রমাকান্তের আরো মনে পড়ে গেলো সেই বিকেলের শেষ দিকে, কিসমতকে নিয়ে তিনি কী করেছিলেন। তারা দুই বন্ধু গেছিলেন জমিদার অলোকনাথের সাথে দেখা করে এ কথাটা বলার জন্য। সব শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বয়োজ্যেষ্ঠ জমিদার বলেছিলেন, তিনি কীই বা করতে পারবেন। নিজের পরিবারের নিরাপত্তা নিয়েই এখন চিন্তিত, লাইব্রেরি নিয়ে ভাবার সময় কই!
জমিদারের এমন অসহায় অবস্থা দেখে রমাকান্তকামার আর দেরি করেননি, একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন দ্রুত। কিসমতকে সঙ্গে নিয়ে নেমে পড়েন রবীন্দ্রনাথকে রক্ষা করার কাজে। লুটেরা আর দাঙ্গাবাজদের হিংস্র আগুনে রবীন্দ্রনাথ পুড়ে যাবার আগেই ওটার মূল্যবান সম্পত্তিগুলো রক্ষা করতে হবে : দেশ মানে যদি মৃন্ময় না হয়ে চিন্ময় হয়ে থাকে, তো গ্রন্থাগার মানে দোচালার একটি ঘর নয়, এর সমস্ত বইগুলো!
চটের বস্তায় সেই বইগুলো ভরে, ক্ষেতের আইল ধরে মাথায় করে দৌড়ে দৌড়ে নিয়ে গেছে তারা দুই বন্ধু। এভাবে সন্ধ্যার আগে রবীন্দ্রনাথ যখন অর্ধেক রক্ষা করে ফেললো তখনই দূর থেকে দেখতে পায় আগুনের মশাল নিয়ে দাঙ্গাবাজেরা ধেয়ে আসছে।
অ্যাকশন অ্যাকশন! ডাইরেক্ট অ্যাকশন!
ভারতের দালালেরা নিপাত যাক নিপাত যাক!
এমন শ্লোগান তাদের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিলো। রমাকান্তকামার আর তার বন্ধু কিসমত অসহায়ের মতো শেষ একটি প্রচেষ্টা চালিয়েছিলো তারপরও, কিন্তু এক বস্তার বেশি বই সংগ্রহ করার আগেই হিংস্র লোকগুলো চলে আসে রবীন্দ্রনাথের সম্মুখে। ভেতর থেকে দরজা-জানালা বন্ধ করে দেয় কিসমত। অবশ্য দরজা খোলার চেষ্টাও করেনি দাঙ্গাবাজেরা, তারা লাইব্রেরির চারপাশে কেরোসিন ঢেলে নিজেদের হাতের মশালগুলো নিক্ষেপ করতে থাকে ঘৃণ্য উল্লাসে। কেউ কেউ জানালা ভেঙে ভেতরেও ছুঁড়ে মারে আগুনের মশাল। দাউ দাউ করে জ্বলতে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ!
রমাকান্তকামার আর কিসমত পেছনের একটা জানালা ভেঙে এক বস্তা বই নিয়ে বের হতে সক্ষম হয়। তারা যখন মাথায় বস্তা নিয়ে একটু দূরে ক্ষেতের আইলের উপর দাঁড়িয়ে পেছনে ফিরে তাকায়, দেখতে পায় সন্ধ্যার ফিকে হয়ে আসা আলোকে সমৃদ্ধ করে জ্বলন্ত চিতার মতোই জ্বলছে রবীন্দ্রনাথ।
সবগুলো বই রক্ষা করতে না পারার আক্ষেপটা সারা জীবনই তাকে পীড়া দিয়ে গেছে। তবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিশাল পরিমাণের বই রক্ষা করার আনন্দটাও কম ছিলো না।
ছোট্ট জানালাটা দিয়ে লাইব্রেরির ভেতরে আরেকবার চোখ বুলালেন রমাকান্তকামার। এখন অজস্র নতুন বইয়ের ভীড়ে সেই সব দুষ্প্রাপ্য বইগুলো এই গ্রন্থাগারের মূল্যবান সম্পত্তি হয়ে শোভা বর্ধন করছে।
একাত্তরে পাক-বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার পর অকথ্য নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন তিনি। ধরেই নিয়েছিলেন, সংগৃহীত বইগুলো শেষ হয়ে গেছে, সেই সাথে তার মৃত্যুও সন্নিকটে। ধীরস্থিরভাবে মৃত্যুকে মেনে নেবার জন্য মানসিকভাবে তৈরিই ছিলেন। কিন্তু এরপরই দিলুমিয়া নামের স্থানীয় এক ছোকরা, যে কিনা মসজিদের পাশে নিমের মাজনসহ তসবিহ, টুপি, আতর বিক্রি করতো, সে তাকে প্রস্তাব দেয় ধর্মান্তরিত হবার জন্য আল্লাহর পাকিস্তানে মালাউনদের কোনো ঠাই নাই! ধর্মান্তরিত হয়ে গেলে রমাকান্তকামর বেঁচে যাবেন। পাকবাহিনী তো সাচ্চা মুসলমান, তারা কি আরেক মুসলমানকে হত্যা করবে?
দিলুর এ কথা শুনে পরিহাসের হাসি ফুটে উঠেছিলো মাস্টারের ঠোঁটে। পাকবাহিনী যে অকাতরে মুসলমানও হত্যা করে বেড়াচ্ছে সেটা কে না জানতত। তাদের কাছে হিন্দু-মুসলিম দুই সম্প্রদায়ই ছিলো বাঙালি। তবে অস্বীকার করবার উপায় নেই, হিন্দুদের উপরে নির্যাতনের মাত্রাটা অনেক বেশি ছিলো।
দিলুমিয়া যখন জানায়, ধর্মান্তরিত না হলে মিলিটারিরা তাকে তো মেরে ফেলবেই, তার ঘরে আগুন দিয়ে ভিটায় ঘু ঘু চড়াবে। কথাটা শুনে তিনি আৎকে ওঠেন-তার ঘরে আছে সেই সব দুষ্প্রাপ্য বইপত্র! আর কোনো দ্বিধা
করে তিনি ধর্মান্তরিত হবার প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান।
যুদ্ধশেষে অনেক বছর পর সুন্দরপুরে আবারো কালোছায়া নেমে আসে-কোলাবরেটর হামিদুল্লাহর ছেলে আসাদুল্লাহ এই এলাকার এমপি হয়ে যায়। স্বাধীনতাবিরোধী বদনাম ঘোচাতে স্কুলের নামকরন করতে চাইলো বাবার নামে, বাধা হয়ে দাঁড়ালেন মাস্টার, তার সঙ্গে যোগ দিলো আরো অনেকে। কিন্তু এমপিকে থামানোর মতো শক্তি তাদের কারোর ছিলো
। মাস্টারের পুরনো অনেক ছাত্র সরকারী চাকরিতে বড়সর পদে অধিষ্ঠিত আছে, তাদের সাহায্য নিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী হামিদুল্লাহর নামে স্কুলের নামকরণের পায়তারা থামিয়ে দিতে পেরেছিলেন শেষ পর্যন্ত। এই ঘটনার পর ক্ষুব্ধ এমপি মাস্টারের চাকরিটা খেয়েছিলো রিটায়ারমেন্টের অল্প কিছু দিন আগেই। এতেও ক্ষান্ত হয়নি আসাদুল্লাহ, লোক দিয়ে তাকে তুলে নিয়ে গেছিলো, অনেক শাসিয়েছিলো কিন্তু তার চোখ রাঙানিকে একটুও পাত্তা দেননি রমাকান্তকামার।
স্মৃতি থেকে ফিরে এসে ছোট্ট জানালাটা দিয়ে লাইব্রেরির ভেতরে তাকাতেই তার কপালে ভাঁজ পড়ে গেলো।
এই লোক আবার কেন তার কাছে আসছে!
৩০. রবীন্দ্রনাথে দ্বিতীয়বার প্রবেশ
অধ্যায় ৩০
ছফা যখন রবীন্দ্রনাথে দ্বিতীয়বার প্রবেশ করলো তখন ভেতরটা বেশ নিরিবিলি-মাত্র দু-জন পাঠক বই পড়ছে। এর কারণ হয়তো একটু পরই লাইব্রেরিটা বন্ধ করে দেয়া হবে।
