আসলাম চুপচাপ ছফার পিস্তলটা পিএসকে দিয়ে দিলে ওটা হাতে নিয়ে কোলের উপরে রেখে দিলো সে।
আবারো হাতঘড়িতে সময় দেখে নিলো পিএস। বোঝাই যাচ্ছে উত্তেজনার চোটে ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে আছে। “আপনি অনেক ভালো একজন ডিবি অফিসার,” ছফার উদ্দেশে বললো। “কলকাতায় মুশকান জুবেরিকে ট্র্যাক করতে গিয়ে এতো বড় ভুল কী করে করলেন?”
ছফা কিছুই বললো না। পুরো বিষয়টা তার কাছে এখনও ধোঁয়াশা।
“এই মেয়েটা,” বন্দীকে দেখিয়ে বললো। “আপনি ভেবেছিলেন ওই মুশকান! প্লাস্টিক সার্জন দিয়ে চেহারা বদলে সেই সার্জনকে মেরে ফেলেছে। নতুন চেহারার সাথে নতুন নাম-পরিচয় নিয়ে সুন্দরপুরে ফিরে গেছে! খুব বেশি সিনেমাটিক হয়ে গেলো না?”
এবারও ছফা কিছু বললো না। কলকাতায় গিয়ে নিখোঁজদের তালিকা থেকে মুশকানের সম্ভাব্য দুটো শিকার ঠিকই খুঁজে বের করেছিলো সে। সল্টলেকের ঐ বাড়িতেই যে মুশকান ছিলো সেটাও সত্যি। অথচ এখন দেখতে পাচ্ছে, মুশকান তার চেহারা পাল্টায়নি।
প্রথমবার মুশকান জুবেরি তাকে বোকা বানিয়ে সটকে পড়েছিলো। তিন বছর পর তাকে রীতিমতো হতবুদ্ধিকর অবস্থায় ফেলে দিয়েছে।
যাই হোক, মুশকানকে এসব করতে সহায়তা করেছেন ডাক্তার আসকার ইবনে সায়িদ। তার সাহায্য না পেলে কোনোভাবেই এসব করা সম্ভব হতো না ওর পক্ষে। একজন অপরাধীকে সাহায্য করার প্রতিদান তিনি এখন পাচ্ছেন-তার নিদোষ মেয়েটা পিতার অপকর্মের শাস্তি ভোগ করছে।
“আপনার সবচে বড় দুর্বলতা কি জানেন? পিএস বললো। “আপনার মনটা বড্ড নরম। এতো নরম মন নিয়ে কী করে যে ডিবি’তে আছেন, বুঝি না।”
বাঁকাহাসি ফুটে উঠলো ছফার ঠোঁটে। “আপনার মতো পলিটিক্স করলে হয়তো অতোটা নরম থাকতাম না।”
আসলাম তেড়ে আসতে চাইলে কথাটা শুনে। সামান্য ডিবি অফিসারের এমন আস্পর্ধা দেখে বিস্মিত সে-বিশেষ করে তার হাতে মার খাওয়ার পরও।
আশেক মাহমুদ মাথা দুলিয়ে আসলামকে নিরস্ত করলো। তার মুখে হাসি। “অযোগ্যরা সব সময়ই অজুহাত দেয়।”
কথাটা হজম করে নিলো ছফা, কিছু বলতে গিয়েও বললো না। সুস্মিতার দিকে তাকালো সে। তাদের দুজনের চোখাচোখি হলো অল্প সময়ের জন্য। মুখে স্কচটেপ লাগানো আর হাতদুটো পিছমোড়া করে বাঁধা-অসহায় মেয়েটির চোখদুটো ছল ছল করছে অজানা আশঙ্কায়।
আশেক মাহমুদ আবারো হাতঘড়ি দেখলো। “আসলাম, মনে হচ্ছে মুশকান জুবেরি আসবে না। এখান থেকে আমাদের চলে যেতে হবে। এ জায়গায় আর কিছু করা ঠিক হবে না। তুমি-”
আশেক মাহমুদ কথা শেষ করতে পারলো না। ঠিক তখনই তার ফোনটা বেজে উঠলো। অবাক হয়ে পকেট থেকে ফোনটা বের করে ডিসপ্লের দিকে তাকালো সে। কলার আইডি দেখে বুকটা ধক করে উঠলো তার। এতো রাতে হাউজনার্স তাকে ফোন দিয়েছে?!
এর একটাই অর্থ–খারাপ কোনো সংবাদ আছে!
বুবুর কিছু হয়েছে।
মুহূর্তে চোখেমুখে শেকগ্রস্ত অভিব্যক্তি জেঁকে বসলো তার। এই দুঃসংবাদটি শোনার প্রস্তুতি থাকলেও আজকের জন্যে একেবারেই প্রস্তুত ছিলো না।
পিএস কলটা রিসিভ করে দুর্বল আর ভয়ার্ত কণ্ঠে বললো, “ক্-কি হয়েছে?” সামান্য তোতলালে সে।
“হ্যালো, বুল্লা!” ফোনের ওপাশ থেকে বলে উঠলো একটি নারী কণ্ঠ।
.
অধ্যায় ৮৮
নিথর দেহ নিয়ে শয্যাশায়ী রোগী পড়ে আছে। দেখলে মনে হবে না দেহে প্রাণ আছে, কিন্তু ক্যান্সারে আক্রান্ত এই মৃত্যুপথযাত্রির প্রাণবায়ু এখনও নিঃশেষ হয়ে যায়নি।
প্রাণঘাতী ক্যান্সার যে হাল করেছে তাতে করে আজ এতো বছর পর তাকে দেখলে কেউ চিনতে পারবে না। ক্রমশ কঙ্কালে রূপান্তরিত হচ্ছে যেনো। মৃত্যুর করাল গ্রাসে প্রায় নিঃশেষিত একজন।
আর্জুমান্দ বেগমের চোখে আই মাস্ক থাকায় দেখতে পাচ্ছে না তার শিয়রে, একটা চেয়ার নিয়ে বসে আছে একজন। আধ-ঘুম আধো জাগরনে ধরেই নিয়েছে, ঘরে আছে হাউজনার্স মেয়েটি। কিন্তু সে যদি চোখ মেলে তাকাতো, তাহলে দেখতে পেতো অনেক কাল আগের এক সুহৃদকে!
সালোয়ার-কামিজ আর চুরিদারের উপরে ডাক্তারদের সাদা অ্যাপ্রোন পরা মুশকান জুবেরি স্থিরচোখে তাকিয়ে আছে আর্জুমান্দ বেগমের দিকে। তার ইচ্ছে করছে অসুস্থ এই রোগীর কপালে হাত বুলিয়ে দিতে, কিন্তু ইচ্ছেটা দমিয়ে রাখতে হলো, পাছে ঘুম থেকে জেগে ওঠে।
এই রোগীর প্রতি তার কোনো ক্ষোভ নেই। যদিও চল্লিশ বছরেরও বেশি আগের পুরনো একটি ক্ষতের সৃষ্টি করেছিলো সে। যে কারণে আমেরিকা ছেড়ে গ্রেট বৃটেনে পাড়ি দেয় মুশকান।
ভুল নাকি ইচ্ছেকৃত? সত্যি বলতে, মুশকান জানে না ঠিক কী কারণে তার এক কালের বান্ধবী ওরকম কাজ করলো।
আমেরিকায় আর্জুমান্দ বেগম আর সে থাকতে পাশাপাশি বাড়িতে। প্রতিদিন দেখা হতো। সপ্তাহে একদিন একসাথে ডিনার করাটা রীতিতে পরিণত হয়েছিলো এক সময়। আর্জুমান্দ বেগমের স্বামী স্থপতি রাগিব আহমেদ খুবই প্রাণখোলা মানুষ ছিলেন। মুশকানের সাথেও তার ছিলো ভালো সম্পর্ক। একসাথে তারা গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের ইয়েলোস্টোন্স ফরেস্ট, নায়াগ্রা ফল্স, লাস ভেগাস, ডিজনিল্যান্ডসহ কতো জায়গায় বেড়াতে গেছে।
ঘনিষ্ঠতার কারণেই বিশ্বাস করে মুশকান তার জীবনের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের কথাটা আর্জুমান্দ বেগমকে একদিন বলে ফেলেছিলো। সবটা শোনার পর সমব্যথিও হয়েছিলো তার বান্ধবী, কিন্তু কদিন পরই বুঝতে পারে, বিরাট বড় একটা ভুল করে ফেলেছে। তার আন্দিজ থেকে বেঁচে আসার গল্পটা বাঙালি কমিউনিটিতে জানাজানি হয়ে গেছে। প্রথমে তাদের নেইবারহুড়ে এটা চাউর হলেও সাদা চামড়ার মানুষগুলো এটা শোনার পর তার প্রতি আরো বেশি করে সহানুভূতি দেখায়। কেউ বিরূপ আচরণ করেনি কিংবা বাঁকা চোখে তাকায়নি। কিন্তু স্বজাতিদের কাছে মুশকান রাতারাতি হয়ে উঠলো অস্পৃশ্য একজন-মানুষের মাংস খেয়ে বেঁচেছিলো! যেনো এরচেয়ে ভালো আর মর্যাদাপূর্ণ ছিলো না খেয়ে মরে যাওয়াটা! ওদের বিরূপ আচরণ তার জীবনটাই বিষিয়ে তুললো এক সময়। প্রথমে রাজ্য পাল্টালো, অল্প কদিন পরই দেখলো, ওখানকার বাঙালি কমিউনিটিও তার এই নরমাংস ভক্ষণ করে বেঁচে থাকার কথা জেনে গেছে। শেষে বাধ্য হয়েই আমেরিকা ছাড়ে।
