আতর আর নুরে ছফা দৃষ্টি বিনিময় করলো। “দিদি?” ইনফর্মারই প্রশ্নটা করলো অবশেষে। “কার কথা কস?”
“ঐ যে, আমাগো গানের টিচার…এইটা ওই দিদির নম্বর।” দুটো নাম্বারের একটা দেখিয়ে বললো শ্যামল।
“কিন্তু এই সিম দুটো তো তোমার নামে রেজিস্টার্ড করা।”
ছফার দিকে অবাক হয়ে তাকালো শ্যামল। “হ, আমিই কিনছিলাম আমার কার্ড দিয়া।”
“তাদের সিম তুমি কেন তোমার নামে কিনলে?”
“মাস্টকাকা তো আইডিকার্ড হারায়া ফেলছেন সেই কবে। ঢাকায় গেছিলেন, বাসে কইরা ফিরার সময় ব্যাগ হারায়া ফেলছিলেন, হের পর আর কার্ড তোলেন নাই।”
ছফা ছেলেটার দিকে স্থিরচোখে চেয়ে রইলো কয়েক মুহূর্ত। “আর তোমাদের গানের টিচার? তারও কি আইডি কার্ড হারিয়ে গেছে?”
“দিদি তো শান্তিনিকেতন থেইকা আসছে, তার কেমনে কার্ড থাকবো?”
“হুম।” মাথা নেড়ে সায় দিলো সে। কথাটা আগেও শুনেছে।
“এইজন্যেই মাস্টকাকা আমারে কইলো আমি যে আমার আইডি দিয়া দিদির জইন্যও একটা সিম কিইন্যা দিই।”
“ব্যাটা, তুই এক নামে এতোগুলান সিম কিনছোস ক্যান, অ্যাঁ? কাহিনী কি?” ধমকের সুরে বললো আতর।
“একটা কার্ড দিয়া সাতটা সিম কিনা যায়…এইটা সরকারী নিয়ম, ব্যাখ্যা করে বললো শ্যামল।
আতর কিছু বলার আগে তাকে ইশারায় থামিয়ে দিলো ছফা। ছেলেটা মিথ্যে বলেনি। একটা কার্ড দিয়ে সর্বোচ্চ সাতটা সিম কেনা যায়। ফালতু নিয়ম! মনে মনে গজ গজ করলো সে। “কার জন্য এই খাবার নিয়ে যাচ্ছো?” ছেলেটার হাতে থাকা পলিব্যাগের দিকে ইশারা করলো।
“এইগুলান দিদির…ফজলুর হোটেলের ক্র্যামচপ দিদি খুব পছন্দ করে।”
“ঠিক আছে, তুমি যাও,” ছফার আর কিছু জানার নেই এই ছেলের কাছ থেকে।
তবে আতরকে দেখে মনে হলো সে সন্তুষ্ট হতে পারছে না। শ্যামলকে আরো কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করার কথা ভাবছিলো, এতো দ্রুত এই পর্ব শেষ হবে আশা করেনি।
ছেলেটা চুপচাপ চলে গেলো, একবার পেছনে ফিরেও তাকালো সন্দেহগ্রস্ত দৃষ্টি নিয়ে।
“পোলাটা মাস্টরের কিমুনজানি আত্মীয় হয়,” রহমান মিয়া বলে উঠলো এবার, অনেকক্ষণ ধরে চুপ ছিলো সে। “গানের মাস্টনিও মনে লয় মাস্টরের আত্মীয়। হিন্দু মানুষ তো, কলকাতায় আত্মীয়স্বজন থাকবারই পারে।”
ছফা কিছু বললো না। রহমান মিয়া হয়তো নির্দোষভাবেই কথাটা বলেছে। পকেট থেকে টাকা বের করে দোকানিকে দিয়ে এবার আতরকে বললো, “তুমি এখানেই থাকো, আমি আসছি।”
ইনফর্মার কিছু জানতে চেয়েও চাইলো না, সে দেখতে পেলো নুরে ছফা রাস্তা পার হয়ে রবীন্দ্রনাথের দিকে যাচ্ছে।
.
অধ্যায় ২৯
পড়ন্ত বিকেলে রমাকান্তকামার নিজের অফিসে বসে আছেন। প্রায় প্রতি দিনই স্কুল থেকে বের হয়ে সুন্দরপুর মহাসড়কের পাশে অবস্থিত এই রবীন্দ্রনাথ স্মৃতি গ্রন্থাগারে গিয়ে বসেন। এখানে সময় কাটাতে তার অদ্ভুত রকমের আনন্দ হয়।
দিন দিন লাইব্রেরির সদস্য বাড়ছে, বাড়ছে পড়ুয়াদের আগমন। নিত্য নতুন বইয়ের খোঁজ করে তারা। মাস্টার সে-সব টুকে রাখেন, মাস শেষে সেখান থেকে বাছাই করা বইগুলো সংগ্রহ করার চেষ্টা করেন। যে বইগুলো যুগ যুগ ধরে আগলে রেখেছিলেন সেগুলোর একটা সদগতি হয়েছে দেখাটা তার কাছে ভীষণ আনন্দের, তারচেয়েও বেশি আনন্দ পান যখন দেখেন অল্পবয়সীরা সে-সব বই পড়ছে। ছোট্ট একটা কামরায় বসে জানালা দিয়ে তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা দেখেন পড়ুয়াদের।
এ মুহূর্তেও তিনি সেটাই করছেন, কিন্তু আজকে সেই আনন্দে ভাটা পড়েছে খানিকটা। আইনের লোক হয়ে তার ঘরে চোর পাঠিয়েছে। কিছু জিনিস ফিরিয়ে দিলেও ঐ চিরকুটটা আর ফেরত দেয়া হয়নি। এটা নিয়ে একটু উদ্বিগ্ন হলেও মাস্টারের মানসপটে ভেসে উঠলো কিছু দগদগে স্মৃতি।
সদ্য মেট্রিকুলেশন পাস করেছেন, দিনের বেশির ভাগ সময় পড়ে থাকেন শ্রীমান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গণগ্রন্থাগারে। তার কাছে সুন্দরপুরের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা ছিলল ওটাই। কী মনোরম পরিবেশ! বিশাল এক বটবৃক্ষের সুশীতল ছায়ার নীচে অবস্থিত দোচালা ঘরের মাঝারি আকৃতির একটি পাঠাগার। দু-পাশে অসংখ্য জানালা, সেই জানালা দিয়ে যতোদূর চোখ যেতে দেখা যেতো সুন্দরপুরের অপরূপ প্রাকৃতিক দৃশ্য। প্রচণ্ড ভ্যাপসা গরমেও সুশীতল বাতাসের কমতি ছিলো না। শান্ত নিরিবিলি পরিবেশ। বইয়ে ডুবে থাকার জন্য চমৎকার একটি জায়গা।
তারপরই একদিন শুরু হলো ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ। সুন্দরপুর থেকে হাজার মাইল দূরে কাশ্মীর নিয়ে দুই প্রতিবেশীর লড়াই। সেই লড়াইয়ের হিংস্র উত্তাপ ছড়িয়ে পড়লো সুন্দরপুরেও। চারদিকে ফিসফাস শোনা যেতে শুরু করলো। এক বিকেলে বাল্যবন্ধু কিসমত এসে জানালো, তার কাছে নাকি পাক্কা খবর আছে, আজ সন্ধ্যায় মুসলিমলীগার হামিদুল্লাহর নেতৃত্বে একদল দাঙ্গাবাজ লোক রবীন্দ্রনাথ-এর নামনিশানা মুছে দেবে-সেরকমই পরিকল্পনা হয়েছে। থানার পুলিশকেও জানিয়ে দেয়া হয়েছে, তারা যেনো চোখকান বন্ধ রাখে!
রমাকান্তকামারের বুক ভেঙে গেছিলো কথাটা শুনে। তার বিশ্বাসই হচ্ছিলো না হিংস্র আর ধর্মান্ধ রাজনীতির শিকার হতে পারে একটা লাইব্রেরি! তারপরই মনে পড়ে গেলো, যারা দেশ চালাচ্ছে তারা কোন্ প্রকৃতির মানুষ। এরাই কি ক্ষমতায় আসার পর রবীন্দ্রসঙ্গীতকে নিষিদ্ধ করার মতো জঘন্য কাজ করেনি? বাঙলাভাষার অন্যতম সাহিত্যিককে শত্রু হিসেবে প্রতিপন্ন করেনি, শুধুমাত্র হিন্দু হবার কারণে? যদিও মূর্খ আর ধর্মান্ধগুলোর জানা ছিলো না, কবিগুরু ধর্মে ছিলেন ব্রাহ্ম! হিন্দু আর ব্রাহ্মর মধ্যে তফাৎ বোঝার মতো মানুষ অবশ্য তারা ছিলো না।
