.
অধ্যায় ২৭
দুপুরে খেয়েদেয়ে সুরুত আলীর হোটেল সানমুনের ছোট্ট ঘরটায় পায়চারী করছে নুরে ছফা। আজকে তার হোটেল রুমেই খাবার পাঠিয়েছে মুশকানের মালিক ফজলু। এটা যে আতর আলীর কাজ, বুঝতে বাকি নেই তার।
যাই হোক, আতরের সংগ্রহ করা দুটো সেলফোন নাম্বার হাতে পাবার পর কাজটা সহজ হয়ে গেছে এখন। নইলে আইএমইআই নম্বর দিয়ে প্রথমে সিমের হদিস বের করা লাগতো, তারপর সেই সিম দিয়ে মাস্টার কোন্ কোন্ নাম্বারে ফোন করেছেন, তাকেই বা কোন্ কোন্ নাম্বার থেকে কল করা হয়েছে সেসব বের করা হতো।
এখন এসবের দরকার নেই। জাওয়াদকে নাম্বার দুটো দিয়ে বলে দিয়েছে, কার নামে সিম দুটো রেজিস্টার্ড করা, আর সেগুলো থেকে বিগত এক মাসে যেসব নাম্বার থেকে আউটগোয়িং-ইনকামিং কল করা হয়েছে-সবকিছু জেনে নিতে হবে। কাজটা সময়সাপেক্ষ হলেও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতাধর পিএসের কল্যাণে দ্রুততম সময়েই করা যাবে।
সে এখন অপেক্ষা করছে জাওয়াদের ফোনের জন্য। তার উত্তেজনার পারদ তুঙ্গে উঠে গেলো ফোনের রিংটোন বেজে উঠতেই। সঙ্গে সঙ্গে কলটা রিসিভ করতে যেয়ে থমকে গেলো কয়েক মুহূর্তের জন্য। একটা অপরিচিত নাম্বার। মেজাজ বিগড়ে গেলো তার। দরকারের সময় এরকমটা হলে মেজাজ ঠিক রাখতে পারে না। কলটা রিসিভ করে ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললো, “হ্যালো…কে বলছেন?”
“আপনে ক্যারে! উসমান কই?” ফোনের ওপাশ থেকে একটা খসখসে কণ্ঠ বলে উঠলো।
“আপনি ভুল নাম্বারে ফোন দিয়েছেন।”
“আপনে ক্যাঠায়…অ্যাঁ? কই থাহুন?”
ছফার মেজাজ গেলো বিগড়ে। “ফোন রাখ, বানচোত!” কলটা কেটে দিয়ে জোরে জোরে সিগারেটে টান দিতেই আবার বেজে উঠলো সেটা, তবে ডিসপ্লেতে কলার আইডি দেখে তার সমস্ত রাগ কৌতূহলে পরিণত হলো।
“হ্যাঁ, জাওয়াদ…বলো?”
“স্যার, আশেকসাহেবের রেফারেন্স ভালোই কাজে দিয়েছে,” ওপাশ থেকে ডিবির জুনিয়র ইনভেস্টিগেটর বলে উঠলো। “খুব দ্রুতই অনেক ইনফো কালেক্ট করেছি। দুটো সিমই শ্যামল কুমার দাস নামে রেজিস্টার্ড করা…মদনগঞ্জের ঠিকানা দেয়া আছে। আমি গুগলিং করে দেখেছি, ওটা সুন্দরপুরের খুব কাছেই।”
“হুম,” বললো নুরে ছফা।
“ঐ দুটো সিম থেকে বিগত এক সপ্তাহে যেসব আউটগোয়িং-ইনকামিং কল করা হয়েছে তার সবকিছু আমি আপনাকে মেইল করে দিয়েছি।”
“এক মাসের কল-হিস্ট্রিটাও আমার দরকার হবে।”
“ওটা করতে একটু সময় লাগবে। কালকের মধ্যে দিতে পারবো আশা করি।”
“ওকে।”
“স্যার, একটা ব্যাপারে আমি নিশ্চিত, দুটো নাম্বার দু-জন মানুষ ব্যবহার করে,” জাওয়াদ বললো।
“কিভাবে বুঝলে?” আগ্রহী হয়ে উঠলো ছফা।
“নাম্বার দুটো নিজেদের মধ্যেও কল করেছে কয়েক বার।”
“আচ্ছা,” মাথা নেড়ে সায় দিলো সে। “ঠিক আছে, যতো দ্রুত পারো বাকি ইনফোগুলো পাঠিয়ে দিও।”
“ওকে, স্যার।”
ফোনটা রেখে জানালার বাইরে তাকালো। দুটো নাম্বার দু-জন মানুষ ব্যবহার করে! শ্যামল কুমার দাস! মনে মনে বলে উঠলো সে। কে হতে পারে এই লোক? মাস্টারের আত্মীয়?
আতর আলীকে কল দিলো এবার। “শ্যামল কুমার দাস নামের কাউকে তুমি চেনো?”
“আরে, আমি যে পোলার কথা কইছিলাম আপনেরে, তার নামই শ্যামল! মাস্টরের ডাইনহাত।”
“যে ছেলেটা ফোনের ব্যালান্স ভরে?”
“হ।”
“ও তাহলে স্কুলের কর্মচারী, প্রশ্নের মতো করে বললো না ডিবির নুরে ছফা।
“হ। মাস্টর ওরে দিয়াই সব কাম করায়।”
“তাহলে ওর সাথে কথা বলতে হবে।”
“ঐ হালারপুতেরে ধরবেনুনি, স্যার?”
“হ্যাঁ।” নাম্বার দুটো কে বা কারা ব্যবহার করে সেটা বের করার সহজ উপায় হলো শ্যামলের স্বীকারোক্তি। যদিও সে নিশ্চিত, একটা নাম্বার অবশ্যই মাস্টার রমাকান্তকামার ব্যবহার করেন। কিন্তু ছেলেটাকে স্কুলে গিয়ে ধরতে চাইছে না সে। যদিও, চাইলে এখানকার যে কাউকেই জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে। তারপরও, স্কুলের বাইরে জিজ্ঞাসাবাদ করলে ছেলেটা নাজুক অবস্থায় থাকবে। কারোর কাছ থেকে সত্য কথাটা বের করার সময় ভঙ্গুর আর নাজুক নার্ভই বেশি কার্যকরী।
“কিন্তু স্কুলে গিয়ে ওর সাথে কথা বলাটা ঠিক হবে না। স্কুলের বাইরে ধরতে হবে ওকে।”
“ঐ পোলায় রোজ বিকালে ফজলুর হোটেল থিকা কার লাইগা জানি খাওন নিয়া যায়,” আতর জানালো।
“তাহলে তুমি আর আমি একটু পরেই চলে যাবো রহমান মিয়ার দোকানে…ছেলেটা তো ওখান দিয়েই যাবে, নাকি?”
“হ, স্যার, “ বললো আতর।
“তাহলে তুমি আমার হোটেলে চলে আসো একটু পর।”
.
অধ্যায় ২৮
রহমান মিয়ার মেজাজ খারাপ হয়ে আছে, বেচা-বিক্রি ভালো হয়নি আজ। শহর থেকে কোনো কাস্টমারও আসেনি বন্ধ হয়ে যাওয়া ঐ রেস্টুরেন্টের খোঁজে। এরকম কেউ চলে আসার পর যখন দেখে ওটা লাইব্রেরিতে রূপান্তরিত হয়ে গেছে তখন খুবই অবাক হয়, তারচেয়েও বেশি হয় হতাশ। রহমান তখন আগ বাড়িয়ে তাদের হতাশা দূর করে দেয়ার কাজটা করে-”ঐ হুটেল তো এহন টাউনে সইরা গেছে…এইখান থিকা রিস্কা দিয়া গেলে দশ টাকা নিবো।”
এমন কথায় বেশ কাজে দেয়। খাদ্যরসিকেরা এতো দূর এসে বিমুখ হয়ে ফিরে যায় না। তারা রহমানের নির্দেশনা পেয়ে খুশিমনে চলে যায় হিটলুর ঐ রেস্টুরেন্টে। কেউ কেউ এক প্যাকেট সিগারেট কিনে দোকানিকে উপকারের প্রতিদান দেয়, কেউ বা হাসিমুখে ধন্যবাদ দিয়ে রিক্সা ধরে-তাতে অবশ্য রহমানের কোনো আক্ষেপ থাকে না। প্রতিটি কাস্টমারের জন্য হিটলু তাকে দশ টাকা করে দেয়।
