নিজের ক্ষমতা জাহির করেনি সে। এরা এমপির চ্যালাচামুণ্ডা। নেতার পেছনে ঘুরে গর্ব বোধ করে। এককালে জমিদার, জোতদার, তালুকদার আর গ্রাম্য মোড়লেরা লাঠিয়াল নিয়ে ঘুরে বেড়াতো, এখনকার দিনে নেতারা এরকম যুবকদেরকে সে-কাজে ব্যবহার করে। পিএসের ক্ষমতা বরং ওদের নেতাকে দেখানোই বেশি ভালো হবে।
ঘৃণাভরে মাটিতে থুতু ফেললো ছফা। তাকে এ কাজ করতে দেখে চোখমুখ আরো শক্ত করে ফেললো এমপির ছেলেগুলো। এমন সময় সবুজ রঙের পাঞ্জাবি আর সাদা পায়জামা পরা এক তরুণ বের হয়ে এলো বাড়ির ভেতর থেকে, তার সঙ্গে এই যুবকদের একজন। ছফা বুঝতে পারলো, এই তরুণই নতুন এমপি জোনায়েদ রহমান। একজন সংসদ সদস্য হিসেবে চেয়ার ছেড়ে উঠে তাকে সালাম দেয়া সরকারী কর্মকতা ছফার কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে, কিন্তু সেটা করলো না সে। ব্যাপারটা যেমন তরুণ এমপির চোখ এড়ালো না, তেমনি এড়ালো না তার সাঙ্গপাঙ্গদেরও।
এমপির চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো মুহূর্তে। ছফার সামনে চেয়ারে বসে পড়লো সে। “আপনি একজন ডিবি অফিসার?” শান্তকণ্ঠেই জানতে চাইলো।
“হ্যাঁ।” ইচ্ছে করেই ‘স্যার’ সম্বোধন করা থেকে বিরত থাকলো।
“সুন্দরপুরে কী কাজে এসেছেন?”
“একটা কেস ইনভেস্টিগেট করতে।”
“কোন্ কেস?”
“কিছু মানুষের নিখোঁজ হবার কেস তদন্ত করছি আমি। আর ঐ মুশকান জুবেরি সেই কেসের প্রাইম সাসপেক্ট।”
“বুঝলাম, কিন্তু আপনি মাস্টারসাহেবের পেছনে লেগেছেন কেন?”
“আমি উনার পেছনে লাগিনি, শুধুমাত্র একটু জিজ্ঞাসাবাদ করেছি, তা ও খুবই ভদ্রভাবে।”
“এই কেসে উনাকে কেন জিজ্ঞাসাবাদ করছেন?” ভুরু কুঁচকে ফেললো এমপি।
“কারণ উনার সাথে ঐ মহিলার যোগাযোগ আছে।”
অবিশ্বাসে মাথা দোলালো জোনায়েদ রহমান। “এটা সুন্দরপুরের কেউ বিশ্বাস করবে?” নিজের চ্যালাদের দিকে তাকালো সে। “মাস্টারসাহেব ঐ মহিলার সাথে যোগাযোগ রাখতে যাবেন কেন? আশ্চর্য!”
