রহমান অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছে, এখন পর্যন্ত কোনো কাস্টমারই হিটলুর চালাকিটা ধরতে পারেনি। জমিদারের বৌয়ের রেস্টুরেন্টের নামটা হুবহু নেয়নি সে, কিন্তু পরিহাসের বিষয় হলো, খেতে এসে কোনো খাদ্যরসিক ‘খেতে’টা যে নেই, সেটাই লক্ষ্য করে না। বড়জোর পুরনো কাস্টমাররা বলে, আগের মতো আর অতো স্বাদের হয় না খাবারগুলো। তবে একদম নতুন যারা আসে, তারা সেটাও বুঝতে পারে না।
তিক্ত মুখে রহমান ওয়াক করে থুতু ফেললো দোকানের পাশে, আর তখনই শব্দটা কানে গেলো তার। আতর আলী আসছে মোটরসাইকেলে করে, তার পেছনে বসে আছে শহর থেকে আসা পুলিশের সেই লোকটি। সুন্দরপুরে যে আবারো খারাপ কিছু ঘটবে সেটা নিশ্চিত। তারপরও আপাতত দু-জন কাস্টমার পেয়ে তার মুখে হাসি ফুটে উঠলো।
বাইকটা দোকানের সামনে এসে থামতেই শহুরে লোকটা নেমে গেলো আস্তে করে।
“রহমান মিয়া, কেমন আছেন?”
“ভালা, ছার। আপনে কিমুন আছেন?” বিগলিত হাসি দিয়ে বললো দোকানি।
“আমি ভালো আছি। তা, আপনার ব্যবসা কেমন চলছে?” নুরে ছফা দোকানের সামনে একটা বেঞ্চে বসে পড়লো।
“ব্যবসা মন্দা…কাস্টমার নাই,” হাসিমুখটা আবারো বেজার করে বললো টঙের মালিক।
“আমাগো কি কাস্টমার মনে করো না তুমি?” বাইকের ইঞ্জিন বন্ধ করে বললো আতর আলী।
“তা ক্যান মনে করুম না। আমি কইতাছি সারাদিনের কথা।”
“হুম,” আতর বিজ্ঞের মতো বলে বসে পড়লো ছফার পাশে। “এহন পেচাল বাদ দিয়া দুই কাপ গুড়ের চা বানায়া ফালাও জলদি।”
“প্যাচাল পাড়লাম কুনহানে!” মর্মাহত হলো রহমান। “তুমার খালি আজাইরা কথা।” এই বলে চা বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো সে।
“মাস্টর কি ওইহানে আছেনি?” রাস্তার অপর পাশে রবীন্দ্রনাথের দিকে ইশারা করে বললো ইনফর্মার।
“হ, বিকালে তো ওইহানেই থাহে,” চামচ নেড়ে নেড়ে চায়ের সাথে গুড় মিশিয়ে বললো রহমান। সারা দিন স্কুলে কাম করার পরও মাস্টর জিরায় না…এইহানে আহে আবার। বিয়াশাদিও তো করে নাই, বাড়িত গিয়া করবোটা কী।” কথাটা বলে ছফা আর আতরের দিকে কাপ দুটো বাড়িয়ে দিলো। “আপনেরা কি স্কুলে যাইবেনি?”
রহমানের প্রশ্নটা শুনে বিরক্ত হলো আতর। তার খুব বলতে ইচ্ছে করছিলো-আদার বেপারি তুমি, এতো জাহাজের খবর লও ক্যান-কিন্তু সে প্রসন্নভাবে হেসে বললো, “না…শ্যামরে একটু দরকার আছিলো। হেরে দেখছোনি?”
শ্যামলের কথা শুনে রহমানের ভুরু কুঁচকে গেলো। “হেরে আবার কী দরকার?”
“সব কথা তোমার জানোন লাগবো, না?” এবার আর বিরক্তি লুকালো ইনফর্মার। “সুন্দরপুরের বিবিচি হইবার চাও মনে হইতাছে।”
“ওইসব হওনের কুনো শখ আমার নাই,” আস্তে করে বললো রহমান। “নিজের কাম নিয়া থাহি, অইন্যের খবর জাইন্যা আমার কী লাভ!”
আতর কিছু বলতে যাবে কিন্তু ছফার চোখের ইশারা পেয়ে থেমে গেলো।
“শ্যামল কি স্কুল থেকে বের হয়েছে?” নুরে ছফা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে জানতে চাইলো।
গাল চুলকালো রহমান। “হেয় তো একটু আগে ঐদিকে গ্যাছে,” টাউনের দিকটা দেখিয়ে বললো সে।
“কততক্ষণ আগে?”
“দশ-পোন্ডা মিনিট তো হইবোই।”
নুরে ছফা আর আতর আলী একে অন্যের দিকে তাকালো। রহমানের টঙে বসেই অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলো তারা।
চা শেষ করে ছফা যখন সিগারেট ধরাবে তখনই আতর তাকে ইশারা করলো সুন্দরপুরের মহাসড়কের দিকে। এক তরুণ হাতে পলিব্যাগ নিয়ে বেশ আয়েশী ভঙ্গিতে রবীন্দ্রনাথের সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছে।
ছফার ইশারা পেয়ে উঠে দাঁড়ালো আতর। তাকে রাস্তার দিকে যেতে দেখে রহমান মিয়ার কৌতূহলি চোখ স্থির হয়ে রইলো যেনো।
ছেলেটাকে ইশারায় ডাকলো ইনফর্মার। অবাক হলো শ্যামল।
রহমান মিয়া এখন চোখের পলকই ফেলছে না। পুরো নাটকটার এক মুহূর্তও মিস করতে চাইছে না সে-রসিয়ে রসিয়ে মানুষের কাছে যখন গল্পটা বলবে তখন যেনো বর্ণনায় একটুও খামতি না থাকে।
শ্যামল কিছুটা ভিরু পায়ে এগিয়ে এলো আতরের কাছে, আর ঠিক তখনই রহমান মিয়ার দোকানে নুরে ছফাকে দেখতে পেলো। এই লোক যে পুলিশ এরইমধ্যে জেনে গেছে সে। তার চোখেমুখে ভয় জেঁকে বসলো।
“এই যে, আমাগো ছফাস্যার,” রহমানের দোকানের কাছে এসে বললো আতর আলী। “সেলাম দে স্যারে।” ধমকে উঠলো শ্যামল নামের ছেলেটাকে। “তরে কিছু পুছতাছ করববা…ভালায় ভালায় সব কইবি, ঠিক আছে?”
শ্যামল ভ্যাবাচ্যাকা খেলো, রহমানের দিকেও তাকালো চকিতে। দোকানি হঠাৎ করেই গুড়ের পিণ্ডের উপর থেকে মাছি সরানোর কাজে ব্যস্ত। হবার চেষ্টা করলো, কিন্তু একটা মাছিও নেই সেখানে।
“তোমার নাম কি শ্যামল?” নুরে ছফা সিগারেটে টান দিয়ে জানতে চাইলো।
“হ,” ছেলেটা ঢোঁক গিলল।
“তুমি মাস্টারের স্কুলে কিসের কাজ করো?”
“আ-আরদালির, “ ছেলেটা নার্ভাস ভঙ্গিতে জবাব দিলো।
ছফা আর প্রশ্ন না করে পকেট থেকে এক টুকরো কাগজ বের করে ছেলেটার দিকে বাড়িয়ে দিলো। “এই নাম্বার দুটো কার?”
কাগজটার দিকে কয়েক মুহূর্ত চেয়ে রইলো শ্যামল, যেনো কিছুই বুঝতে পারছে না।
“তোর তো নিজের ফোন নাই, তাইলে এইগুলান কার নম্বর?” চোখমুখ শক্ত করে বললো আতর।
শ্যামল আস্তে করে আবারো ঢোঁক গিলল।
“তুই এই নম্বরে ট্যাকা ভরোস। ভালা কইরাই জানোস কার নম্বর এইগুলা। না চিনার তো কথা না।”
“চিনুম না ক্যান, আজিব, ঢোঁক গিলে বললো ছেলেটা। “এইগুলা আমাগো মাস্টকাকা আর দিদির নম্বর।”
