আর্জুমান্দ বেগম কেন এ কাজ করেছিলো সেটা নিয়ে অনেক ভেবে দেখেছে সে, কিন্তু নিশ্চিত হতে পারেনি। তার কেনজানি মনে হয়, এর পেছনে ছিলো ঈর্ষা! নিজের স্বামীর সাথে মুশকানের নিখাদ বন্ধুত্ব আর তার ব্যক্তিত্ব, সৌন্দর্যই এই ঈর্ষা সৃষ্টি করে সম্ভবত। হয়তো স্বামীর কাছ থেকে মুশকানের প্রশংসা শুনে শুনে ঈর্ষার আগুনে পুড়ছিলো সে। হয়তো স্বামীকে মুশকানের সাথে অতিরিক্ত বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করতে দেখেও আক্রান্ত হয়েছিলো সুতীব্র ঈর্ষায় নিশ্চিত করে কিছুই জানার উপায় নেই এখন। সে শুধু জানে, কোনো এক অজ্ঞাত কারণে আর্জুমান্দ বেগম মুশকানের নরমাংস খেয়ে বেঁচে থাকার কথাটা রটিয়ে দিয়েছিলো।
তবে বিশ্বাস করো, মনে মনে বলে উঠলো মুশকান। আমি যদি জানতাম হাসিব তোমার ছেলে, তাহলে ভুলেও…একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো সে। এটা একেবারেই কাকতালীয় ব্যাপার…ঘটনাচক্রে হয়ে গেছে! আমি প্রতিশোধ নেবার জন্য এ কাজ করিনি। তুমি কেন আমার অতো বড় ক্ষতি করেছিলে আমি জানি না। তবে আমি এর শোধ তোলার কথা কখনও ভাবিনি। অন্তত এভাবে তো নয়ই!
মাথা থেকে এসব ভাবনা দূর করে মনোযোগ দিলো বর্তমানে। সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে একটু পরই সুস্মিতা মুক্তি পাবে। আর্জুমান্দ বেগমের ছোটোভাই, সেই বুল্লাই যে প্রধানমন্ত্রীর পিএস, সেটাও এ ঘরে ঢোকার পরই বুঝে গেছিলো-শোবার ঘরে বারো-তেরো বছরের বুল্লা আর আর্জুমান্দ বেগমের একটি ছবি আছে। পিএসকে তার আদুরে নাম ধরে ডেকে ভড়কে দিয়েছে মুশকান। এখন এই ক্ষমতাশালী মানুষটি সুস্মিতাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য।
যদিও মুশকান ভাগ্যে বিশ্বাস করে না, বরং বিশ্বাস করে সাহসী আর আত্মবিশ্বাসি মানুষের কাছেই সৌভাগ্য ধরা দেয়। আজকে আরেকবার সেটা প্রমাণিতও হয়েছে। হাল ছেড়ে না দেয়ার মানসিকতা মানুষকে কঠিন পরিস্থিতিতেও বাঁচিয়ে রাখে-জীবনের শুরুতেই এই শিক্ষাটা পেয়ে গেছিলো সে। তারপরও, একটু আগে কেএস খানের বাড়ি থেকে বের হবার সময় ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি আশাব্যঞ্জক কিছু ঘটবে। বলতে গেলে হাল ছেড়েই দিয়েছিলো, ভেঙে পড়তে শুরু করেছিলো তার নার্ভ। তারপরই ডাক্তারের ফোনকল আর দুর্লভ একটি তথ্য পুরো দৃশ্যপট বদলে দেয় মুহূর্তে।
মুশকানের ফোনটা এ সময় ভাইব্রেট করে উঠলে চেয়ার ছেড়ে উঠে ঘরের এককোণে গিয়ে কলটা রিসিভ করলো সে। কণ্ঠ যতোটা সম্ভব নীচু করে কথা বললো, “হুম…আমি এখন অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরে…ওর সামনেই আছি…চিন্তা কোরো না…আমার সাথে কথা হয়েছে…” অন্য হাতে হাউজনাসের ফোনটা দেখলো সে। ওটার কল এখনও কেটে দেয়নি, তবে মিউট করে রেখেছে। “সুস্মিতাকে এখনই ছেড়ে দেবে।”
.
অধ্যায় ৮৯
মাত্র ঘণ্টাখানেক ‘হসপিস সার্ভিস ইভালুয়েশন অ্যান্ড এক্সপানশান ফাইলটা দেখার পর ডাক্তার আসকার মূল্যবান একটি তথ্য জেনে নিয়েছেন।
অরিয়েন্ট হাসপাতালই এ দেশে প্রথম হসপিস সার্ভিস চালু করে। এখনও একমাত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে এই সার্ভিসটি তারা দিয়ে আসছে। ক্যান্সারসহ কিছু অনিরাময়যোগ্য রোগে আক্রান্ত যে-সব রোগী নির্ঘাত মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে, তাদের জীবনের শেষ সময়গুলো যাতে অপেক্ষাকৃত কম যন্ত্রণাময় হয় তার জন্য সারা বিশ্বের অনেক হাসপাতালেই হসপিস সার্ভিস রয়েছে। অরিয়েন্ট হাসপাতালে মাত্র দুটো বেড আর পাঁচজন প্রশিক্ষিত নার্সের সমন্বয়ে গড়া ছোট্ট এই ডিপার্টমেন্টটি কয়েক বছর আগে শুরু হলেও প্রথম দিকে তেমন লাভজনক না হলেও ডাক্তার আসকারের আগ্রহের কারণে সার্ভিসটি বহাল থাকে।
সারা বিশ্বে হসপিসের রোগীদের প্রায় ষাট শতাংশ নিজেদের বাড়িতেই এই সার্ভিসটি নিয়ে থাকে, এদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। তাই অন্যান্য দেশের মতো, হসপিস অ্যাট হোম সার্ভিসও অরিয়েন্ট হাসপাতাল দিয়ে আসছে শুরু থেকে। বর্তমানে তাদের ক্লায়েন্টের সংখ্যা দিন দিনই বাড়ছে, সেই তুলনায় প্রশিক্ষিত নার্স আর বেডের সংখ্যা অপ্রতুল। তাই কয়েক দিন আগে এই সার্ভিসটি সম্প্রসারণ করার জন্য হাসপাতাল পরিচালনা কমিটি থেকে প্রপোজাল দেয়া হয়েছিলো, কিন্তু ফাইলটা ডাক্তারের চোখে পড়েনি। তিনি হাসপাতালে খুব একটা সময়ও দিতে পারছিলেন না আজকাল। সম্প্রসারণের মতো কাজ যেহেতু মালিকপক্ষের অনুমোদন ছাড়া পাস হয় না, তাই ডাক্তারের বিবেচনার জন্য অনেক দিন থেকেই ফাইলটা পড়ে আছে তার ডেস্কে।
এই ফাইল দেখেই ডাক্তারের মনে পড়ে যায়, পিএসের বোনের কথা। নুরে ছফা তাকে বলেছিলো, পিএসের বোন-সতুরের দশকে যে কিনা মুশকানের প্রতিবেশী ছিলো আমেরিকায়-এখন মৃত্যুপথযাত্রি। পিএস তাকে নিজের ফ্ল্যাটে রেখেই চিকিৎসা করাচ্ছে জীবনের শেষ দিনগুলো একটু কম যন্ত্রণা ভোগ করার জন্য।
হসপিস সার্ভিস নিচ্ছে না তো?
প্রশ্নটা স্বাভাবিকভাবেই ডাক্তারের মনে উঁকি দেয়। যদি তা-ই হয়, তাহলে এ দেশে একমাত্র তারাই এই সার্ভিস দিয়ে থাকে। সঙ্গে সঙ্গে অ্যাডমিনে ফোন করে তিনি জানতে চান, ‘হসপিস সার্ভিস অ্যাট হোম সেবাটি বর্তমানে ক-জন নিচ্ছে-তাদের সমস্ত ডিটেইল তার লাগবে।
হাসপাতালটি কম্পিউটারাইড বলে অ্যাডমিন থেকে এই তথ্যটি ডাক্তারের অফিসের পিসিতে পাঠাতে মাত্র তিন-চার মিনিট সময় লেগেছিলো। আসকার ইবনে সায়িদ অবাক হয়েই দেখতে পান, বর্তমানে দু-জন রোগী এই সার্ভিসটি নিচ্ছে। তাদের একজন দেশের নামকরা শিল্পপতি, ডাক্তার তাকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন।
