এমন পরিবেশ দেখে খুশিই হলো সে। ভালো করেই জানে, ভেতরের ছোট্ট একটা প্রাইভেট রুমে আছেন মাস্টার রমাকান্তকামার-আগে যেখানে মুশকান জুবেরি বসতো।
লাইব্রেরির ভেতরে ঢোকার সময় দু-জন মগ্ন পাঠকের কেউই মুখ তুলে তাকালো না, বইতে পুরোপুরি ডুবে আছে তারা। যতোটা সম্ভব কম আওয়াজ করে ধীরপদক্ষেপে লাইব্রেরির শেষ মাথায় ছোট্ট রুমটার দিকে এগিয়ে গেলো ছফা। আল্তো করে টোকা দিলো দরজায়। পর পর দু-বার।
“দরজা খোলাই আছে।”
ঘরের ভেতর থেকে মাস্টারের কণ্ঠটা ভেসে এলো। ছফাকে ভেতরে ঢুকতে দেখে মোটেও অবাক হলেন না প্রবীণ শিক্ষক।
“আদাব, স্যার,” ভেতরে ঢুকে বললো সে। “কেমন আছেন?”
“ভালো,” ছোট্ট করে জবাব দিলেন মাস্টার।
স্বল্প পরিসরের ঘরটায় একমাত্র টেবিলের ওপাশে বসে আছেন তিনি। টেবিলের সামনে মাত্র দুটো চেয়ার। দড়ি দিয়ে বাধা কিছু বইয়ের স্তূপ আছে ঘরে, আর দেয়ালে তিনটি সাদা-কালো ছবি টাঙানো।
খালি চেয়ারটায় বসে পড়লো ছফা। “এরা কারা?” দেয়ালের ছবিগুলো দেখিয়ে জানতে চাইলো সে।
“ত্রিলোকনাথ বসু, অলোকনাথ বসু আর রাশেদ জুবেরি,” বললেন মাস্টার। “এই লাইব্রেরির পেছনে তাদের অবদানই বেশি।”
“তাহলে তো আরেকজনের ছবি থাকার কথা ছিলো এখানে!”
মাস্টার স্থিরচোখে চেয়ে রইলেন।
“নতুন করে এই লাইব্রেরিটা দেবার পেছনে মুশকান জুবেরির অবদানই সবচেয়ে বেশি।”
একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো রমাকান্তকামারের ভেতর থেকে। “আপনি কী জন্যে এসেছেন সেটা বলেন।”
“বলছি বলছি,” মুচকি হেসে বললো ছফা। “আমি আগে ভাবতাম আপনি সত্য কথা বলেন সব সময়। অন্তত সুন্দরপুরের মানুষ তা-ই ভাবে-রমাকান্তকামার কখনও মিথ্যে বলেন না।” একটু থেমে আবার বললো, “সত্যবাদী যুধিষ্ঠির!”
মাস্টার এবারও নির্বিকার রইলেন।
“কিন্তু যুধিষ্ঠিরের মতো আপনিও মিথ্যে বলেন!”
“ঘুরিয়ে পেচিয়ে কথা না বলে সরাসরি বলুন, কী জানতে এসেছেন?” রমাকান্তকামারের কণ্ঠস্বর কঠিন হয়ে গেছে।
কয়েক মুহূর্ত মাস্টারের দিকে চেয়ে থেকে বললো ছফা, “আপনি যে মোবাইলফোন ব্যবহার করেন সেটা আমাকে বলেননি।”
“আমি তো অনেক কিছুই ব্যবহার করি…” গম্ভীর মুখে বললেন মাস্টার। “…তার সবই কি আপনাকে বলেছি? আর আপনিও কি আমার কাছ থেকে সব কিছু জানতে চেয়েছেন?”
“সব কিছু না হোক, ফোনের কথা বলেছিলাম আপনাকে…গতকালই।”
“আমি আপনাকে স্কুলের ফোন নাম্বারটা দিয়েছিলাম।”
“তা ঠিক। কিন্তু মোবাইলফোনটার নাম্বার দেননি।”
“আপনি সেটা চানওনি,” চট করে জবাব দিলেন মাস্টার।
মুচকি হাসলো ছফা। “তা চাইনি। তবে আজকাল নিজের ফোন মানে কিন্তু মোবাইলফোনই বোঝায়। সেটা কারো কাছে গোপন করার মানে বিশেষ কোনো কারণ আছে!”
ছফার ইঙ্গিতটা বুঝতে পারলেন মাস্টার। “বিশেষ কারণ তো আছেই।”
“সেটা কী, জানতে পারি?”
গভীর করে দম নিয়ে নিলেন রমাকান্তকামার। “আপনার কাছে কৈফিয়ত দেবার কোনো দরকার নেই আমার, তারপরও বলছি। ধরে নিন আপনার সন্দেহগ্রস্ত মনটাকে শান্ত করার জন্যই বলা, একটু থেমে আবার বললেন, “যে জিনিস আমি সব সময় ব্যবহার করি না, খুব দরকার পড়লে ব্যবহার করি, সেটার নাম্বার সবাইকে কেন দেবো?”
“বিশেষ কারোর সাথে যোগাযোগ করার দরকার পড়লেই ব্যবহার করেন?”
ছফার ইঙ্গিতটা বুঝতে পেরেও মাস্টার মাথা নেড়ে সায় দিলেন। “হ্যাঁ।”
“সেই বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিদের মধ্যে কি মুশকান জুবেরিও আছে?” প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিয়ে মাস্টারের দিকে দৃষ্টি বিদ্ধ করে রাখলো, কিন্তু লোকটার অভিব্যক্তি হতাশ করলো তাকে।
মাস্টার নির্বিকার থাকার চেষ্টা করলেন। “ভদ্রমহিলার সাথে আমার কোনো ধরণের যোগাযোগ নেই-এ কথা সেদিনও বলেছি, আজকেও বলছি। চাইলে আপনি এটা খতিয়ে দেখতে পারেন।”
“তা আমি দেখবো। আপনার মতো যুধিষ্ঠির তো নই…ডিবির সামান্য একজন ইনভেস্টিগেটর। সন্দেহবাতিকতা আমার যোগ্যতারই অংশ। ওটা না থাকলে আমিও সুন্দরপুরবাসিদের মতো যাকে তাকে দেবতাজ্ঞান করে বসে থাকতাম!”
মাস্টারের মুখ পাথরে খোদাই করা গ্রিক দেবতাদের মতো হয়ে গেলো।
“ঐ মহিলা যে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করে, তার কিন্তু শক্ত প্রমাণ আছে আমার কাছে।”
ছফার প্রশ্নটা শুনে মাস্টার একটুও অবাক হলেন না। সেটা যে কী তা আমি জানি,” একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন। “আমার ঘরে চোর পাঠিয়ে তল্লাশি করিয়েছে কেউ, কিছু জিনিস নিয়েও গিয়েছিলো, আবার ফেরত দিয়ে গেছে।”
একটু হেসে বললো সে, “চোর না বলে আপনার বলা উচিত অনুসন্ধানকারী।”
“বলতাম, যদি সে সত্যি সত্যি চোর না হতো!”
অবাক হলো ছফা-ভদ্রলোক কী করে এটা বুঝলেন? যাই হোক, সিদ্ধান্ত নিলো সরাসরিই বলবে এখন, ঘোরপ্যাঁচের আর দরকার নেই।
“মুশকান জুবেরির চিঠি পেয়েছিলেন আপনি, আর সেটা বেমালুম অস্বীকার করেছেন আমার কাছে।”
“ওটা চিঠি না…চিরকুট,” আস্তে করে বললেন মাস্টার। “চিঠি আর চিরকুটের মধ্যে পার্থক্য আছে।”
বাঁকাহাসি দিলো নুরে ছফা। “কোনটা চিঠি আর কোনটা চিরকুট সেটা যদি একটু বলতেন উপকৃত হতাম।”
নির্বিকার ভঙ্গিতে বললেন মাস্টার, “চিঠিতে প্রেরকের নাম লেখা থাকে…ডাকের মাধ্যমে আসে ওটা। আর চিরকুট লোকমারফত দেয়া হয়।
অনেক সময় নাম-ধামেরও বালাই থাকে না।”
মাথা নেড়ে সায় দিলো ছফা। “ধন্যবাদ। অনেক কিছু শিখলাম,” একটু থেমে আবার বললো, “তাহলে আপনি স্বীকার করছেন, মুশকান জুবেরি আপনাকে একটা চিরকুট পাঠিয়েছিলো।”
